ফিরে দেখা অমর একুশ

সেলিনা হোসেন

এ বছরের একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির শহীদ দিবসের ৬৬ বছর পূর্ণ দিবস। পৃথিবীতে প্রথম ভাষার জন্য জীবনদানকারী ঘটনা। ইউনেসকো কর্তৃক ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। বলা যাবে বিশ্বজোড়া অর্জনের এটি একটি যাত্রা। কথা ছিল এই ভাষা নিজ দেশে পরবাসী হবে না। কথা ছিল দীর্ঘ সময় ধরে প্রবাহিত ভাষার পূর্ণতা অর্জন হবে। হয়েছে কি? জোর গলায় বলা যাবে কি বাংলা আমার অহংকার?

উত্তরটা গলা উঁচিয়ে বলা যাবে, না।

বলা হয়ে থাকে ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১—স্বাধীনতা অর্জন। একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছে বাঙালি। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

এ বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৭ বছর পূর্ণ হবে। বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র রাষ্ট্র, যে সাংবিধানিকভাবে বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। কিন্তু জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার সম্মানজনক ব্যবহার ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। মানুষের আচরণেও নিজ মাতৃভাষার প্রতি জীবনদানকারী একটি জাতির মাতৃভাষার প্রতি নেতিবাচক মনোভাব অত্যন্ত দুঃখজনক।

ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পরিচালিত স্কুলগুলো মাতৃভাষার জন্য শিক্ষার্থীদের কতটা অনুপ্রাণিত করে তা প্রশ্নবিদ্ধ। তার পরও বলা যায়, গত কয়েক বছরে স্কুলগুলো নিজেদের আগের অবস্থান থেকে খানিকটা সরে এসেছে। এটা তো সত্যি যে শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষা থেকে বঞ্চিত করলে প্রজন্মের আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি হয় না। তাদের শিকড়ের মাটি থাকে না। বিদেশে পড়াশোনা বা চাকরি করতে গেলে উদ্বাস্তু মানুষে পরিণত হয়।

দুঃখজনকভাবে ডিজুস নামে এক বিকৃত ভাষা বিনা বাধায় বাণিজ্যিক মুনাফার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দেখার কেউ নেই। রাস্তার বিজ্ঞাপন বোর্ড, বিলবোর্ড বাংলা ভাষাকে ঝেড়ে ফেলেছে। যে অল্প কিছুসংখ্যক বিজ্ঞাপনে বাংলা ব্যবহার করা হয়, তা দিয়ে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর খুশি হওয়ার কারণ নেই। জনগোষ্ঠী ক্রমাগত নিজ মাতৃভাষা নিয়ে শঙ্কিত।

দেশের সব ক্ষেত্রে ভাষার অবমাননা চলছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যোগাযোগের জন্য ইংরেজি ভাষার বিকল্প নেই। এটি নিয়ে কেউ প্রশ্ন করে না। সবাই বুঝে গেছে যে ইংরেজি ভাষা লাগবে। কিন্তু কোথাও কোথাও বোঝাটা বেশি হয়ে যায়। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ইংরেজি নাম রেখে অনুষ্ঠান করার প্রয়োজন আছে কি? কার স্বার্থে? যদি বিদেশিদের জন্য অনুষ্ঠান করতে চান কিংবা শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো অনুষ্ঠানের দরকার হয়, তাহলে সুন্দরভাবে ইংরেজি ভাষায় অনুষ্ঠান করুন। শিক্ষার্থীরা যেন বুঝতে ও শিখতে পারে সেটি দেখুন। কিন্তু বাংলার সঙ্গে ইংরেজি মিশিয়ে জগাখিচুড়ি বানানোর অর্থ কী? ছেলে-মেয়েরা উচ্চারণ করে হ্যালো ভিউয়ার কিংবা হ্যালো লিসেনার্স—এর ফলে কি খুব স্মার্ট হয়ে যায় ওরা! উল্টো না শেখে ইংরেজি, না শেখে মাতৃভাষা। সুপ্রিয় দর্শক, সুপ্রিয় শ্রোতা কি খুব খারাপ সম্বোধন? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা সঠিকভাবে বাংলা ভাষা শিখতে ও পড়তে পারে না। আইনজীবীদের মুখেই শোনা যায় বাদী বা বিবাদীর পক্ষে লিখিত বক্তব্য দাখিল বা পেশ করার জন্য বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। এ অবস্থা দেশের অন্য অনেক ক্ষেত্রে চলছে।

আমরা বলে থাকি, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ। আমরা যুদ্ধ করে, জীবন দিয়ে স্বাধীন দেশ লাভ করেছি।

এখন প্রশ্ন, বাংলাকে আমরা কতটা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে পেরেছি?

আমাদের অমর একুশে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার পরও দেশের ভেতরে ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অন্য কথায়, প্রতিষ্ঠিত করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এ কথা অনেকেই জানে, উন্নয়নশীল ছোট দেশের মাতৃভাষা অর্থনৈতিক কারণে বিশ্বের দরবারে পৌঁছতে পারে না।

বাইরের বিশ্বে না হোক, অত লম্বা প্রতিযোগিতা কঠিন জায়গা কিন্তু দেশের ক্ষমতাবানরা ভাষার মর্যাদার স্বরূপটি বুঝতে পারবেন না কেন? এমনকি দেশের সচেতন নাগরিকও বুঝে না বুঝে শিশুদের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পাঠানোর চেষ্টায় পিছিয়ে নেই।

ইংরেজি একটি আন্তর্জাতিক ভাষা। ছেলে-মেয়েরা শিখুক কিন্তু কোনোভাবেই নিজের মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে নয়। অসংখ্য পরিবারে ছেলে-মেয়েদের বাংলা বলার চর্চা করানো হয় না। লিখতে-পড়তে তো জানেই না। এমনকি বুধসমাজের জ্ঞানী-গুণীরাও সেমিনারের মাইকে ইংরেজি ভাষা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সেখানে একজন বিদেশি না থাকলেও। বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে তাঁরা মাতৃভাষাকে পদদলিত করেন।

দুঃখ, ফেব্রুয়ারি মাস এলেই এসব কথা লিখব, অন্য সময় স্রোত আপন নিয়মে গড়াবে। এভাবে আমরা গড্ডলিকা স্রোতে ভেসে যাই। আমাদের গৌরবের অর্জন অনবরত কালিমালিপ্ত হতে থাকবে।

তার পরও বলি, জয় অমর একুশে। অক্ষয় হোক একুশের চেতনা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক
সূত্র: কালের কণ্ঠ

শেয়ার করুন