জামায়াতের নতুন কৌশলে সজাগ আওয়ামী লীগ

দীপক দেব :: মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া, নতুন নামে দল গঠন ও দীর্ঘদিনের জোট সঙ্গী ২০ দলীয় জোটের সঙ্গ ত্যাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জামায়াতে ইসলামী হঠাৎ করেই কেন আলোচনা শুরু করল এবং এর পেছনের উদ্দেশ্য কী, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। প্রাথমিকভাবে এটিকে জামায়াতে ইসলামীর ‘নতুন কৌশল’ হিসেবেই দেখছে তারা। দলটির অনেকেই মনে করেন; যা কিছু ঘটছে, সব কিছুই তাদের কৌশলের অংশ। সামনের দিনের রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলোর ওপর জামায়াতের এসব পদক্ষেপ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে বলেও মনে করেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা। তবে, আওয়ামী লীগের অনেকেই মনে করেন, জামায়াতের ভুল ও ভ্রান্ত রাজনীতির কারণে দলটি আজ বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে। দলটির নেতাকর্মীরা তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত ও হতাশাগ্রস্ত হওয়ার কারণে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। এছাড়া অনেকে এটিকে জামায়াতের রাজনীতি অব্যাহত রেখে মানুষের মনে দলটি সম্পর্কে যে ঘৃণা রয়েছে, সেখান থেকে বের করে আনার নতুন কৌশল হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ।

আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা এ প্রসঙ্গে জানান, হঠাৎ করেই জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে যে ধরনের বোধোদয়ের জন্ম নিয়েছে এবং যে নেতার নাম সামনে এসেছে, তাতে করে বিষয়টি একটু অবাক করার মতো। ২০০৯ সালের পর থেকে ১০ বছরে জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করেনি। সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে তারা তাদের ধ্বংসাত্মক কর্মকা- ও উগ্রপন্থা থেকে কিছুটা সরে এসেছে। বর্তমানে তারা আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টির মতো করে দল পরিচালনা করছে। এ অবস্থায় হুট করে তাদের এ নতুন অবস্থান কী জন্য, এটি স্বাভাবিকভাবেই ভাবনার বিষয়। তবে, কয়েক বছরে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে হারিয়ে যাওয়া জামায়াতকে আলোচনায় আনার জন্য এটি তাদের নিজস্ব কৌশল হতে পারে।

এদিকে জামায়াতের সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা প্রকাশ্যে কথাও বলা শুরু করেছেন। জামায়াতে ইসলামীর নাম পরিবর্তন প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, নতুন বোতলে পুরাতন মদ যদি আসে, তাহলে পার্থক্য কোথায়? জিনিস তো একটাই। তাদের আদর্শটা ঠিক আছে, নতুন নামে একই আদর্শ আসবে, এতে পার্থক্যটা কোথায়? অন্যদিকে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টিকে কৌশল হিসেবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর ক্ষমা চাওয়ার বিষয় কেন এলো, সেটিও কোনো কৌশল কি না, ভেবে দেখতে হবে। তবে, ক্ষমা চাইলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যে চলবে, তা তিনি স্পষ্টভাবেই বলেছেন।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জামায়াত-বিএনপির কোনো বিশ্বাস নেই। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাদের রাজনীতির সূচনা, ষড়যন্ত্রের মধ্যেই তারা ঘুরপাক খায়। তারা এর মধ্য থেকে বের হতে চায় না। আমাদের কাছে খবর আছে, বিএনপি নেতা তারেক রহমান জামায়াতের বুদ্ধি পরামর্শে চলেন। লন্ডনে তার আশপাশে জামায়াতের লোকজনকে বেশি দেখা যায় বলে কথিত আছে। শুনেছি সম্প্রতি জামায়াতের কয়েক তরুণ নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে দুই তিন-দফা বৈঠক করেছেন। যখন দেখি জামায়াত নেতারা নতুন দল করার কথা বলছে, মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা নিয়ে ক্ষমা চাওয়ার কথা বলছে, ২০ দলের সঙ্গে না থাকার কথা বলছে; তখন আমাদের কাছে খবর আসছে তারেক রহমান জামায়াত নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। বিষয়গুলোকে আমরা কীভাবে দেখব? কীভাবে দেখা উচিত?

যা ঘটছে সবই পরিকল্পনা অনুযায়ী হচ্ছেÑ দাবি করে ওই নেতা আরও বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশি-বিদেশি চাপ ছিল জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করার জন্য। এছাড়া জামায়াতের কারণে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে পারছে না বিএনপি। এজন্য ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মেরুকরণের কথা চিন্তা করে ও বিদেশি মিত্রদের সন্তুষ্ট করতে তারা আওয়াজ দিচ্ছে। বিষয়গুলো কোন দিকে যাচ্ছে, সেদিকে আমাদের নজর রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ আলোকিত বাংলাদেশকে বলেনÑ মিথ্যার ওপর, ভুলের ওপর কোনো রাজনীতিই বেশি দিন টিকে থাকে না। কোনো দল যদি মানুষ হত্যার রাজনীতি করে, নারী নির্যাতনের রাজনীতি করে, জ্বালাওপোড়াওয়ের রাজনীতি করে, সে দল কখনও মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। জামায়াতের অবস্থা আজ এ কারণে এমন হয়েছে। তাদের ভুল রাজনীতির কারণে তারা আজ বিলুপ্তির পথে। তিনি বলেন, জামায়াতের ভ্রান্ত রাজনীতির কারণে তাদের দলের নেতাকর্মীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হতাশাগ্রস্ত। এজন্যই তাদের কেউ কেউ এসব মতামত দিচ্ছে।

২০১১ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর ও এ অপরাধে দলটির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েক নেতার ফাঁসির ঘটনার পর থেকে প্রকাশ্য রাজনীতির পরিবর্তে কৌশল পাল্টে আত্মগোপনে থেকে রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনা করে আসছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির নিবন্ধন বাতিলের বিষয়টি বিচারাধীন থাকায় সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না দলটির প্রার্থীরা। এজন্য একাদশ জাতীয় সংসদে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন জামায়াতের ২২ প্রার্থী। সব মিলিয়ে ২০০৯ সালের পর থেকে বেকায়দায় থাকা জামায়াত অনেকটাই নীরবে-নিভৃতে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নবগঠিত ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের পক্ষ থেকে জামায়াত ছাড়ার জন্য বিএনপির ওপর অব্যাহত চাপ থাকলেও এসব নিয়ে নীরব থাকতে দেখা গেছে দলটিকে।

গেল জানুয়ারিতে দলটির মজলিশে শূরার বৈঠকে দলটির সংস্কার ও মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া, আগামীতে ভোটের রাজনীতিতে অংশ না নিয়ে সামাজিক কর্মকা- পরিচালনার মাধ্যমে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ও ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া চলতি ফেব্রুয়ারিতে কার্যনির্বাহী পরিষদের বৈঠকে মজলিশে শূরার বৈঠকের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। এ দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণ দেখিয়ে গেল শুক্রবার দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও যুদ্ধাপরাধীর মামলায় জামায়াত নেতাদের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক পদত্যাগ করেন। লন্ডনে স্বেচ্ছায় নির্বাসনে থাকা এ নেতার পদত্যাগের ঘটনার মধ্য দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি আবারও আলোচনায় আসে। যদিও আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগের বিষয়টি ও কোনো ভূমিকা ছাড়া ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি নিয়েও অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, পদত্যাগকালে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক যে কথাগুলো বলেছেন, তাতে তার উদ্দেশ্য কীÑ তা পরবর্তী কার্যক্রম দেখলে বোঝা যাবে। আর জামায়াত তার জঙ্গিবাদী ও সাম্প্রদায়িক আদর্শকে ধারণ করে আরেকটি ভিন্ন নামে সংগঠন করার অপপ্রয়াস চালায় কি না, সেটিও দেখার বিষয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, যুদ্ধাপরাধের দায়ে দ-প্রাপ্ত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান কারাগার থেকে জামায়াতকে পুনর্গঠনের যে চিঠি দিয়েছিল, সেটিও আমি দেখেছি। আবদুর রাজ্জাক জামায়াতের রাজনীতি অব্যাহত রেখে দলটি সম্পর্কে মানুষের মনে যে ঘৃণা রয়েছে, সেখান থেকে বের করে নিয়ে আসার কৌশল নিয়েছেন। তিনি রাজ্জাকের প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, জামায়াত কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটি আদর্শ।

-কৃতজ্ঞতা: আলোকিত বাংলাদেশ

শেয়ার করুন