ইয়াবার বিস্তার রোধ জরুরি

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

বাংলাদেশে ইয়াবা নামের মাদকের প্রবেশ ও বিস্তার বেশ সময়ের। মূলত মিয়ানমার থেকে আগত এমন মাদক টেকনাফ হয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে দাম একটু বেশি হওয়ায় সেবনে ধনী ঘরের সন্তানদের প্রাধান্য বেশি ছিল। ক্রমান্বয়ে সহজলভ্য এবং অবাধ হওয়ায় এ বিস্তার গোটা দেশে বিরাজমান। টেকনাফ অঞ্চলের চোরা কারবারিরা ইয়াবাকে তাদের প্রধান কারবার হিসেবে বিবেচনা করে।

ইয়াবার ভয়াবহতা যখন চরমে তখন ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলেই মনে হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ১০২ জন ইয়াবা কারবারি অতি সম্প্রতি আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়াবা কারবারিদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। পাশাপাশি তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা এবং কৃত অপরাধের জন্য সাজার বিষয়ে নমনীয় হওয়ার আশাও ব্যক্ত করেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তালিকাভুক্ত ৭৩ জন ইয়াবা কারবারিকে আত্মসমর্পণ করতে দেখা যায়নি। এতে করে আত্মসমর্পণ ও ইয়াবা কারবার রোধ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। যেসব রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে ইয়াবা কারবারে অভিযোগ রয়েছে, তাঁরা যদি আত্মসমর্পণ না করেন এবং তাঁদের শাস্তির আওতায় না আনা যায়, তাহলে এ কারবার রোধ করা সম্ভব হবে কিভাবে?

মাদকের প্রতিক্রিয়া সব সমাজেই বহুবিধ। এর রয়েছে শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক এবং মোটাদাগে আর্থিক ক্ষতি। তার শারীরিক প্রতিক্রিয়া যেমন দুর্বলতা ও বৈকল্যসহ একসময় অকালমৃত্যুও ডেকে আনে। মানসিক বৈকল্য অন্যের প্রতি প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যা ব্যক্তিকে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অপরাধ সংঘটনে প্রলুব্ধ করে। খুন, ধর্ষণের মতো সামাজিক অপরাধের অন্যতম কারণ মাদক। মাদকের অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া এতটাই ব্যাপক ও বিস্তৃত যে নিজের আর্থিক ক্ষতি থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। র্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, আমাদের দেশে ৭০ থেকে ৮০ লাখ লোক মাদক সেবন করে। এতে এক লাখ কোটি টাকা বছরে খরচ হয়। বাস্তবে মাদকসেবীদের সংখ্যা এবং ব্যয় হয়তো আরো বেশি। সম্প্রতি সরকার প্রতিটি বিভাগে একটি করে বিশেষায়িত মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র ও হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেখানে প্রচুর অর্থ ব্যয় হবে। এমন অর্থ দিয়ে আমাদের দেশের প্রচুর অবকাঠামো নির্মাণ করা যেত, যা মানুষের কল্যাণকাজে লাগত। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরো গতি পেত এবং মানুষের জীবনমান আরো উন্নত হতো।

মাদক প্রতিরোধ কারো একার পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা এটি আমাদের সমাজে এত ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে এবং এর পেছনে বহু ব্যক্তির হাত রয়েছে। যে কারণে এর বিস্তার, তার অন্যতম হলো এর সহজলভ্যতা। এতে লাভবান হচ্ছে গুটিকয় মানুষ আর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে লাখ লাখ মানুষ এবং প্রভাব পড়ছে গোটা অর্থনীতির ওপর। বেড়ে যাচ্ছে সামাজিক অপরাধ, বিশৃঙ্খলা এবং বিচ্যুত আচরণ। ব্যাহত হচ্ছে আমাদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনধারা। ক্ষতি হচ্ছে দক্ষ ও শক্তিশালী জনবলের। কেননা মাদকাসক্তরা পরিবার ও সমাজে অবদানের পরিবর্তে বোঝা, ভীতি ও উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

একটি মহৎ উদ্যোগের অংশ হিসেবে ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। কিন্তু শুধু আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যে যেন তা থেমে না থাকে। যারা আত্মসমর্পণ করেছে তাদের জন্য করণীয় নির্ধারণ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে সুফল পাওয়া যাবে। তাদের অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার দায়িত্ব সরকারের। যারা এখনো তালিকাভুক্ত গডফাদার রয়েছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কেননা তা না হলে পুরো প্রক্রিয়া ভেস্তে যাবে এবং ইয়াবা রোধ করা সম্ভব হবে না। সবার ওপরে নজর দিতে হবে যেকোনোভাবেই হোক ইয়াবা যেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে। এ ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেমন—পুলিশ, বিজিবিসহ অন্যদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। ইয়াবার প্রকোপ যদি আমরা বন্ধ করতে না পারি, তাহলে আজকে যারা আত্মসমর্পণ করেছে, তারা জেলে থাকলেও নতুন নতুন ইয়াবা কারবারি তৈরি হতে সময় লাগবে না। সীমান্তে কঠোর নজরদারি এবং এ ক্ষেত্রে সদিচ্ছাই পারে আমাদের ইয়াবার করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে। আমাদের সম্মিলিত প্রচষ্টাই পারবে মাদকমুক্ত সমাজ উপহার দিতে।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

neazahmed_2002@yahoo.com

উৎস: কালের কণ্ঠ

শেয়ার করুন