আগুনে পুড়ে আর কত মৃত্যু

মিল্টন বিশ্বাস

রাজধানীতে আরেকটি নিমতলী ট্র্যাজেডি সংঘটিত হলো ২০ ফেব্রুয়ারি বুধবার দিবাগত রাতে। চকবাজার এলাকার রাজ্জাক ভবনে রাত ১০টা ১০ মিনিটে লাগা আগুন আশপাশের ভবনেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কয়েকটি ভবনে আগুনের থাবা নিভিয়ে দিয়েছে মানুষের জীবন আর ধ্বংস হয়েছে কোটি টাকার সম্পদ। ওই ঘটনায় নিহতের সংখ্যা শতাধিক হবে বলেই মনে হচ্ছে। জানা গেছে, রাজ্জাক ভবনের নিচতলায় রাসায়নিক দ্রব্যের কারখানা ছিল। তা ছাড়া রাজ্জাক ভবনের পাশে বেশ কিছু রেস্তোরাঁর একাধিক গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়েছে। শুরুতে গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা সেখানকার আগুনের অনুঘটক। আর ওই এলাকায় রাসায়নিক গুদাম ও কারখানায় দাহ্য পদার্থের উপস্থিতি স্বাভাবিক ঘটনা। ফলে আগুন বিস্তৃত হওয়ার জন্য মানুষের তৎপরতার দরকার হয়নি। দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় রাসায়নিক গুদাম ও কারখানার সংখ্যা ৯৯৪। এর মধ্যে ফায়ার লাইসেন্স পাওয়া মাত্র ১২৭টি। একটি প্রতিষ্ঠানের রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা রয়েছে ১০ হাজারেরও বেশি। গুদামগুলোতে দাহ্য ও অতিদাহ্য রাসায়নিক পদার্থ রাখা হলেও সেগুলো বিস্ফোরক পরিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই মালামাল সংরক্ষণ ও ব্যবসা পরিচালনা করছে। অবশ্য ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট রাত ৩টায় চকবাজারের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আদি ঢাকার এই বাণিজ্যিক এলাকায় সরু গলি হওয়ার কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারেনি। চকবাজার থানার সামনে গাড়ি রেখে সেখান থেকেই পাইপের মাধ্যমে পানি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আশপাশের ভবনের পানির ট্যাংক থেকেও ফায়ার সার্ভিস পানি সংগ্রহ করেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং একে নিজের প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু অসতর্কতা আর অসাবধানতায় ঘটে মহাবিপর্যয়। বাংলাদেশে বেশির ভাগ আগুনে পোড়ার কারণই হচ্ছে অসাবধানতা ও অজ্ঞতা। রান্না করতে গিয়ে কাপড়ে আগুন ধরে কিংবা গ্যাসের চুলা থেকে আগুন লাগে। সিগারেটের অবশিষ্টাংশ থেকে আগুনের উৎপত্তি হতে পারে। এরপর আছে বৈদ্যুতিক তারের জন্য আগুনের দুর্ঘটনা। আর বাচ্চারা অগ্নিদগ্ধ হয় কারো সঙ্গে ধাক্কা লেগে গরম পানি, চা ও ডাল শরীরে পড়ে যাওয়ায়। চকবাজার ও নিমতলীর মতো ২০১৪ সালে ঢাকার তেজগাঁওয়ে একটি কেমিক্যালের দোকানে এক দুর্ঘটনায় ১১ জন মারাত্মকভাবে অগ্নিদগ্ধ হয়ে চারজন মারা যায়। আর বাকিদের বেশির ভাগই ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পুড়ে যায়। এ ছাড়া ২০১২ সালে তাজরীন নামের পোশাক কারখানায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে শতাধিক মানুষ মারা গেছে। আর কর্মস্থলে আগুনের আরো অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ আগুনের কারণে মানুষ নিঃস্ব হয়, আপনজনদের মুহূর্তে কয়লায় পরিণত হতে দেখে জীবন সম্পর্কে বিবমিষা জাগে। পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধের ময়দানে আগুন নিয়ে খেলার অনেক গল্প রয়েছে। আগুনের নৃশংসতায় রাষ্ট্রের যেমন ক্ষতি হয়, তেমনি সমাজ ও ব্যক্তির জীবনে নেমে আসে মানসিক বৈকল্য। অথচ আগুন ছাড়া আমাদের এক মুহূর্ত চলে না।

চকবাজারের আগুন প্রসঙ্গত মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০১০ সালের ৩ জুনের ঘটনা। সেদিন নিমতলীর ৪৩ নবাব কাটরা পঞ্চম তলা বাড়িতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৩ জন প্রাণ হারায়। আহত হয় কয়েক শ মানুষ। আপনজন হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায় কয়েকটি পরিবার। অনেক মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ে, হারিয়ে ফেলে তাদের কর্মক্ষমতা। অনেকেই নিদারুণ শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছে আজও। নিমতলীর দুর্ঘটনায় সম্পদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল এক কোটি ৬৮ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। এটি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। ওই দুর্ঘটনায় আমাদের অনেক পরিচিতজনের আপনজন নিহত হয়। বাড়ির নিচে কেমিক্যাল গোডাউনে আগুন লেগে বিস্ফোরিত হয়ে ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিমতলীর ঘটনা স্মরণে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিট ও বাংলাদেশ সোসাইটি ফর বার্ন ইনজুরিস দিনটিকে ‘অগ্নিসচেতনতা দিবস’ হিসেবে পালন করে থাকে। নিমতলীর স্বজনহারা মানুষরা মর্মান্তিক ওই ঘটনার পর প্রত্যাশা করেছিল, রাসায়নিকের আগুনে আর কাউকে যেন স্বজনহারা হতে না হয়। এ জন্য তারা পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম ও দোকান-কারখানা সরাতে সরকারি সিদ্ধান্তের দ্রুত বাস্তবায়ন চেয়েছিল। গত ৯ বছরে নিমতলী থেকে রাসায়নিক পদার্থের গোডাউন এখনো সরানো হয়নি। এ নিয়ে স্বজনহারাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তবে নিমতলী ট্র্যাজেডিতে নিহতদের স্মরণে সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। তবে আগুনের বিপদ সম্পর্কে এখনো সচেতনতা তৈরি হয়নি। চকবাজারের ঘটনা সেই অবস্থাকে স্মরণ করিয়ে দিল।

আশা করছি, চকবাজারের ভয়াবহ আগুনের ঘটনা নিয়ে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দেবে। হয়তো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হবে। যেমন নিমতলী দুর্ঘটনার জন্য গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধের জন্য ১৭ দফা সুপারিশ করা হয়েছিল। সেগুলো ছিল—জরুরি ভিত্তিতে আবাসিক এলাকা থেকে গুদাম বা কারখানা সরিয়ে নেওয়া, অনুমোদনহীন কারখানার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, রাসায়নিক দ্রব্যের মজুদ, বাজারজাতকরণ এবং বিক্রির জন্য লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া জোরদার করা, ‘অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ২০০৩’ ও ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করা, আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক বা বিস্ফোরক দ্রব্যের মজুদ বা বিপণনের বিরুদ্ধে জনমত গঠন, আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক দ্রব্য বা বিস্ফোরক জাতীয় পদার্থ মজুদকরণ বা বিপণন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা, ঘরবাড়িতে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক তারের গুণগত মান নিশ্চিত করা, রাস্তায় স্থাপিত খোলা তারের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন, সম্ভাব্য দুর্ঘটনা পরিহার করতে প্রতি মাসে অন্তত একবার বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার সরেজমিনে গিয়ে পরীক্ষা করা, দ্রুত অগ্নিনির্বাপণের জন্য স্থানীয়ভাবে পৃথক পানির লাইনসহ হাইড্রেন্ট পয়েন্ট স্থাপন করা, দুর্ঘটনা মোকাবেলায় জাতীয় পর্যায়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন, রাসায়নিক ও রাসায়ানিকজাতীয় দাহ্য বস্তুর আলাদা দপ্তরের পরিবর্তে সব দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় সাধন, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগের অবকাঠামো, জনবল, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামের আধুনিকায়ন, জনসচেতনতা বাড়ানো, অগ্নিকাণ্ডের সময় যেন উত্সুক জনতা উদ্ধারকাজে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে সে জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো, পাঠ্যসূচিতে অগ্নিকাণ্ড, উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসার বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক করা, ৬২ হাজার কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা, কমিউনিটি সেন্টারগুলোকে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে ডেকোরেটরের উপকরণের সঙ্গে প্রয়োজনীয়সংখ্যক অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রাখা প্রভৃতি।

এর মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য চাহিদা অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগের অবকাঠামো বাড়ানো হলেও এখনো সেক্টরটি অত্যাধুনিকভাবে গড়ে ওঠেনি। এ জন্য আমরা মনে করি, প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলার চেয়ারম্যান, মেম্বার এবং প্রতিটি মসজিদের ইমাম ও দলীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা যেতে পারে। উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে টেলিফোন হটলাইন নাম্বার এবং ওয়েবসাইট স্থাপন (ই-মেইল ঠিকানাসহ) করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে এমন একজন প্রতিনিধি চিকিৎসক থাকবেন, যিনি পোড়া রোগী সম্পর্কে প্রতিরোধ ও পোড়া রোগী ম্যানেজমেন্ট করার তথ্য প্রদান করবেন এবং ওই হটলাইন নাম্বার মিডিয়ার স্ক্রলিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ জনগণকে অবহিত করবেন, যাতে পুড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা সম্পর্কিত বিষয়ে তথ্যাদি অনুযায়ী চিকিৎসা প্রদান করতে পারেন।

আসলে শুধু চকবাজার থেকে নয়, দেশের যেকোনো আবাসিক এলাকায় অতিদাহ্য পদার্থ বা বিপজ্জনক উপাদানের গুদাম থাকতে পারে না। এ জন্য পুরান ঢাকাসহ দেশের সব জায়গায়ই আবাসিক এলাকা থেকে বিপজ্জনক কারখানা, বিস্ফোরক ও দাহ্য পদার্থের গুদাম বন্ধে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী শুধু ২০১৭ সালে ঢাকায় সহস্রাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে এবং অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। নিমতলীর ঘটনার ৯ বছর পরও পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থে ভরপুর গুদামগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়নি বলেই আজ আবার চকবাজারে আগুনের নৃশংসতা দেখল মানুষ।

চকবাজারের অগ্নিকাণ্ড আরো একবার স্মরণ করিয়ে দিল যে রাসায়নিক গুদাম ও কারখানাগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ দ্রুত সম্পন্ন হওয়া দরকার। আর গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডারের মান সম্পর্কে কঠোর হওয়া ছাড়া এ ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। কারণ ঝুঁকিপূর্ণ কলকারখানা, গ্যাস সিলিন্ডার ও গুদামের সঙ্গে মানুষের বেঁচে থাকা এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব জড়িত। মূলত চকবাজার, নিমতলী, তাজরীন গার্মেন্ট কিংবা অন্য কোনো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড যেন না ঘটে, সে জন্য জোর প্রচার অভিযান চালাতে হবে, পাশাপাশি আবাসিক এলাকা থেকে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থের গুদাম ও কারখানা অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও নিতে হবে কঠোর আইনি ব্যবস্থা—তাহলেই আগুনে পুড়ে মৃত্যু কমানো সম্ভব।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ এবং পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

writermiltonbiswas@gmail.com

সূত্র: কালের কণ্ঠ

শেয়ার করুন