বাংলাদেশে ২০১৮ সালের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাবলী

সিলেটের সকাল ডেস্ক :: ২০১৮ সালটিতে বাংলাদেশে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছিল যা তখন আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। একাদশ সংসদ নির্বাচন ছাড়াও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড, নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলনসহ নানা ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী হয়েছে ২০১৮ সাল। বিবিসি বাংলা এসব ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। পাঠকদের জন্য তা সংক্ষেপে প্রকাশ করা হলো।

১. সংসদ নির্বাচন ও রাজনীতির উত্তাপ
২০১৮ সালের পুরো সময়টাতেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়টি আলোচনায় ছিল। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী কার্যক্রমের তৎপরতা অক্টোবরের শুরু থেকে দেখা যায়। নির্বাচনকালীন সময়ে ঘটন হয় নতুন রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি এবং কয়েকটি ছোট দল জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট নামে এ জোট নির্বাচনেও অংশ নেয়।

৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে একাদশ সংসদ নির্বাচন। ২৯৯ টি আসনে ভোট গ্রহণ হয়। গাইবান্ধার একটি আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে সেই আসনে নির্বাচন স্থগিত করা হয়। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও মহাজোট ২৮৮টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। অপর দিকে ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি জোট ৭টি আসন পায়। অন্যান্যরা বাকি ৩টি আসন পায়।

বিরোধী জোটে ‘কারচুপি ও অনিয়মের’ অভিযোগে নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যাখান করে পুন:নির্বাচনের দাবি তুললেও আওয়ামী লীগ ও নির্বাচন কমিশন তা নাকচ করে দিয়েছে।

২. খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড ও নির্বাচনে অযোগ্য
গত বছরের শুরু থেকে সবচেয়ে বড় আলোচিত বিষয়টি ছিল বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের আট তারিখ থেকে কারাবন্দী রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া।

এরপর ৩০শে অক্টোবর একই মামলায় খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করেছে হাইকোর্ট। অন্যদিকে আরেকটি দুর্নীতি মামলায় (জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট) আরেকটি বিশেষ আদালত তাকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। মামলায় দণ্ডিত হওয়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার মনোনয়ন বাতিল হয়।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এই প্রথমবারের মতো তিনি নির্বাচনে অযোগ্য হলেন।

৩. নেপাল বিমান দুর্ঘটনা
২০১৮ সালের একটি বড় ঘটনা ছিল নেপালের কাঠমান্ডুতে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান দুর্ঘটনা। ১২ই মার্চ ওই বিমানটি বিধ্বস্ত হলে ৪৯ জন মানুষ নিহত হন। এর মধ্যে ২৬জন আরোহী বাংলাদেশী।

এ দুর্ঘটনার পর নেপাল কর্তৃপক্ষ অ্যাকসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন কমিশন গঠন করেছিল। তাদের খসড়া রিপোর্টের কপি নেপালের কাঠমান্ডু পোস্ট পত্রিকা ও আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির হাতে গিয়েছিল বলে তারা দাবি করে।

এ দুটি সংবাদ মাধ্যম লিখেছিল যে তদন্ত রিপোর্টে বিমান দুর্ঘটনার জন্য পাইলট আবিদ সুলতানের আচরণকে দায়ী করা হয়েছে। তবে সেটিকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে আখ্যা দিয়ে গত ২৮শে অগাস্ট তদন্ত কমিশনের সদস্য বাংলাদেশের সালাউদ্দিন এম রহমতউল্লাহ বলেছিলেন, “ইউএস বাংলা বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে।”

৪. মাদক বিরোধী অভিযান
চলতি বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে যে ইস্যুটা ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছিল সেটি হলো মাদকের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান। গত বছর বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডে ৪ শতাধিক লোক নিহত হয়েছে – বলছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। বছরের মে মাসের ১৫ তারিখ থেকে শুরু করে অক্টোবর পর্যন্ত মাদক-বিরোধী অভিযানে চার শতাধিক লোক নিহত হয়েছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে।

মাদক বিরোধী অভিযানকে অনেকেই সাধুবাদ জানালেও কথিত বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে মানবাধিকার কর্মীরা বরাবরই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। উদ্বেগের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে তারা বিভিন্ন ফোরামে তুলে ধরেছেন।

তবে ২৬শে মে টেকনাফে কথিত বন্দুকযুদ্ধে সেখানকার পৌর কাউন্সিলর ও স্থানীয় যুবলীগের সাবেক সভাপতি মো. একরামুল হকের নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে রেকর্ড করা অডিও প্রকাশ হওয়ার পর এই ঘটনা নিয়ে সামাজিক নেটওয়ার্কে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

এর মধ্যেই ৩০শে মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন যে মাদক বিরোধী অভিযান চলছে তাতে কাউকেই রেহাই দেয়া হবে না।

৫. নিরাপদ সড়ক আন্দোলন
সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবীতে আন্দোলন বাংলাদেশে এর আগে হলেও গত বছরের অগাস্ট মাসের মত আলোড়ন তৈরি হয়নি কখনোই। ২৯শে জুলাই ঢাকার রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাস চাপায় নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা।

প্রথম কয়েকদিন স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও পরবর্তীতে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ হয় ঢাকার বিভিন্ন স্থানে। এসময় তাদের প্ল্যাকার্ড – পোস্টারসহ নানা স্লোগানে উত্তাল হয় ঢাকার রাস্তা।

তবে ৪ঠা অগাস্ট কিছু গুজব ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শনিবার আওয়ামী লীগ কর্মীদের সাথে সংঘর্ষে ঢাকার ধানমণ্ডির জিগাতলা এবং সায়েন্স ল্যাব মোড় অনেকটা রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছিল। আন্দোলনের পর ১৯শে সেপ্টেম্বর ‘বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন বিল ২০১৮’ জাতীয় সংসদে পাশ হয়।

তবে আইনের বিরোধীতা করে পরিবহন শ্রমিক ও মালিকরাও কয়েকদিন পরিবহন ধর্মঘট পালন করে।

৬. কোটা সংস্কার আন্দোলন
২০১৮ সালে বাংলাদেশে আলোচিত আরেকটি বড় ইস্যু হলো সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের আন্দোলন। এর আগে বিভিন্ন সময় কোটা পদ্ধতি সংস্কার করার দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ হলেও এপ্রিলে সেই আন্দোলন তীব্র হয়ে দেশের বেশিরভাগ উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়েছিল।

এ আন্দোলনের প্রেক্ষিত জাতীয় সংসদে দেয়া এক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন যে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা থাকবে না।

কমিটির পর্যালোচনা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মন্ত্রীসভা সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর পদের জন্য কোটা বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদন করে। নিম্নপদের জন্য কোটা পদ্ধতি বহাল রাখা হয়েছে।

অবশেষে ৪ঠা অক্টোবর কোটার বিলুপ্তি ঘোষণা করে পরিপত্র জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তবে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালের দাবিতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের সংগঠন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড ও মুক্তিযোদ্ধার পরিবার নামের দুইটি সংগঠনও আন্দোলনে নেমেছিল।

৭. উন্নয়নশীল দেশ ও স্বৈরতান্ত্রিক দেশের তালিকায় বাংলাদেশ
গত বছরের ১২ই মার্চ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিষদের উন্নয়ন নীতি বিষয়ক কমিটি বা সিডিপি বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠে আসার যোগ্যতা অর্জন করেছে বলে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা করতে হবে ২০২৪ সাল পর্যন্ত।

একটি বিশেষজ্ঞ টেকনিক্যাল কমিটির মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পাবার পর যেকোন দেশের মূল্যায়ন হয়। ২০২১ সালে এ বিষয়ে প্রথম রিভিউ হবে, বাংলাদেশ সব ক্ষেত্রে তা অর্জনকে কতটা সুদৃঢ় করেছে, এরপর ২০২৪ সালে আরেকটি মূল্যায়ন হবে।

তবে ২২শে মার্চ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে ধুমধাম করে উদযাপন করা হয় এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

কিন্তু এর ঠিক একদিন পরেই জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বেরটেলসম্যান স্টিফটুং’ তাদের এক রিপোর্টে জানায়, বাংলাদেশ এখন স্বৈরশাসনের অধীন এবং সেখানে এখন গণতন্ত্রের ন্যূনতম মানদন্ড পর্যন্ত মানা হচ্ছে না।

বিশ্বের ১২৯ টি দেশে গণতন্ত্র, বাজার অর্থনীতি এবং সুশাসনের অবস্থা নিয়ে এক সমীক্ষার পর তারা এই মন্তব্য করে।

৮. ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট
আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারা বাতিল হলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নতুন রূপে তা ফিরে আসছে বলে অভিযোগ গণমাধ্যমকর্মীদের। গত বছরের শুরুর দিনই অর্থাৎ পহেলা জানুয়ারি মন্ত্রিসভা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ নামের একটি নতুন আইনের খসড়া অনুমোদন করেছিল, যে আইনে তথ্য প্রযুক্তি বা আইসিটি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করা হয়।

এরপর থেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমের কর্মীরা। তাদের আশঙ্কা, আইনটির অনেক ধারায় হয়রানি ও অপব্যবহার হতে পারে।

এরমধ্যেই এটি ১৯শে সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাশ হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ৩রা অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে এই আইনের পক্ষে শক্ত অবস্থান তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘মিথ্যা তথ্য’ পরিবেশ না করলে সাংবাদিকদের এই আইন নিয়ে উদ্বিগ্ন হবার কিছু নেই।

তবে আইনের সংশোধনীর দাবিতে ১৫ই অক্টোবর রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ঢাকা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।

৯. রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তি
গত বছরের ১৭ই জানুয়ারি বাংলাদেশ আর মিয়ানমারের সরকার রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রত্যাবাসনের জন্য একটি চুক্তি করেছে। চুক্তি অনুযায়ী মিয়ানমার প্রতিদিন তিনশো করে প্রতি সপ্তাহে ১৫শ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে এবং দুই বছরের মধ্যে এই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শেষ করা হবে।

১৫ই নভেম্বর প্রথম দিন দেড়শ জনের মতো রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কথা থাকলেও সেটি পরে সম্ভব হয়নি।

উল্লেখ্য যে, ২০১৭ সালের অগাস্ট মাসে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সহিংসতা ও গণহত্যা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে শুরু করে রোহিঙ্গারা।

সেসময়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

মিয়ানমার সরকার তাদের বিরুদ্ধে আনা সহিংসতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

শেয়ার করুন