বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও প্রাসঙ্গিক কথা

ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন। তার স্বপ্নের স্বদেশে ফিরে এলেন। লাখো লাখো মানুষ তাকে সংবর্ধনা দিতে জড়ো হলো। তিনি মঞ্চে এলেন, আগের চেয়ে অনেক শীর্ণকায়। চোখে চশমা, বারবার চশমা ভিজে যাচ্ছে চোখের জলে। তারপরই অঝোর ধারায় তার কান্না। সেদিন রেসকোর্স বা বর্তমানের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কয়জন মানুষ চোখের পানি সামলে রাখতে পেরেছিলেন?

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে আমাদের বিজয় সূচিত হলেও ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা ও বিজয় পূর্ণতা পেয়েছিল। সে কারণে হয়তো আমাদের বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবস নিয়ে কেউ কেউ তালগোল পাকিয়ে ফেলে।
১৬ ডিসেম্বরের কিছুদিন পর আমি কুমিল্লা থেকে ঢাকা ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফের যোগদান করলাম। মুক্তিযুদ্ধকালে সশস্ত্র যুদ্ধের পাশাপাশি আমরা ‘বাংলাদেশ’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদনা ও প্রকাশনার দায়িত্ব নিয়েছিলাম। পূর্বাঞ্চলে এটাই ছিল একমাত্র প্রচার মাধ্যম। যদিও পত্রিকাটি বেনামে অর্থাৎ আবুল হাসান চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও আবদুল মমিন চৌধুরী কর্তৃক প্রকাশিত হতো, তবুও এই পত্রিকার সঙ্গে আবদুল মান্নান চৌধুরী, সৈয়দ রেজাউর রহমান, মমতাজ বেগম, সৈয়দ আহমেদ ফারুক, প্রাণ গোপাল দত্ত সরাসরি এবং শেখ ফজলুল হক মনি ও শেখ ফজলুল করিম সেলিমসহ অনেকে পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় যোগদানের পর আমি সাপ্তাহিক বাংলাদেশ পত্রিকাটি এবারে স্বনামে সম্পাদন করতে লাগলাম। আমাদের মাঝে অস্থিরতা প্রবল ছিল। এরই মধ্যে দু-দুবার ষোড়শ ডিভিশনের অস্ত্রধারী ও বৈধ অস্ত্রধারীদের পাল্লায় পড়ে জীবন হারাতে বসেছিলাম। শেষোক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়েছিল। সেদিন তিনি আমাদের বলেছিলেন, ‘দেখবে, শিগগিরই তোমাদের মামা ফেরত আসবেন, তোমাদের আর কোনো দুঃখ থাকবে না।’ বঙ্গমাতার এটা শুধু প্রত্যাশা নয় বরং অন্তরের কান্না ও বিশ্বাস ছিল। তবে বঙ্গমাতাসহ আমাদের কারও সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কোনো যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু একদিন মনে হলো আমাদের সঙ্গে তার যেন কেমন একটি টেলিপ্যাথিক যোগাযোগ হয়ে যাচ্ছে।
ফকিরাপুলের সাপ্তাহিক বাংলাদেশ কার্যালয়ে বসে আমি, সৈয়দ রেজাউর রহমান, মমতাজ বেগম ও সৈয়দ আহমেদ ফারুকসহ ৭-৮ জন আন্দাজ করতে শুরু করলাম কবে বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করতে পারেন। আজকের দিনে ব্যবস্থাপনার ভাষায় যাকে বলে ব্রেন-স্টর্মিং, তেমনি একটি আন্দাজ প্রক্রিয়ায় আমরা নিমজ্জিত হলাম। একেকজন একেক কথা বললেন। বলতে গেলে সৈয়দ রেজাউর রহমান মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে সমস্বরে আমরা বলে উঠলাম, ‘চল আমাদের পত্রিকার আগামী সংখ্যার ব্যানার হেডলাইন করি বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে আসবেন।’ আমরা যেদিন সে শিরোনাম করি সে দিন সম্ভবত একমাত্র মহান স্রষ্টা ছাড়া কেউ জানতেন না যে বঙ্গবন্ধু আদৌ দেশে ফিরতে পারবেন কি না এবং ফিরলেও সেটা কবে।
১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সাল। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরলেন। আমরা আমাদের পত্রিকায় প্রকাশিত আগের শিরোনাম সমেত পত্রিকা প্রকাশ করলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও আমি নিজ হাতে পত্রিকার হকারের কাজ করলাম। আমরা যে টেলিপ্যাথিক যোগাযোগে সে ধরনের শিরোনাম প্রায় এক সপ্তাহ আগেই করেছিলাম তা কিন্তু তেমন কেউ জানতে পারেনি বা জানলেও বিশ্বাস করেনি।
যাক বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন। তার স্বপ্নের স্বদেশে ফিরে এলেন। লাখো লাখো মানুষ তাকে সংবর্ধনা দিতে জড়ো হলো। তিনি মঞ্চে এলেন, আগের চেয়ে অনেক শীর্ণকায়। চোখে চশমা, বারবার চশমা ভিজে যাচ্ছে চোখের জলে। তারপরই অঝোর ধারায় তার কান্না। সেদিন রেসকোর্স বা বর্তমানের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কয়জন মানুষ চোখের পানি সামলে রাখতে পেরেছিলেন? তিনি অতি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলেন। বাঙালি যে মানুষ হয়েছে তার উল্লেখ করে বললেন, কবিগুরু, তোমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মধুর প্রতিশোধের সূচনা করলেন। তাদের স্বীকৃতি চাইলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে আইনানুগ পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিলেন। মুক্তিযোদ্ধাসহ সবার পুনর্বাসনের উদাত্ত ঘোষণা দিলেন। চোখের জল নিয়ে আর অপরিসীম দৃঢ়তা নিয়ে তিনি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফিরলেন। আমরাও স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে ঘরে ফিরলাম। আহা একি আনন্দ আকাশে বাতাসে।
পরক্ষণেই মনে হলো যদি কোনো কারণে বঙ্গবন্ধু ফিরে না আসতেন, তাহলে কি হতো?
সংক্ষেপে বলা যায় বঙ্গবন্ধু ফিরে না এলে দেশে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার উপক্রম হতো। সে পরিস্থিতি ঠেকাতে ভারতীয় মিত্ররা স্থায়ীভাবে এ দেশে থেকে যেতেন। গুটি কয়েক দেশ ছাড়া কেউ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিত না। মুসলিম রাষ্ট্রগুলো জোট বেঁধে পাকিস্তানের সমর্থনে নেমে পড়ত। এখানে একটা নতুন লেবানন সৃষ্টি হতো। উন্নয়নের জন্য অর্থ পাওয়া যেত না। শাসক দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে সবকিছু শেষ না হলেও শেষ হওয়ার উপক্রম হতো।
দেশরতœ শেখ হাসিনা ৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চতুর্থবারের মতো শপথ নিলেন। বঙ্গবন্ধু ফিরে না এলে কি তা সম্ভব হতো? বঙ্গবন্ধু ফিরে আসায় জননেত্রী আজ আমাদের মুখোজ্জ্বল করেছেন এবং কিছু অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। যার একটা কলম চিত্র তুলে ধরছি :
শেখ হাসিনা দেশে আসার কারণে তার দল অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর চারবার ক্ষমতায় এসেছে। এতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্প্রসারিত ও বাস্তবায়িত হচ্ছে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসায় যারা বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে উল্লসিত হয়েছিল তারাও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, ট্রেজারার হয়েছে, ব্যাংক-বীমার চেয়ারম্যান, ডিরেক্টর হয়েছে, বিদেশে রাষ্ট্রদূত হয়েছে। আরও কত কি? ব্যক্তির পর্যায় ছাড়িয়ে সামষ্টিক পর্যায়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে ও হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরেছে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে, ২১ ফেব্রুয়ারি নবমর্যাদার আসনে সমাসীন হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন হয়েছে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হয়েছে, এমনকি সামাজিক উন্নয়ন সূচক দিয়ে আমরা ভারতকে ছাড়িয়ে গেছি। অর্থনীতিতে ক্রমাগত প্রবৃদ্ধি ঘটছে। পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প স্বীয় অর্থে বাস্তবায়িত হচ্ছে; তথ্যপ্রযুক্তির সুফল প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছেছে, শিক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে, যোগাযোগ ব্যবস্থায় চোখ ধাঁধানো অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অকল্পনীয় সম্প্রসারণ ঘটেছে।
শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন না করলে এবং জীবন বাজি রেখে সামনে এগিয়ে না গেলে তার কিছুই সম্ভব হতো না। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে দেখা যাবে, শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমাদের বহু ক্ষেত্রে উল্লম্ফন ঘটেছে, তার জীবন সংকটময় হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রায় ৬ বছর পর শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন। দিনটি ছিল ১৭ মে ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দ। অবশ্য তিনি আবারও ২০০৭ সালের ৭ মে স্বল্পসময়ের জন্য বিদেশ বাসের পর বহু বাধাবিঘœ ঠেলে দেশে ফিরে আসেন। ১৯৮১ সালে তিনি দেশে ফিরে না এলে ২০০৭ সালের ৭ মে অপ্রাসঙ্গিক হতো এবং ২০০৭ সালের ৭ মে তিনি দেশে আবারও ফিরে না এলে তার আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ এবং ক্ষমতায় বসে অভূতপূর্ব অর্জনও কল্পনার বস্তু হয়ে থাকত।
তিনি দেশে না এলে ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগ দলটি মুসলিম লীগের মতো হয়তো টিমটিম করে বেঁচে থাকত, তবে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলাদেশ হারিয়ে যেত। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের কনফেডারেশন সম্ভব না হলেও দেশটি একটি মিনি পাকিস্তানে রূপান্তরিত হতো। ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি’র পরিবর্তে ‘ফজরে উঠিয়া আমি দিলে দিলে বলি’ হয়তোবা বলতে হতো। রাজাকাররা চিরস্থায়ী রাজা-বাদশাহ হয়ে সবার শিরে চেপে বসত। মুক্তিযোদ্ধাদের বিচার হতো, মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশ তিব্বতের দালাইলামা ও তার অনুসারী কাঞ্ছা ও কাঞ্ছিতে রূপান্তরিত হতো। এ কাঞ্ছাদের কথা আমি আগেও বলেছি। মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিংকালে আমার, শেখ জামাল ও শেখ মারুফের জন্য যে কাঞ্ছাটি ব্যাটসম্যান হিসেবে নিয়োজিত ছিল, তার ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলে যেত। মুক্তিযোদ্ধাদের অকাতরে খুন করা হতো, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত পরিবর্তিত হয়ে যেত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকত না অর্থাৎ আমাদের দীর্ঘমেয়াদি মুক্তির সংগ্রামটা স্থগিত হয়ে যেত; ধর্মের ধ্বজাধারীরা দেশটাকে চষে বেড়াত, বাংলা ভাষা ও জাতি বিলুপ্তির পথে যেত ও ক্রমেই প্রতিটি মানুষ ইসলামাবাদের গোলামে পরিণত হতো। দেশে প্রত্যাবর্তনের পর ১৯৮১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত এবং ২০০২-২০০৮ পর্যন্ত শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ছিলেন না, তবুও ক্ষমতাসীনদের ওপর এতটা চাপ সৃষ্টিতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন যে, ক্ষমতাসীন প্রতিপক্ষরা সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন এনে দেশটাকে ইসলামি রিপাবলিকে ঠেলে দিতে পারেনি। তিনি ফিরে না এলে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ইতিহাসের গহ্বরে হারিয়ে যেত। আমাদের দেশটা হতো একান্তই সাম্প্রদায়িক দেশ।
শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসায় মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাগুলো সংবিধানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা জাল ও সামাজিক মঙ্গল বিস্তৃত হয়েছে। একটি মেডিকেল কলেজের জায়গায় দেশে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা এখন শতের কাছাকাছি। এক সময়কার সর্বসাকুল্যে ৫৮টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেশে ১৫০টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে বলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হচ্ছে, ব্রেনড্রেন কমে যাচ্ছে এবং যুগোপযোগী শিক্ষা সহজলভ্য হয়েছে, ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট লক্ষ্য নির্দিষ্ট সময়ের আগেই অর্জিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে প্রতিস্থাপন করায় ডিজিটালাইজেশন বেগবান হয়েছে। চিরশত্রু পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আমাদের স্তরে পৌঁছার আকাক্সক্ষা পোষণ করেছেন।
শেখ হাসিনা ফিরে না এলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটা হতো দা-কুড়ালের। সমুদ্র বিজয় বা ছিটমহল সমস্যা সমাধান হতো অকল্পনীয়; এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রাম সংকট নিরসনও। এসবেও শেখ হাসিনার অপরিহার্যতার স্বীকৃতি মিলেছে। আমরা বিশ্বের বুকে একটা মর্যাদাবান জাতি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার কিংবা মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের সুযোগ তার কারণেই পেয়েছি।
শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের কর্ণধার হিসেবে না থাকলে ১৯৯২ সালে দলটি সম্পূর্ণ ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত। ২০০১ সাল থেকে শুরু করে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বিভীষিকাময় অধ্যায় এবং প্রচ- বাধা অতিক্রম করে দলটি ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হতে পারত না। আর ২০০৯ সালে ক্ষমতারোহণের পর বিগত ১০ বছরের সাফল্যের সামান্য কিছু নমুনা নিম্নের টেবিলে তুলে ধরছি যা থেকে আবারও প্রমাণিত হবে শেখ হাসিনা বাংলা ও বাঙালির জন্য কতটা অপরিহার্য :
শেখ হাসিনা আমাদের মাথা তুলে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন। তিনি দেশে ফিরে না এলে তার তেমন কোনো ক্ষতি ছিল না। দেশে না ফিরলে তার ব্যক্তিজীবন ও সন্তানদের জীবন মোটামুটি সচ্ছলভাবে চলে যেত। দেশে ফিরে এসে তিনি নিজের জীবন ও সন্তানদের জীবনকে সংকটাপন্ন করেছেন। সংকটাপন্ন করেছেন বোনের জীবন। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এমন নেতা আছেন কি না যিনি বারবার সম্ভাব্য হামলার শিকার হয়েও বেঁচে আছেন। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, আল্লাহ তায়ালা বঙ্গবন্ধুকে পাঠিয়েছিলেন আমাদের গোলামির জিঞ্জির ভাঙার জন্য আর শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন কোনো এক বিশাল অর্জনের জন্য। সেসব অর্জন কি দৃশ্যমান হচ্ছে না; দৃশ্যমান হয়েছে, আরও দৃশ্যমান হবে এবং শেখ হাসিনা সে ক্ষেত্রেও অপরিহার্য রয়ে যাবেন।
বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে পদার্পণ করেছে। তাকে যেতে হবে বহুদূর। আগামী ৫ বছরে তাকে অন্তত ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার ৭.৮৬ শতাংশ; অতএব উপরিউক্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে ২.১৪ শতাংশ অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতেই হবে। শুধু দুর্নীতি সামাল দিতে পারলে আমাদের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে পৌঁছে যাবে। তাই শেখ হাসিনার লক্ষ্যমাত্রা অসম্ভব কিংবা উচ্চাকাক্সক্ষার প্রকাশ নয়। এ দুর্নীতির সঙ্গে আরও বহু কিছু জড়িয়ে আছে। এসব ব্যাপারে শূন্য সহিষ্ণুতার কথা শেখ হাসিনা তার নির্বাচনি ম্যানিফেস্টোতে ঘোষণা করেছেন। তার প্রতিশ্রুতিকে অবজ্ঞা করা যায় না। কেননা, এ যাবত তিনি তার প্রতিশ্রুতির কোনো বরখেলাপ করেননি।
দেশে আরেকটি কঠিন সংকট ও সমস্যা হচ্ছে বেকারত্ব। দেশে প্রতি বছর ২১ লাখ লোক চাকরি ও কর্মের বাজারে প্রবেশ করছে। সে হিসাবে কর্মশিকারির সংখ্যা পাঁচ বছরে হবে ১ কোটি ৫ লাখ; কিন্তু শেখ হাসিনা প্রায় দেড় কোটি কর্মসৃজন করবেন। এটা তিনি কীভাবে করবেন তার নির্দেশনাও খানিকটা দিয়েছেন।
চাকরির ভিত্তি সম্প্রসারণের জন্য রপ্তানি প্রক্রিয়াজাত জোন বৃদ্ধি আবশ্যক। আগামী বছরগুলোতে প্রায় ১০০টি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ জোন তৈরি হলে বছরে ব্যাপকসংখ্যক মানুষকে দেশেই কর্মদান সম্ভব। এ বেকারত্বের সঙ্গে যোগ হয়েছে মাদক, দুর্নীতি, জঙ্গিবাদ।
মাদক ও জঙ্গিবাদ দমনে পৃথক সম্মুখ সমরের কৌশল রয়েছে। তবে তার জন্য গেরিলা কায়দা হচ্ছে কর্মসংস্থান। মনে হচ্ছে পাঁচ বছরের মাথায় ওইসব লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে না; কিন্তু এসবের জন্যও যে শেখ হাসিনারই প্রয়োজন।
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্থায়িত্ব আনয়ন অর্থাৎ টেকসই উন্নয়নের জন্য ও উন্নত দেশে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন শিক্ষা এবং স্পষ্ট করে বলতে গেলে উচ্চশিক্ষা। উচ্চশিক্ষা হলেই হবে না, তাকে হতে হবে প্রাসঙ্গিক ও মানসম্পন্ন। আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ম্যানিফেস্টোতে শিক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ব্যয়ের অঙ্গীকার প্রকাশ করা হয়েছে। তবে প্রতি স্তরে মানসম্পন্ন শিক্ষা যাতে নিশ্চিত হয় সেজন্য অবকাঠামোগত সুবিধাদিসহ দক্ষ, যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের চাহিদা মেটাতে হবে।
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হবে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না থাকলে এ দুটি কর্ম কি সুষ্ঠুভাবে পালিত হবে? অতএব শেখ হাসিনা ও তার দলের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য।
সবশেষে স্পষ্ট করে বলা যায়, শেখ হাসিনা না থাকলে দল হিসেবে এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী হিসেবে আওয়ামী লীগ ভঙ্গুর থেকে যেত। শেখ হাসিনা না থাকলে দুস্থ অসহায় মানুষের জন্য দুস্থ ভাতা, স্বামী পরিত্যক্তা ও বিধবা মহিলাদের জন্য ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্কদের জন্য শান্তি নিবাস, আশ্রয়হীনদের জন্য আশ্রয়ণ, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প বাস্তবায়ন হতো না; শেখ হাসিনা না থাকলে কৃষি, শিল্প, যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হতো না। উচ্চ আয়, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সম্ভব হতো না; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সম্ভব হতো না; স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার কল্যাণ এ মাত্রায় পৌঁছত না; ডিজিটাল বাংলাদেশ হতো না; সমুদ্র বিজয় ও ব্লু-ইকোনমির স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যেত; ছিটমহলের মানুষ আজও মানবেতর জীবনযাপন করত; উত্তরবঙ্গে মঙ্গা চিরস্থায়ী হয়ে যেত; দেশে বন্যা ও নদীভাঙন চিরায়ত রূপ নিত; অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ সুদূর প্রমাণিত হতো; খেলাধুলা বিশেষত ক্রিকেট ও মহিলাদের ফুটবলে শিরোপা অর্জন দিয়ে পরিচিতি ও মর্যাদা বৃদ্ধি সম্ভব হতো না; এমডিজি অর্জন হুমড়ি খেয়ে পড়ত; এসডিজি কল্পনায় আস্তানা গাড়ত। -আলোকিত বাংলাদেশ

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ

শেয়ার করুন