জিএম ফসল সম্প্রসারণ এবং কালচারাল ট্যাবু

ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস

জিএম ফসলের শরীরে একাধিক বাইরের জিন থাকে। আর এখানেই বিরুদ্ধবাদীদের ভুল-বোঝাবুঝির শুরু। তাদের ধারণা, জিনগুলো মানুষের শরীরের মধ্যে গিয়ে অস্বাভাবিক নানা রোগব্যাধির সৃষ্টি করতে পারে। শুধু তা-ই নয়, পরিবেশের জন্যও ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাদের অবগতির জন্য বলছি, এ জন্যই তো গবেষণা। বিজ্ঞানের আধুনিকতম গবেষণার ফলে বিজ্ঞানীরাই নির্ধারণ করে থাকেন এই ফসল মানুষ ও পরিবেশের জন্য নিরাপদ কি না। নিরাপদ প্রমাণিত হলেই শুধু জাত হিসেবে অবমুক্তির জন্য আবেদন করা হয়।

সন্দেহবাদীরা আরো অনেক কথা বলে থাকেন। যেমন—ফল ও ডগা ছিদ্রকারী কীট (কীট) প্রতিরোধী কোনো জিএম ফসলের জাত যেমন বিটি বেগুনের কথা। প্রথম দিকে জাতটি নিশ্চয়ই ওই কীটের আক্রমণ ভালোভাবেই প্রতিরোধ করতে পারবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে আক্রমণকারী কীটগুলোর ভেতর থেকে একদল প্রতিরোধী কীটের জন্ম হওয়া স্বাভাবিক। যেমন অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগের ক্ষেত্রে দেখা যায়। তখন এই বিটি বেগুনের জাত প্রতিরোধী কীটগুলোর সঙ্গে আর পেরে উঠবে না। আগাছানাশক (বিশেষ করে গ্লাইফসেট) প্রতিরোধী ভুট্টা বা সয়াবিনের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। কেউ কেউ বলছেন, আগাছানাশক প্রতিরোধী যে ফসলের জিএম জাতগুলো উদ্ভাবন করা হচ্ছে—এতে করে গ্লাইফসেট-জাতীয় আগাছানাশকের ব্যবহার বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। ফলে কী হচ্ছে? আগাছা দমনের জন্য পরিচর্যাব্যবস্থাটা সহজ এবং সাশ্রয়ী হলেও উপর্যুপরি প্রয়োগের ফলে মাটি এবং পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। দিন দিন আগাছানাশক প্রতিরোধী অপ্রতিরোধ্য সুপার আগাছার জন্ম হচ্ছে। আবার যাঁরা এই প্রযুক্তির পক্ষে বলছেন, তাঁদের পক্ষেও যুক্তির অভাব নেই। তাঁরা বিরুদ্ধবাদীদের চ্যালেঞ্জ করছেন। একটি বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণ দেখানো হোক যে জিএম খাদ্য খেয়ে মানুষের স্বাস্থ্যহানি হয়েছে। কারণ বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ‘ক্ষতিকর’ প্রমাণিত হলে জাত হিসেবে আবাদের জন্য সুপারিশই করেন না। আর পরিবেশের দোহাই দেওয়া হচ্ছে। ফসলের ক্ষেতে কীটনাশক প্রয়োগের দরকার না হলে বা তুলনামূলক কম পরিমাণ দিতে হলে মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতি হওয়ার সুযোগ নেই। গ্লাইফসেটের বিষয়েও যুক্তি আছে। আগাছাবিশারদদের মতে, গ্লাইফসেট বা অনুরূপ জাতের আগাছানাশকগুলো তুলনামূলক নিরাপদ। এরা ফসলের শরীরে বেশিদিন কার্যকরী থাকে না। পাতার বাইরে ছিটকে পড়া এ ধরনের আগাছানাশকের কণাগুলো মাটির কণার সঙ্গে সহজেই আটকে যায়। ফলে ধুয়ে গিয়ে পানিতে মিশে যেতে পারে না। এবং জায়গায় থেকেই ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে নিরাপদ দ্রব্যে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আর কতখানি সাশ্রয়ী সে বিষয়েও যুক্তি আছে। বালাইগুলো তাদের প্রতিরোধী প্রজন্ম তৈরি করে ফেললেও অসুবিধা নেই। কারণ কৃষি গবেষণা একটি অবিরত প্রক্রিয়া। পুরনো জাতগুলো নতুন জাত দিয়ে বদলে দিলেই হলো। আরেকটা প্রচলিত বক্তব্য হলো, জিএম ফসলের বীজের দাম বেশি, বালাইনাশকের জন্য অতিরিক্ত খরচ ইত্যাদি। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক কিছু বক্তব্য হলো, বহুজাতিক কম্পানির কাছে কৃষকের জিম্মি হয়ে পড়া। কিন্তু এসব বালাইনাশকের যথাযথ প্রয়োগের ফলে ফলন বাড়ছে যথেষ্ট পরিমাণে। হাতের কাছে বিটি বেগুনের উদাহরণ। একসময় পোকার আক্রমণে তিন ভাগের দুই ভাগ বেগুন ফেলে দিতে হতো। এখন সেটা করতে হয় না। একই কথা প্রযোজ্য অন্যান্য বালাইনাশকের ব্যাপারেও। তা ছাড়া জিএম প্রযুক্তি তো শুধু পোকা-মাকড় বা রোগবালাই দমনের জন্য নয়। এই প্রযুক্তির সাহায্যে ফসলের ফলন বাড়ানো সম্ভব। ফসলের খাদ্যমান বাড়ানো সম্ভব। বৈরী পরিবেশে অভিযোজনের উপযোগী ফসলের জাত উদ্ভাবন সম্ভব। যেমন—ধানের বেলায় সি-৪ ধান উদ্ভাবনের চেষ্টা সফল হলে ফলন বেড়ে যাবে উল্লেখযোগ্যভাবে। সাম্প্রতিককালে ভিটামিন ‘এ’ রাইস উদ্ভাবন করা হয়েছে। যা দেশের ভিটামিন ‘এ’-এর অভাব প্রশমনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারবে। ফলে এই মাইক্রোনিউট্রেন্টের অভাবের দরুন যত প্রকার রোগ হতে পারে, সেগুলোর প্রকোপও একসময় কমে আসবে।

এভাবেই জিএম ফসল বা প্রযুক্তি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক তর্কবিতর্ক চলছে। তার পরও কিন্তু এ ধরনের ফসলের আবাদ বাড়ছে। ১৯৯৬ সালে প্রথম জিএমের বাণিজ্যিক আবাদ শুরু হয়। ২০১৭ অবধি বেড়ে দাঁড়ায় ১৮৯.৮ মি হেক্টর। বৃদ্ধির ধারা বেশ ঊর্ধ্বমুখী। সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত সারা বিশ্বের ২৪টি দেশে শুধু এ ধরনের ফসল আবাদের অনুমতি আছে। এর মধ্যে ১৯টি উন্নয়নশীল দেশ এবং পাঁচটি উন্নত। ২০১৭ সালের এক উপাত্ত অনুসারে সর্বোচ্চ জিএম ফসল আবাদকারী প্রথম ১০টি দেশ হলো—ইউএস (৭৫ মি হেক্টর), ব্রাজিল (৫০.২ মি হেক্টর), আর্জেন্টিনা (২৩.৬ মি হেক্টর), কানাডা (১৩.১ মি হেক্টর), ভারত (১১.৪ মি হেক্টর), প্যারাগুয়ে (৩.০ মি হেক্টর), পাকিস্তান (৩.০ মি হেক্টর), চীন (২.৮ মি হেক্টর), দক্ষিণ আফ্রিকা (২.৭ মি হেক্টর) এবং বলিভিয়া (১.৩ মি হেক্টর)। বাকি দেশগুলোর মধ্যে পড়ে উরুগুয়ে, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, সুদান, স্পেন, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, ভিয়েতনাম, হণ্ডুরাস, চিলি, পর্তুগাল, বাংলাদেশ, কোস্টারিকা, স্লোভাকিয়া, চেক রিপাবলিক। সামগ্রীকভাবে আবাদি আওতা বৃদ্ধির হারও বেশ উল্লেখযোগ্য। ২০১৭ সালে বৃদ্ধির পরিমাণ ২০১৬ সালের তুলনায় ৩.০ শতাংশ।

বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশে জিএম ফসলের আবাদ এখনো নিয়ন্ত্রিত।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত সরকারগুলো জিএম খাদ্যের বেলায় এখনো বেশ রক্ষণশীল। যাহোক, এই পার্লামেন্টের অধীন দেশগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা থাকায় স্পেন, পর্তুগাল, ইংল্যান্ড জিএম প্রযুক্তির পক্ষে। স্পেন ও পর্তুগাল স্বল্পপরিসরে হলেও জিএম ভুট্টা বেশ আগে থেকেই আবাদ করে আসছে। এ ছাড়া ইউরোপিয়ান ফুড সেফটি অথরিটি তাদের বাজারে অবাধ কেনাবেচা এবং ব্যবহারের জন্য লেবেলিং (Labeling) সাপেক্ষে ৬০টি জিএম ফসলের অনুমতি দিয়ে রেখেছে। তবে ফুড সেফটি অথরিটির অনুমতিই শেষ কথা নয়। সেখানকার সাধারণ জনগণের চিন্তা-চেতনার একটা বিশেষ মূল্য আছে। তারা জিএম প্রযুক্তি গ্রহণের ব্যাপারে এখনো তেমন আগ্রহী নয়। অথচ আটলান্টিকের ওপারের দেশগুলো বিশেষত ইউএসের সরকার এবং জনগণ এ ব্যাপারে যথেষ্ট উদার। সেটা কিভাবে সম্ভব হয়েছে তা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা চিন্তাভাবনা করছেন। এমনই একজন হাঙ্গেরীয় গবেষকের (Orsolya Ujj, 20161) কথা এখানে বলছি। তাঁর মতে, এই পার্থক্যের প্রধান কারণ সাংস্কৃতিক কাঠামো। ইউএসের প্রথম দিকের অভিবাসীরা ছিল ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে পাড়ি জমানো ভাগ্যান্বেষী মানুষের দল। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি কোনোক্রমেই এক ছিল না। তাই নতুন দেশে, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া ছিল খুবই কঠিন। সেই পরিস্থিতিতে অতীত ঐতিহ্য বা সংস্কৃতির দিকে তাদের ফিরে তাকানোর ফুরসত কোথায়। সময়ের প্রয়োজনে তাদের নিজেদের মতো করে ঘাস-জঙ্গল পরিষ্কার করে জমি উদ্ধার করতে হয়েছে। ফসল উৎপাদন করতে হয়েছে। রাস্তাঘাট, শহর-বন্দর গড়ে তুলতে হয়েছে। সেটা তারা করেছে নিজেদের চাহিদা মোতাবেক। তখন তো সব কিছুর জোগান আসত কৃষি থেকে। ভিন্ন পরিবেশে তাদের ফসল আবাদের ধরন ইউরোপ থেকে আলাদাভাবে শুরু হয়। একই সঙ্গে জীবনযাপন, আহারবিহার এমনকি চিন্তা-চেতনা পরিবর্তিত হয়ে একধরনের মিশ্র ধারার তৈরি হয়। একসময় কৃষিকে লাভযোগ্য করার জন্য দাসনির্ভরতা থেকে যান্ত্রিকনির্ভর হতে হয়। পাশাপাশি গবেষণার মাধ্যমে ফসলের উন্নত সংস্করণ উদ্ভাবনেরও তাগিদ ছিল। এবং অভিবাসী আমেরিকানরাই প্রথম প্রথাসিদ্ধ আধুনিক কৃষিশিক্ষা ও গবেষণা পদ্ধতি চালু করে। অন্যদিকে ইউরোপের কৃষি ছিল ঐতিহ্য ও প্রকৃতিনির্ভর। দেশভেদে, গোত্রভেদে প্রত্যেকের নিজস্ব কৃষ্টি ছিল। এবং তারা তো হাজার কষ্টের পরও নিজের মাটি আঁকড়ে পড়ে ছিল। আর সে কারণেই তারা কিছুতেই নিজের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিতে রাজি নয়। একই ধারা মাথায় রেখে প্রচলিত কৃষির বাইরে কোনো পরিবর্তন তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। যদিও ইউরোপের কৃষি এখন যন্ত্রনির্ভর। কিন্তু ফসলের ভেতরে জেনেটিক মোডিফিকেশনকে তারা এখনো গ্রহণ করতে রাজি নয়। তবে বিজ্ঞানীদের কথা আলাদা। আটলান্টিকের এপার-ওপার দুপারেই সব নামকরা গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা ইউরোপের এই ঐতিহ্য ভাঙতে তৎপর। কারণ তাঁরা বলছেন যে প্রচলিত জিএম খাবার আর স্বাভাবিক খাবারের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তাই স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা করা অমূলক।

প্রসঙ্গত বলতে হয়, এ ব্যাপারে বাংলাদেশের ভূমিকা বেশ প্রশংসনীয়। জিএম ফসল বা প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্র প্রস্তুতির কাজ শুরু হয় বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকে। সম্ভবত আমাদের বিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্ট পলিসিমেকাররা বুঝতে পেরেছিলেন যে জনভার ও বৈশ্বিক উষ্ণতার মুখে দাঁড়িয়ে কৃষি গবেষণার সর্বশেষ প্রযুক্তিগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। আর তার ফলে জিএম প্রযুক্তির আগমন। মাঝে অনেক চড়াই-উতরাই পার হতে হয়েছে। এরই মধ্যে বিটি বেগুন মাঠে আবাদ হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য প্রথম ভিটামিন ‘এ’সমৃদ্ধ গোল্ডেন রাইস এখন পাইপলাইনে। আমাদের দেশেও অনেকে জিএম ফসল নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে থাকেন। আমাদের দেশ জনভারে জর্জরিতই বলা যায়। তারপর বৈশ্বিক উষ্ণতা ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’। দেশকে খাওয়ানোর দায়িত্ব সরকার, কৃষিবিদ ও কৃষিবিজ্ঞানীদের। তাঁরা যদি জিএম ফসল ও প্রযুক্তিকে নিরাপদ মনে করতে পারেন, তাহলে আর সন্দেহ পোষণ করার কী থাকে?

লেখক : ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা

শেয়ার করুন