উন্নয়ন ও সুশাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে

এম হাফিজউদ্দিন খান

সদ্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। নির্বাচন কেমন হয়েছে, তা নিয়ে নানা কথা, তর্ক ও বিতর্ক আছে। অনেক কথা, শোনা কথা এবং চারপাশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও ছবি দেখে আমার নিজের মধ্যেও নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সব দলের মধ্যেই নানা কথা ও আলাপ গুঞ্জরিত হচ্ছে। সেসব নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই। ভবিষ্যতে কী হয়, তা দেখার জন্য এখন তা ছেড়ে দেওয়াই ভালো। সামনে নতুন সরকার গঠন করা হবে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও ক্যাবিনেট সদস্যরা শপথ গ্রহণ করবেন। শপথ গ্রহণের সেই প্রক্রিয়া ও খবর দেখতে পাচ্ছি। গতবারের সংসদে বিরোধী দল বলে তেমন কিছু ছিল না। এবারও বিরোধী দল সংসদে যাবে কি না তা এখনো পরিষ্কারভাবে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। এবার তো আওয়ামী লীগ বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। ফলে বলা যেতে পারে, বিরোধী দল বা অপজিশন বলে কিছু থাকছে না। সংসদে বিরোধী দল না থাকাটা ভালো নয়। এতে গণতন্ত্রের ক্ষতি হয়। আমাদের সুধীসমাজের যে প্রত্যাশা ও লক্ষ্য—দীর্ঘদিন ধরে আমরা যে আন্দোলন করে যাচ্ছি, সভা করছি ও বক্তব্য দিচ্ছি, তার পেছনে আমাদের একটাই উদ্দেশ্য—একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেও আমাদের সেই লক্ষ্যটাই ছিল—গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সে রকম গণতান্ত্রিক পরিবেশ তো এখনো দেখতে পাচ্ছি না। তবে সরকার চাইলে সবই সম্ভব। গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সরকারের ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট বলে আমি মনে করি। সংসদে বিরোধী দলের শক্তিশালী ভূমিকা না থাকলেও সরকার চাইলে একটি গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা দেশে তৈরি করতে পারে। সেই সুযোগ ও অবকাশ সরকারের আছে।

এখন দেশে নতুন সরকার এসেছে। তারা অনেক দিন ক্ষমতায় ছিল। নতুন করে একটি সর্বদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে তারা আবার বিজয়ী হয়েছে। সরকার গঠন করবে। তারা নির্বাচনের আগে নির্বাচনী ইশতেহারে অনেক কথা বলেছিল। যেসব প্রতিশ্রুতি তারা দিয়েছে, ইচ্ছা করলে সেসব তারা আগেও পূরণ করতে পারত। তারা তা করেনি বা সেই সুযোগ হয়নি। নতুন সরকারের দায়িত্ব বা দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা হচ্ছে, সেই অঙ্গীকারগুলো পূরণ হোক।

নতুন সরকারের সাফল্য বৃদ্ধি এবং গ্রহণযোগ্যতা রক্ষা পাবে নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে। বিশেষ করে তারা প্রধান যে অঙ্গীকারগুলো সামনে এনেছিল—মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চেতনা ধরে রাখা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা বা জিরো টলারেন্স নীতি। এটাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে যে প্রজেক্টগুলো চলমান আছে, সেগুলো বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করা। কোনোভাবেই যেন চলমান বড় প্রকল্পগুলো ঝুলে না যায়।

তবে একটা বিষয়ে বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই—এরই মধ্যে এসব বিষয়ে অর্থনীতিবিদরা বলেও দিয়েছেন; তা হচ্ছে ভবিষ্যতে বড় প্রজেক্টগুলোতে হাত দেওয়ার আগে তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এক নম্বর হচ্ছে ইকোনমিক প্ল্যান ও প্রায়রিটি; দ্বিতীয় বিষয় কস্ট বেনিফিট এবং তৃতীয়টি হচ্ছে অপরচুনিটি কস্ট। এখানে প্রথম বিষয়টি ইকোনমিক প্ল্যান ও প্রায়রিটি—এটি হচ্ছে গ্রামে গ্রামে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ আগে দরকার, নাকি গ্রামের যেসব স্কুল-প্রতিষ্ঠানে বেঞ্চ-চেয়ার নেই, বেড়া ও ছাদ নেই সেসব আগে ঠিক করতে হবে? সেটা প্রথমে বিবেচনায় নিতে হবে। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে কস্ট বেনিফিট অপরচুনিটি—যে প্রজেক্টটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তা থেকে আমরা কী উপকার পেলাম। রাষ্ট্র এ থেকে কী বেনিফিট পাচ্ছে, এসব খতিয়ে দেখতে হবে। খরচ ও সুবিধার মানদণ্ড বা তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে অপরচুনিটি কস্ট। প্রজেক্টের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খরচের একটা খতিয়ান থাকা। এর কারণ হচ্ছে, অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের যেকোনো বড় প্রজেক্টের খরচ অনেক বেশি। সড়ক নির্মাণ ও মেরামত, সেতু বা ইমারত নির্মাণে আমাদের খরচ অনেক বেশি। এ বিষয়গুলোয় নজর দিতে হবে।

একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। এই যে নির্বাচন উপলক্ষে আমাদের দেশে ইভিএম আনা হয়েছে, এর খরচ কিন্তু অন্য দেশের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। তারপর ইভিএম খুব ভালোভাবে যে কাজ করেছে—এমন নয়। নির্বাচন চলাকালীন ইভিএম ব্যবহার করা যায়নি বা বন্ধ হয়ে গেছে বলে খবরও বেরিয়েছে। সে কারণে মানুষ যথাসময়ে ভোট দিতে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সে যাহোক, ভবিষ্যতে নতুন সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে যে মানুষ কথা তুলতে পারে, তেমন বড় বিষয় যেন খুব একটা সামনে না আসে।

এরপর রাস্তার কথা ধরা যাক। ঢাকা-চট্টগ্রাম যে চার লেনের রাস্তার কাজ করা হলো, এর মেয়াদ ২০ বছর। কিন্তু এক বছর পরই আবার রিপেয়ার করতে হলো। এগুলো যেন আবার না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ সবই তো প্রত্যাশা আমাদের। আর এগুলো কিন্তু দুর্নীতির কারণে হয়। সরকার যেহেতু বলেছে, নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা দিয়েছে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারা বিশেষ অভিযান চালাবে। কাজেই আমরা অত্যন্ত আশাবাদী। আশা করি, সামনে নতুন ও ভালো কিছু আমরা দেখতে পাব। যেকোনোভাবেই হোক দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। তা না হলে সরকারের ভালো অর্জনকেও ম্লান করে দেবে। এটা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

সামাজিক বৈষম্য দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে। গরিব আরো গরিব হচ্ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশে ধনীর সংখ্যা অনেক বেশি। ক্রমাগতভাবে তা বাড়ছে। এর একটা নিয়ন্ত্রণ দরকার। না হলে সামাজিক বৈষম্য কোনোভাবেই ঠেকানো সম্ভব হবে না। এসব নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দেবে। এ বিষয়টি যত্নসহকারে দেখতে হবে। এটা এক দিনে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। কিন্তু পদক্ষেপটা জরুরিভাবে নিতে হবে। আবার আমাদের মতো বয়স্ক মানুষদের নিয়েও সরকারকে ভাবতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি আমার কথা বলি। আমি যে বেতন পেতাম বা সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরে বর্তমানে যে সুবিধা পাই, তা একজন সচিবের দারোয়ান বা বাবুর্চির চেয়েও কম। ফলে সামাজিকভাবে আমাদের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। এ বিষয়টি সরকার মানবিকভাবে বিবেচনা করবে, সেই প্রত্যাশা রাখি। এসব নিয়ে কিন্তু আমার মতো অবসর জীবন যাঁরা যাপন করছেন, তাঁদের অনেকের মধ্যে ক্ষোভ-দুঃখ-হতাশা দেখতে পাই। নতুন সরকার এ বিষয়টি যেন গুরুত্ব দিয়ে ভাবে।

ব্যাংকিং সেক্টরে পাহাড়সমান সমস্যা তৈরি হয়েছে। এর রাশ টানতে হবে। আবুল মাল আবদুল মুহিত সাহেব আমার অত্যন্ত প্রিয় মানুষ। তিনি অনেক দিন এ খাতে কাজ করেছেন। কিন্তু সত্যি বলতে তিনি তেমন কোনো জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। এটা ভালো হয়নি। ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি ও অনিয়মগুলো শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ব্যাংকগুলো তো দেউলিয়া হওয়ার পথে। ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করার যে মানসিকতা ও সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, এটি কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। এটি চলমান আছে। দিন দিন তা আরো শক্তশালী হচ্ছে। ব্যাংক মালিক অ্যাসোসিয়েশন ব্যাংকের অবস্থা চরম খারাপ অবস্থায় নিয়ে গেছে। ঋণ পরিশোধ না করে সমাজে ঋণগ্রহীতা প্রতাপ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এবারের সরকারে হয়তো মুহিত সাহেব থাকবেন না। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকারে নতুন অর্থমন্ত্রী আসবেন। তিনি এ সেক্টরে অত্যন্ত মানবিকভাবে এবং শক্ত হাতে অনিয়ম ও দুর্নীতিগুলো বন্ধ করার পদক্ষেপ নেবেন। এবারের সরকার জনগণের সরকার হবে। জনগণের জন্য কাজ করবে এবং মানুষের সুখ-দুঃখ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে—আমরা সেই আশা করি।

আমরা যে সুদীর্ঘ সময় ধরে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলে আসছি, বক্তৃতা ও আন্দোলন করে আসছি, এর পেছনে কয়েকটি বিষয়ই মুখ্য, তা হচ্ছে—গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশন, পাবলিক কমিশন, নিয়োগসংক্রান্ত স্বচ্ছতার জন্য আইন তৈরি করা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও খুন বন্ধ করা—এসব নিয়েই আমরা কথা বলে আসছি। নতুন সরকার আমাদের এই প্রত্যাশাগুলো পূরণ করবে, সেই অপেক্ষায় আছি।-কালের কণ্ঠ

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

শেয়ার করুন