মুক্তির সংগ্রামের বাস্তবায়ন

গোলাম কবির

বর্তমানে বাংলাদেশের দৃশ্যমান উন্নয়ন নিকট-অতীতের তুলনায় ব্যাপক। তবুও বঙ্গবন্ধু যে আলোকে সামাজিক বিন্যাসের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের ভাবনা জেল জীবনে পোষণ করতেন, তেমনটি হয়ে ওঠেনি। তবে বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বঙ্গবন্ধুর চেতনাপ্রসূত সমাজ গঠন কঠিন হবে না। এ ব্যাপারে আমরা কিঞ্চিৎ পেছন ফিরে তাকাই। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত প্রায় সিকি শতাব্দীর বেশির ভাগ সময় বঙ্গবন্ধু কারাজীবনে ক্লিষ্ট থেকেও দেশের মুক্তির কথা ভোলেননি।

১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৫ তারিখে লাহোরে বিরোধী দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা পেশ করেন। এতে তখনকার পাকিস্তান সরকার ক্ষিপ্ত হয়ে সেই যে তাঁকে নতুন করে গ্রেপ্তারের পালা শুরু করে, তার আপাতসমাপ্তি ঘটে ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২২ তারিখে বাঙালির দুর্বার আন্দোলনের চাপে। জেলে থাকার সময় তিনি দেশের মানুষের কল্যাণ ও মুক্তির জন্য কতখানি নিবিড় ছিলেন, তার প্রমাণ তাঁর রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’। ১৯৬৬ সালের জুন মাসের ২০ তারিখে লেখা তাঁর ভাবনার কিছু অংশ আমরা পড়ে দেখতে পারি। ‘এই দেশের হতভাগা লোকগুলি খোদাকে দোষ দিয়ে চুপ করে থাকে। ফসল নষ্ট হয়েছে, বলে আল্লাহ দেয় নাই, না খেয়ে আছে, বলে কিসমতে নাই। ছেলে-মেয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যায়, বলে সময় হয়েছে বাঁচবে কেমন করে! আল্লাহ মানুষকে এতো দিয়েও বদনাম নিয়ে চলেছে।… আল্লাহ তো অল্প বয়সে মরার জন্য জন্ম দেয় নাই। শোষক শ্রেণি এদের সব সম্পদ শোষণ করে নিয়ে এদের পথের ভিখারি করে, না খাওয়াইয়া মারিতেছে।… কই গ্রেট ব্রিটেনে তো কেহ না খেয়ে মরে না। রাশিয়ায় তো বেকার নাই, সেখানে তো কেহ না খেয়ে থাকে না,…।’ (কারাগারের রোজনামচা, শেখ মুজিবুর রহমান, সপ্তম মুদ্রণ, বাংলা একাডেমি, পৃষ্ঠা ১০৯-১১০)

দৈব নির্ভরতার অজুহাতে শোষণ থেকে মুক্ত করার জন্য বঙ্গবন্ধু যে সংকল্প ধারণ করেছিলেন, তার সারসংক্ষেপ ছিল একাত্তরের ৭ই মার্চের মহাকাব্যিক ম্যাগনাকাটার আপ্তবাক্যে, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধুর সেই মুক্তির বাণী কথার কথা ছিল না। তিনি আক্ষরিক অর্থেই বাংলার মানুষকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। যে মুক্তি রাজনৈতিক শিকল কিংবা আগ্রাসন থেকেই নয়, যাপিত জীবনের আনন্দময় মুক্তি। অনেকে ভিনদেশি দর্শন আওড়িয়ে ছকে বাঁধা সমাজ পরিবর্তনের কিছু ধ্যান-ধারণার কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু পরের মুখে ঝাল না খেয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেশের পুরনো কাঠামোকে সংস্কার করে নতুন একটা পথনির্দেশ করতে চেয়েছিলেন। তথাকথিত বিপ্লব করে মানব হত্যার দায় নিতে চাননি। জনগণ আর প্রশাসনকে মুখোমুখি করে নয়, পাশাপাশি রেখে যোগ্যতার ভিত্তিতে পারিতোষিক ও মূল্য দিয়ে পর্বতপ্রমাণ বৈষম্যের নিরসন করতে চেয়েছিলেন। ভূস্বামীদের জমি সীমিত করে করপোরেটওয়ালাদের শোষণ খর্ব করে বঞ্চিত শ্রমিক-কৃষককে দৈব নির্ভরতার সংস্কৃতি থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। এ জন্য মানবমুক্তির যে ফরমান তিনি পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সূচনা করতে চেয়েছিলেন, তা মানবমুক্তির বিদ্বেষীরা ইতিহাসের জঘন্য কলঙ্ক রচনা করে রুদ্ধ করে দেয়। যদি তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতো, তবে দেখা যেত বর্তমানের উন্নয়নের সঙ্গে সব শ্রেণির ব্যক্তি-মানুষের অধিকতর উন্নয়ন হতো। ধর্মীয় সমাজ কাঠামো তিনি ভাঙতে চাননি। চেয়েছিলেন মানুষের সম্পদলিপ্সার একটা সীমারেখা টানতে। তাতে সবার সুখের মধ্যে প্রকৃত সুখের দেখা মিলত। সুশৃঙ্খল স্বাধীনতার মধ্যে মানুষ প্রকৃত মুক্তির স্বাদ পেত।

দীর্ঘকাল ধরে যারা মানুষের রক্ত শোষণ করেছে এবং ধর্মের নামে ব্যক্তিগত ভোগলিপ্সার চরিতার্থ করেছে, তারাই তাদের কর্মধারাকে অক্ষুণ্ন রাখার অভিপ্রায়ে কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করে বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দিয়েছে। এতে খুশি হয়েছে কাল্পনিক দৈববাদ প্রচারকারী কিছু ব্যক্তি। ব্রিটিশ আমলার উত্তরাধিকার কিছু আমলা, সর্বোপরি পরজীবী কিছু রাজনীতিক, যারা আজ্ঞাবাহী, ক্ষমতাধরদের পদলেহী দালাল, গাছেরটা খায় তলেরটাও কুড়ায়। সে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি আমরা করব না।

এবারের ৪৭তম বিজয়ের দিনে আমাদের নতুন করে সংকল্প নেওয়ার পালা, বঙ্গবন্ধু যে আলোকে মানুষের মুক্তি চেয়েছিলেন, তা কার্যকর করা। পরিতাপের বিষয়, এখন চারপাশে শুধু মেকি আর ভুয়ার ছড়াছড়ি। এখনকার রাজনীতি অনেকটা সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখনো যাঁরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন না, তাঁরাই এখন রাজনীতির শিখণ্ডী। এদের ‘নিজের কোলে ঝোল টানা’ ছাড়া দেশের ও দশের মুখের পানে চাওয়ার সময় কই? এভাবে ভাগ্যবান হয়ে তাঁরা বঞ্চিত মানুষকে সান্ত্বনা পেতে অদৃষ্টের প্রতি বিশ্বাস করতে শেখায়। এই বঞ্চিতরা রবীন্দ্রনাথের ভাষায়; ‘নাহি জানে কার দ্বারে দাঁড়াইবে বিচারের আশে-/দরিদ্রের ভগবানে বারেক ডাকিয়া দীর্ঘশ্বাসে/মরে সে নীরবে/’। ফলে সমাজে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে ‘কেউ মরে বিল সেচে কেউ খায় কৈ!

আমরা বিশ্বাস রাখতে পারি, বঙ্গবন্ধুর মানবকল্যাণ ভাবনা যাঁদের অন্তরে তিল পরিমাণ বিদ্যমান, তাঁরা অবশ্যই তাঁর প্রদর্শিত পথে দেশ পরিচালনায় শপথ নেবেন। তখন তাঁর বজ্রনির্ঘোষ বাণী, ‘এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ’ সফল হবে।

এ দেশের মানুষের মুক্তি-কামনায়-বঙ্গবন্ধুর নাম অক্ষয়। জানি না, সংখ্যাতীত নমিনেশন প্রাপ্তির জন্য ভিড়কারীরা তাঁর মতো কতটুকু নিঃস্বার্থ মুক্তিকামী। সত্যিকার মুক্তিকামী না হয়ে যদি দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার মতলব থাকে, তবে মহাকাল তাঁদের ছাড় দেবে না। জনগণও কল্পকাহিনিতে কান দিতে নারাজ। তাঁরা বাস্তবে পেতে চান। তাই এবারের বিজয় দিবসের লক্ষ্য হওয়া উচিত বঙ্গবন্ধুর কাম্য মুক্তির বারতা। – উৎস: কালের কণ্ঠ

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ

শেয়ার করুন