ভাসানী : এক মহীরুহের অগ্নিক্ষরা সংগ্রামী জীবন

গাজীউল হাসান খান

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আসামের প্রত্যন্ত ভাসানচর অঞ্চলে তাঁর ছিল দীর্ঘদিনের সংগ্রাম। ছিন্নমূল বাঙালিদের সেখানে বসতি দিয়েছিলেন তিনি। সেই থেকে তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ‘ভাসানী’ শব্দটি। আর তাঁরই নামানুসারে সে অঞ্চলের নাম হয়েছিল হামিদাবাদ। সেই থেকে ভাসানীর সংগ্রামী জীবনের শুরু না হলেও সেটি অবশ্যই ছিল একটি মাইলফলক। উপমহাদেশ এবং বিশেষ করে বাংলার (তৎস্যলীন আসামসহ) কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আজীবন গ্রাম-গঞ্জে বসবাসকারী ভাসানী আন্দোলন করেছিলেন একটি বিশাল আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে। সংগৃহীত বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী এ বছর ১২ ডিসেম্বর জননেতা মওলানা ভাসানীর ১৩৮তম জন্মবার্ষিকী পালিত হবে। তাঁর জন্ম ১৮৮০ সালে তৎস্যলীন পাবনার সিরাজগঞ্জের এক প্রত্যন্ত গ্রামে। পিতা হাজি শরাফত আলী খান ছিলেন সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি।

ভাসানী পশ্চিমা প্রথাগত শিক্ষায় নয়, উচ্চতর ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। তৎস্যলীন উত্তর ভারতের ইসলামী শিক্ষার কেন্দ্র দেওবন্দ মাদরাসার ছাত্র হলেও তিনি ক্রমে ক্রমে ঝুঁকে পড়েছিলেন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদবিরোধী বামপন্থী প্রগতিশীল ধারার রাজনীতির দিকে। সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মওলানা ভাসানী সর্বভারতীয় রাজনীতি, জাতীয় কংগ্রেস দল, খিলাফত আন্দোলন এবং মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সেখানেই শেষ নয়, পাকিস্তান অর্জনের মাত্র এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যেই তিনি পাকিস্তানের একটি বিশেষ শ্রেণির, আধা ঔপনিবেশিক ও আধা সামন্ততান্ত্রিক রাজনীতি এবং শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রথমে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা এবং তার কিছুদিন পরই পূর্ব বাংলার পূর্ণ সার্বভৌমত্ব দাবি করে গণ-আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ নিহত হলেও তার উপসমকল্পে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। তার প্রতিবাদে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন বর্জন করেছিলেন মওলানা ভাসানী। পাকিস্তানের অপশাসন ও শোষণ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে তিনি বেছে নিয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের পথ। সে নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে তৎস্যলীন আওয়ামী লীগ ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও ক্ষমতা লাভ করতে পারেনি, অর্থাৎ তাঁকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। প্রতিবাদে মওলানা ভাসানী তাঁর প্রিয় উত্তরসূরি বঙ্গবন্ধুর গণ-আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন।

২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকাসহ পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সর্বত্রই পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুরু করেছিল। মধ্যরাতের পর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তখন মওলানা ভাসানী ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। এবং বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তখন মওলানা ভাসানী ছিলেন বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সমন্বয় কমিটির সভাপতি। নেতৃত্বের প্রশ্নে ভাসানী কখনো বঙ্গবন্ধুর প্রতিপক্ষের ভূমিকা পালন করেননি। তা ছাড়া এ কথা অনস্বীকার্য যে বঙ্গবন্ধুর জীবনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকশিত হয়েছিল মওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্নেহচ্ছায়ায়।

‘মজলুম জননেতা’ হিসেবে পরিচিত মওলানা ভাসানীর সংগ্রামী চরিত্র কিংবা রাজনীতির স্বরূপ উদ্ঘাটন করা অত্যন্ত একটি দুঃসাধ্য ব্যাপার। কারণ ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত ভাসানীর সংগ্রামী রাজনীতির দোসর ছিল বামপন্থী কিংবা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে বিশ্বাসী নেতাকর্মীরা। একটি সংসদীয় রাজনৈতিক দলের প্রধান হয়েও তিনি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ধারা কিংবা তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায় বিশ্বাস করতেন না। গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতিতে বুর্জোয়া নেতারা যে দেশের আপামর কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়টি নিয়ে তাদের শ্রেণিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে; তা মওলানা ভাসানী মনে করতেন না। সে কারণেই এই উপমহাদেশের প্রথাগত ক্ষমতার রাজনীতি কোনো দিনই তাঁকে অনুপ্রাণিত করতে পারেনি। গ্রাম-গঞ্জের কৃষককুল কিংবা শহর-নগরের ব্যাপক শ্রমিক শ্রেণি ও অন্যান্য মেহনতি মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য এ দেশের প্রেক্ষাপটে তিনি অনেক পথের সন্ধান করেছেন। ‘কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের রাজ’ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। বস্তুবাদী রাজনৈতিক জগতে আধ্যাত্মিকতার সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছেন। সে কারণে জীবনের শেষ দিকে ইসলামী সমাজতন্ত্রের রূপরেখা প্রণয়নে অত্যন্ত তৎপর হয়ে উঠেছিলেন।

সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, সামন্তবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্য ও লড়াই ছিল আপসহীন। তাঁর জীবদ্দশায়, বিশেষ করে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ক্রমে ক্রমে তিনি আন্তর্জাতিকতাবাদের কথা বলেছেন অনেক বেশি। আফ্রো-এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার কোটি কোটি মেহনতি মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে আরো বেশি সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন। সে কারণে গণমাধ্যম তাঁকে অনেক সময় আফ্রো-এশিয়া, লাতিন আমেরিকার শোষিত, নির্যাতিত ও বঞ্চিত মানুষের একজন দরদি নেতা ও নির্ভরশীল বন্ধু বলে আখ্যায়িত করেছে। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে তৎস্যলীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন সংগঠনে থেকে কাজ করেছেন তিনি। কারাবরণ করেছেন বছরের পর বছর। প্রথম ও বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দুনিয়াজুড়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অপতৎপরতা ও বিস্তার ভাসানীকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। রণনীতি ও রণকৌশলগত দিক থেকে বাংলাদেশের জাতীয় নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনীতি ছিল অসংখ্য মতভেদের সম্মুখীন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কারো কারো মতে ভাসানীর রাজনীতি ছিল তাঁর সমকালীন যুগের তুলনায় অনেক অগ্রসর। উপমহাদেশ, বিশেষ করে পাকিস্তানের আমলে, নিয়মতান্ত্রিক কিংবা সংসদীয় পদ্ধতিতে তৎস্যলীন পূর্ব পাকিস্তানের গণমানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আসবে বলে ভাসানী বিশ্বাস করতেন না। সে কারণে তিনি বেছে নিয়েছিলেন রাজপথে গণ-অসন্তোষ প্রকাশ এবং সর্বোপরি গণ-অভ্যুত্থানের পথ। বায়ান্নর মাতৃভাষা আন্দোলন থেকে চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন কিংবা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ এবং পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানে ভাসানীর অগ্নিগর্ভ আন্দোলনের স্বরূপ বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে। সে কারণে উনসত্তরের গণ-আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন তাদের কভারে (প্রচ্ছদে) ভাসানীকে তুলে ধরেছিল ‘প্রফেট অব ভায়োলেন্স’ (প্রচণ্ড বিক্ষোভ কিংবা সহিংসতার নবী) হিসেবে। অন্যদিকে ২০০৪ সালে অর্থাৎ তাঁর মৃত্যুর বহু পরে বিবিসি তাঁকে সর্বকালের অষ্টম শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।

মওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধে যতই ‘জ্বালাও পোড়াও’ কিংবা সহিংস আন্দোলনের অভিযোগ থাকুক না কেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে উপনিবেশবাদী অথবা গণতন্ত্রহীন স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলনের সে কৌশলের তখন কোনো বিকল্প ছিল না। কারণ সে ধরনের শাসকরা সংসদীয় পদ্ধতিতে জনগণ কিংবা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে কোনো সমস্যা সমাধানের পক্ষপাতী ছিল না। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর কথা ছেড়ে দিলেও পাকিস্তান আমলে পশ্চিমা (পশ্চিম পাকিস্তানি) সেনা ও আমলাতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন দাবির মুখে সংসদ কিংবা বিভিন্ন সময় গঠিত সরকার ভেঙে দিচ্ছিল। সে অবস্থায় হরতাল ও অবরোধসহ রাজপথে আন্দোলন কিংবা গভর্নর হাউস ঘেরাওয়ের কৌশল বেশ কিছুটা ফল দিয়েছিল। তাতে তৎস্যলীন দেশি গণমাধ্যমও ভাসানীকে চিত্রিত করেছে উপমহাদেশের রাজনৈতিক বিক্ষোভ ও বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের অগ্নিপুরুষ হিসেবে। আবার কেউ কেউ তাঁকে আখ্যায়িত করেছেন একজন ক্ষণজন্মা রাজনীতিক হিসেবে। ব্রিটিশ শাসনাধীন আসামে বাঙালিদের বিতাড়নের বিরুদ্ধে তিনি যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তার পর থেকে ব্রিটিশ শাসন ও বৃহত্তরভাবে উপনিবেশবাদ, সামন্তবাদ ও বৃহত্তরভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ক্রমে ক্রমে ভাসানীর হস্তদ্বয় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিবাদে ও প্রতিরোধে বারবার খোলা তরবারির মতো ঝলসে উঠেছিল। জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় তিনি ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ও পাকিস্তানি ফ্যাসিবাদী সরকারের বন্দিশালায় কাটিয়েছেন। কিন্তু কখনোই ‘মজলুম জননেতা’ হিসেবে পরিচিত এ অগ্নিপুরুষ মেহনতি ও ভুখানাঙা মানুষের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে কারো সঙ্গে আপস করেননি।

ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে ও সাতচল্লিশের বিভক্তির পর পাকিস্তানের আইন পরিষদ কিংবা সংসদে মাত্র দুবার গিয়েছিলেন ভাসানী। তার কারণ হচ্ছে, তৎস্যলীন ব্রিটিশ কিংবা পরবর্তী সংসদের (পাকিস্তান) মাধ্যমে এ দেশের ব্যাপক কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি জনতার কোনো দাবি আদায় হবে বলে বিশ্বাস করতেন না তিনি। তাঁর ভাষায়, তথাকথিত সংসদগুলো ছিল বুর্জোয়া শ্রেণির ‘হালুয়া-রুটি’ ভাগাভাগির কেন্দ্র। মওলানা আবদুল হামিদ খান ১৯০৯ সালে টাঙ্গাইল জেলার কাগমারিতে একটি প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। তখনো তিনি ভাসানী হয়ে ওঠেননি। ১৯১৭ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ডাকে একটি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলে (স্বরাজ পার্টি) যোগদান করেন এবং রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। পরে অর্থাৎ ১৯১৯ সালে তিনি বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ আলীর উৎসাহে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান করেন। এবং ১৯২০ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান গ্রেপ্তার হয়েছিলেন রাজনৈতিক কারণে। এ সময় তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ১৯২১ সালে দেশবন্ধুর ডাকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন করতে গিয়ে আবার কারাবরণ করেন এ প্রতিবাদী নেতা। জেল থেকে বেরিয়ে ১৯৩০ সালে তিনি মুসলিম লীগে যোগদান করেছিলেন। ১৯৩৭ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান আসামের ধুবরীর দক্ষিণ নির্বাচনী এলাকা থেকে আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত সে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এরই মধ্যে ১৯৪৪ সালে তিনি দলের বারপেটা অধিবেশনে মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তা ছাড়া আসামের বিভিন্ন স্থানীয় দাবিদাওয়া নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ‘মওলানা ভাসানী’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালে অনুষ্ঠিত সিলেট গণভোটে আসামের মুসলমানদের অংশ নিতে উজ্জীবিত করেছিলেন তিনি। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর পরই মওলানা ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তানের সামন্তবাদী ও আমলাতান্ত্রিক রাজনীতিতে অত্যন্ত হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। তখনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে গণতন্ত্রহীন ও আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে পাকিস্তান ভেঙে পড়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সে রাষ্ট্রে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তথা কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি জনতার কোনো দাবি আদায় বা স্বপ্নপূরণের সম্ভাবনা নেই। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের অকালমৃত্যুর পর পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি কিছু অরাজনৈতিক অথচ প্রভাবশালী সামন্তবাদী এবং সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের খপ্পরে নিপতিত হয়েছিল। তাতে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর অর্থনৈতিক শোষণ-শাসন ও বৈষম্য অতি দ্রুত বেড়ে যাচ্ছিল।

সে অবস্থায় পাকিস্তান মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগ করলেন মওলানা ভাসানী। তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের আরো অনেকে। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে মওলানা ভাসানী গঠন করলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। মওলানা ভাসানী সে দলের প্রেসিডেন্ট এবং টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে এ দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে তাতে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল। সে দলের নেতৃত্বে আরো ছিলেন ইয়ার মোহাম্মদ খান, শওকাত আলী ও তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেকে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কিছুটা সময় পরে এ দলে যোগদান করেছিলেন।

আওয়ামী লীগ গঠনের পরপরই মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিস্তারিত কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন নবীন দলটির নেতারা। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি মওলানা ভাসানী ঢাকা বার লাইব্রেরিতে গঠন করেছিলেন সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম কমিটি। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ভাসানী ছাত্র-জনতার সঙ্গে আন্দোলন চালিয়ে যান। ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচন অনুষ্ঠানকে উপলক্ষ করে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয়েছিল। তাতে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ, শেরেবাংলার কৃষক শ্রমিক পার্টি ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী মাঠে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন, বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠাসহ আরো বেশ কিছু আর্থ-রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে মাঠে নেমেছিল যুক্তফ্রন্ট। সে নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়েছিল। সে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর আওয়ামী লীগের গঠিত প্রাদেশিক সরকারকে পাকিস্তানের তৎস্যলীন গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ অতি অল্প সময়ের মধ্যে বাতিল ঘোষণা করেছিলেন। শেরেবাংলা ফজলুল হকের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ভাঙার অভিযোগ আনা হয়েছিল। তখন মওলানা ভাসানীর ওপর নেমে আসে বিভিন্ন বিধিনিষেধ। সে সময় মওলানা ভাসানী স্টকহোমে অনুষ্ঠিত শান্তি সম্মেলনে যোগ দিতে গেলে তাঁর দেশে ফেরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। পরবর্তী সময় পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে দেখা দেয় বিভিন্ন গড়িমসি। তা ছাড়া পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছিল অসামান্য পরিবর্তন। পাকিস্তান তার নিরাপত্তার প্রশ্নে সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সেন্ট্রো ও ‘সিয়াটো’সহ বিভিন্ন সামরিক নেতৃত্ব পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থের বিরুদ্ধে সেসব দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হলে তার প্রতিবাদে ভাসানী ১৯৫৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তান ত্যাগ করেন। ২৪ ও ২৫ জুলাই ভাসানী পাকিস্তানব্যাপী সব গণতান্ত্রিক নেতার এক জরুরি সভা ডাকেন টাঙ্গাইলের কাগমারিতে। ২৫ জুলাই মওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। তাতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে অক্ষত রেখে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কর্তৃত্বাধীনে ‘সেন্টো’ ও ‘সিয়াটো’সহ সব সামরিক চুক্তি বাতিলের দাবি জানান ভাসানী।

১৯৬৫ সালে সংঘটিত ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর মওলানা ভাসানী আইয়ুব খানের চীনঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতির কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাহায্য ও সমর্থনের জন্য চীন সফর করেছিলেন। ভাসানী কয়েক দফা চীনের তৎস্যলীন প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই ও গণচীনের মহান বিপ্লবী নেতা মাও জেদংয়ের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের লৌহমানব আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তানের দাবি মেনে না নিলে ভাসানী দেশব্যাপী আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। সে কারণে অক্টোবর ১৯৬৮ সালে মওলানা ভাসানীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। জেল থেকে মুক্ত হয়ে পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬৯ সালে মওলানা ভাসানী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সহযোগীদের মুক্ত করার জন্য এক ব্যাপক আন্দোলনের কর্মসূচি প্রদান করেছিলেন। সে আন্দোলনই পাকিস্তানব্যাপী এক গণ-অভ্যুত্থানের সৃষ্টি করে, যাতে শেষ পর্যন্ত স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পতন ঘটেছিল। ১৯৭০ সালে মওলানা ভাসানী লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা দাবি করেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও এ দেশের কৃষক-শ্রমিক ও খেটে খাওয়া ব্যাপক দরিদ্র মানুষের বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে কয়েকবার গর্জে উঠেছিলেন মওলানা ভাসানী। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি অপত্য স্নেহ ও তৎস্যলীন বিভিন্ন রাজনৈতিক জটিলতার কারণে টাঙ্গাইলের সন্তোষ থেকে ঢাকায় অনশন ধর্মঘট করতে এসেও নীরবে ফিরে গেছেন তিনি। বঙ্গবন্ধু তাঁর এই বৃদ্ধ সহযোদ্ধাকে তুলে নিয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। বিভিন্ন আলাপ-আলোচনা ও পরামর্শের পর নিজ দায়িত্বে আবার সন্তোষের জীর্ণ কুটিরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। সঠিকভাবে নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত এ দেশটির পরিচালনার উদ্দেশ্যে ভাসানী বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে পত্রপত্রিকায় যথেষ্ট বিবৃতি দিতেন। সেগুলো শুধু বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা নয়, বরং তাতে দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধ ফুটে উঠত। তিনি বঙ্গবন্ধুর সরকারের উদ্দেশে দেশব্যাপী সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম, সংকট ও সমস্যার কথা তুলে ধরতেন। ঢাকায় ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার বেশ আগে থেকেই মওলানা ভাসানীর সান্নিধ্যে এসেছিলেন সেদিনের তরুণ বাঙালি অগ্নিসন্তান শেখ মুজিবুর রহমান। পরে এই আপসহীন তরুণ নেতাই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এক পরিবর্তিত আওয়ামী লীগের। এবং তাঁরই নেতৃত্বে আমরা অর্জন করেছিলাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা, যা বাঙালি জনগোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠ অর্জন বলে বিবেচিত হয়েছে। এ বাংলার স্বাধীনতা ছিল মওলানা ভাসানীর আজন্ম স্বপ্ন। তাই ভাসানীর বুকে একটি স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছিলেন সংগ্রামী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে যখনই জনতার এই দুই অবিসংবাদিত নেতা মিলিত হয়েছেন, তখনই দেখা গেছে বঙ্গবন্ধুকে তাঁর পিতৃতুল্য এই বর্ষীয়ান নেতাকে জড়িয়ে ধরে তাঁর বুকে অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় মাথা রেখেছেন। এ দৃশ্য বিরল।

মওলানা ভাসানী এক অর্থে বঙ্গবন্ধুর মধ্যে তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখতে চেয়েছিলেন, যা অনেকের কাছে অজানা। ভাসানী তাঁর শেষ বয়সে কখনো কখনো প্রকাশ্য সভায় নির্দ্বিধায় বলতেন, পাকিস্তান ও পরবর্তী সময়ে তাঁর আধাডজন সেক্রেটারির মধ্যে (দলের সাধারণ সম্পাদক) শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সবচেয়ে যোগ্য ও কর্মক্ষম, মাঠপর্যায়ে জনগণের সঙ্গে যিনি প্রকৃতপক্ষেই একটি ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও এ বয়োবৃদ্ধ নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং তাঁর দেখাশোনার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠী সব সময়ই মনে করত ভাসানী একান্তভাবেই তাদের নিজস্ব সম্পদ। তারা নবতিপর এই বৃদ্ধ জননেতাকে অন্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে চাইত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই স্বার্থবাদী গোষ্ঠী কি ভাসানীকে কখনো আড়াল করে রাখতে পেরেছে? তবে নিঃস্বার্থ এই জননেতাকে অনেকে অনেকভাবে ব্যবহার করতে চেয়েছে তাঁর জীবনসায়াহ্নে কিংবা তাঁর তিরোধানের পরেও। ফলে এ মহান নেতার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি কখনো। মওলানা ভাসানী একজন জাতীয় নেতা অথচ তাঁর জন্ম কিংবা মৃত্যুবার্ষিকীগুলোও পালিত হয় না জাতীয়ভাবে। যারা ভাসানীর সবচেয়ে কাছের, তারাই তাঁকে দূরে ঠেলে দিয়েছে সবচেয়ে বেশি। মওলানা ভাসানীর মতো নেতার জন্য কারো করুণা চাওয়া অবান্তর। কারণ অনাদিকালজুড়ে এ দেশ ও এ জাতি যত দিন টিকে থাকবে, মওলানা ভাসানীকে কেউ অবহেলা কিংবা অবজ্ঞা করতে পারবে না। তাঁর সংগ্রামী আদর্শের মৃত্যু নেই। ইতিহাসই তাঁর সঠিক মূল্যায়ন করবে, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। ভাসানী স্মৃতি অমর হোক। সূত্র: কালের কণ্ঠ

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস)

সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। স্বাধীনতা-পূর্ব ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের কার্যকরী সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা

gaziulhkhan@gmail.com

শেয়ার করুন