পিইসি ও জেএসসির ফলাফল এবং অন্য রকম বাস্তবতা

মাছুম বিল্লাহ

এবার জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১ থেকে ১৫ নভেম্বরের মধ্যে। এতে অংশ নিয়েছিল ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ১৬৯ জন শিক্ষার্থী। পিএসসি ও ইবতেদায়ি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ১৮ থেকে ২৬ নভেম্বরের মধ্যে এবং ৩০ লাখ ৯৫ হাজার ১২৩ জন পরীক্ষার্থী এতে অংশ নেয়। ২৪ ডিসেম্বর অর্থাৎ কমবেশি এক মাসের মধ্যে পরীক্ষা দুটির ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এবার জেএসসি ও জেডিসিতে পাস করে ২২ লাখ ৩০ হাজার ৮২৯ জন শিক্ষার্থী—অর্থাৎ পাসের হার ৮৫.৮৩ শতাংশ। গত বছর এই হার ছিল ৮৩.৬৫ শতাংশ। এবার মোট জিপিএ ৫ পেয়েছে ৬৮ হাজার ৯৫ জন, গত বছর পেয়েছিল ৯১ হাজার ৬২৮ জন। পিইসি পরীক্ষায় এবার ২৫ লাখ ৮৮ হাজার ৯০৪ জন শিক্ষার্থী সব বিষয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। তাদের মধ্যে ১১ লাখ ৮১ হাজার ১৯ জন ছাত্র, ১৪ লাখ সাত হাজার ৮৮৫ জন ছাত্রী। পাসের হার ৯৭.৫৯ শতাংশ। জিপিএ ৫ পেয়েছে তিন লাখ ৬৮ হাজার ১৯৩ জন। ছাত্র এক লাখ ৬১ হাজার ৪১১ জন এবং ছাত্রী দুই লাখ ছয় হাজার ৭৮২ জন। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার বেড়েছে ২.৪১ শতাংশ এবং জিপিএ ৫ বেড়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৮৪ জন। ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় মোট দুই লাখ ৭৪ হাজার ৯০৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে সব বিষয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে দুই লাখ ৬৮ হাজার ৫৫৭ জন। তাদের মধ্যে এক লাখ ৩৬ হাজার ৯৮৮ জন ছাত্র এবং এক লাখ ৩১ হাজার ৫৬৯ জন ছাত্রী। পাসের হার ৯৭.৬৯ শতাংশ। জিপিএ ৫ পেয়েছে ১২ হাজার ২৬৪ জন, তাদের মধ্যে ছাত্র পাঁচ হাজার ৯২৪ এবং ছাত্রী ছয় হাজার ৩৪০ জন। গত বছরের তুলনায় পাসের হার বেড়েছে ৪.৭৫ শতাংশ। জিপিএ ৫ বেড়েছে সাত হাজার ২৪১ জন। এবার জেএসসিতে শীর্ষে অবস্থান করছে বরিশাল বোর্ড, যেখানে পাসের হার ৯৭.০৫ শতাংশ এবং সর্বনিম্নে সিলেট বোর্ড, এই বোর্ডে পাসের হার ৭৯.৮২ শতাংশ। জেএসসি ও জেডিসিতে এ বছর ছাত্রের তুলনায় দুই লাখ ৫৫ হাজার বেশি ছাত্রী পাস করেছে। ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের পাসের হার ১.৩১ শতাংশ বেশি। এবার জিপিএ ৫ পেয়েছে ২৮ হাজার ১৯০ জন ছাত্র আর ছাত্রী ৩৯ হাজার ৯০৫ জন। ঢাকা মহানগরীর স্কুলগুলোতে গড় পাসের হার ৯০ শতাংশ আর ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে ৮০ শতাংশ।

কুমিল্লা বোর্ডে জেএসসিতে পাসের হার এক লাফে ২৪.১৬ শতাংশ বেড়ে গেছে। গত বছর এই বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬২.৮৩ শতাংশ আর এবার সেখানে এই হার ৮৬.৯৯ শতাংশ। এই বোর্ডে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পাসের হার ৮৯ থেকে ৯৩ শতাংশের মধ্যেই ওঠানামা করত। কিন্তু গত বছর তা হঠাৎ ৬২.৮৩ শতাংশে নেমে গিয়েছিল। কুমিল্লা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে, ‘আমরা গণিত ও ইংরেজির শিক্ষকদের নিয়ে বোর্ডের প্রতিটি জেলায় ওয়ার্কশপ পরিচালনা করেছি, তাদের সমস্যার কথা শুনে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি, তার ফল আমরা পেয়েছি।’ ইংরেজি ও গণিতে কয়েকটি ওয়ার্কশপ করেই যে এই বিষয় দুটির মানের ওপর খুব একটা প্রভাব ফেলা যায় না, তা শিক্ষাসচেতন ব্যক্তিমাত্রই বোঝেন। তবে বেছে বেছে প্রশ্ন নির্বাচন করা, বিশেষ বিশেষ জায়গায় জোর দিয়ে পরীক্ষার টেকনিক অ্যাপ্লাই করা ও নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার মতো কৌশল অবলম্বন করলে ফল যে এভাবে লাফ দিতে পারে, সেটি সবাই বোঝে। আমাদের পুরো ব্যবস্থার মধ্যে শুধু কুমিল্লা বোর্ড বা কোনো একটি জেলাকে দোষারোপ করার কোনো যুক্তি নেই। সবাই বাতাসের অনুকূলে ধাবিত হবে—এটিই স্বাভাবিক।

২০০৯ থেকে জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার শুরুতে চতুর্থ বিষয়ের নম্বর যোগ করা হতো না। তখন জিপিএ ৫ পাওয়ার সংখ্যা সীমিতই থাকত। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই মূল নম্বরের সঙ্গে যোগ করা হয় চতুর্থ বিষয়ের নম্বর। এতে শিক্ষার্থীদের গড় নম্বর বেড়ে যেত। জিপিএ ৫ লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে যেত। এবার (২০১৮) চতুর্থ বিষয়ের নম্বর বাদ দেওয়ায় এক লাফে নেমে গেছে জিপিএ ৫ পাওয়ার হার। এভাবে আমাদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে থাকে। একবার একটি বিষয় যুক্ত করা হয় আবার আরেকটি বাদ দেওয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে এবারের পরীক্ষায়ও সংস্কার আনা হয়। ফলে এক পরীক্ষায় জিপিএ ৫ কমেছে আবার অন্য পরীক্ষায় তা বেড়ে যায়। ২০১৭ সাল থেকেই জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, কর্মমুখী শিক্ষা এবং চারু ও কারুকলা বিষয় ধারাবাহিক মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়। এবার থেকে চতুর্থ বিষয় কৃষিশিক্ষা ও গার্হস্থ্য বিজ্ঞানকেও স্কুলের মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়। এর অর্থ হচ্ছে, এ বিষয়গুলো বিদ্যালয়েই মূল্যায়ন করা হবে; এগুলোর ওপর কোনো পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে না। এ ছাড়া এত দিন ৮৫০ নম্বরের পরীক্ষা হলেও এবার থেকে বাংলায় দুই পত্র থেকে ৫০, ইংরেজি দুই পত্র থেকে ৫০ এবং চতুর্থ বিষয় থেকে ১০০ নম্বর বাদ দেওয়া হয়—অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের ৬৫০ নম্বরের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়েছে। এতে পাসের হার বাড়লেও জিপিএ ৫ পাওয়ায় কিছুটা বিপর্যয় ঘটে।

সার্বিকভাবে জেএসসি ও জেডিসিতে গত বছরের তুলনায় পাসের হার সামান্য বাড়লেও জিপিএ ৫ কমেছে এক লাখ ২৩ হাজার ৫৩৩। আবার পিএসসি ও ইবতেদায়ি পরীক্ষায় পাসের হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জিপিএ ৫ বেড়েছে এক লাখ ১২ হাজার ৮২৫। পরীক্ষায় অংশগ্রহণের হার, সাফল্যের হার, জিপিএ ৫ পাওয়ার হার—এই সব নির্দেশকেই মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে আছে। এটি নিশ্চয়ই একটি পজিটিভ দিক। মেয়েদের অংশগ্রহণের হার এবং গ্রেড পাওয়ায় তারা এগিয়ে থাকলেও গত কয়েক বছরে জিপিএ ৫ পাওয়ায় মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে ছিল, যা এবার টপকে গেছে। ইবতেদায়ি ও জেডিসিতেও মেয়েরা এগিয়ে। মেয়েদের পাসের হার ৮৯.৭৯ শতাংশ এবং ছেলেদের ৮৮.০১ শতাংশ। এক হাজার ২৯ জন মেয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে আর ৯৫৮ জন ছেলে জিপিএ ৫ পেয়েছে। জেডিসিতে এবার পাসের হার ৮৯.০৪ শতাংশ, যা গতবার ছিল ৮৬.৮০ শতাংশ। জিপিএ ৫ পাওয়ার সংখ্যা এক হাজার ৯৮৭ এবং ২০১৭ সালে তা ছিল সাত হাজার ২৩১, এটি অনেকটাই কমে গেছে। ইবতেদায়িতে পাসের হার ৯৭.৬৯ শতাংশ। গত বছর এই হার ছিল ৯২.৯৪ শতাংশ। জিপিএ ৫ পেয়েছে ১২ হাজার ২৬৪ জন এবং ২০১৭ সালে পেয়েছিল পাঁচ হাজার ২৩ জন।

জেএসসি ও পিএসসিতে ইংরেজিতে পাসের হার ৯৯.১০ শতাংশ। গতবার এই হার ছিল ৯৭.৫০ শতাংশ। গণিতে ৯৮.৮৬ শতাংশ। গতবার ছিল ৯৮.২১ শতাংশ। বিষয়টি যদিও আনন্দের; কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে একমত হওয়া বেশ কঠিন। ৯৯.১০ শতাংশ পাস করা মানে কী? ইংরেজিতে মাত্র ০.৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী দুর্বল, বাকিরা ইংরেজির যেকোনো সমস্যা উতরে যেতে পারে। বিষয়টি যদি এভাবে দেখি—গ্রামীণ এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়জন শিক্ষার্থী ইংরেজি বইটি দেখে পড়তে পারে? বইয়ের যেকোনো জায়গা থেকে ধরলে যে পড়তে পারবে না, তা আমি নিজে অনেক জায়গায় দেখেছি। পরীক্ষায় যে চ্যাপ্টারগুলো আসে, শিক্ষকরা ওই সব চ্যাপ্টারের ওপরই বারবার প্রস্তুতি নেওয়াতে থাকেন। তা-ও দেখে পড়তে পারে না। তাহলে এই পাসের হার দ্বারা আমরা কী বুঝব? একইভাবে গণিতে পাসের হার ৯৮.৮৬ শতাংশ, সেখানেও বোঝা যাচ্ছে মাত্র ১.১৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর গণিতে সমস্যা। অথচ দুই অঙ্কের যোগ-বিয়োগই পারছে না লাখ লাখ শিক্ষার্থী। এর প্রকৃত সমাধান কোথায়? এগুলোর উত্তর অবশ্যই আমাদের খুঁজতে হবে।-কালের কণ্ঠ

লেখক : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত

সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক

masumbillah65@gmail.com

শেয়ার করুন