নবীজির পক্ষে প্রথম অস্ত্র ধারণকারী সাহাবি জোবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.)

মাহবুবুর রহমান নোমানি:: জোবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.) ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে কোরাইশ বংশের বনু আসাদ গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা সাফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ফুফু। এ হিসেবে তিনি রাসুলের ফুফাতো ভাই। অন্যদিকে আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর কন্যা আসমাকে বিয়ে করায় তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ভায়রা। আবার উম্মুল মোমিনিন খাদিজাতুল কুবরা (রা.) ছিলেন তার ফুফু। এভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে ছিল তার বহুমুখী আত্মীয়তার সম্পর্ক। মাত্র ১২ কিংবা ১৬ বছর বয়সে তিনি ইসলাম কবুল করেন। চতুর্থ বা পঞ্চম মুসলমান হিসেবে ইতিহাসে তার নাম রয়েছে। ইসলাম গ্রহণ করায় তার ওপর নেমে আসে জুলুম-নির্যাতনের স্টিমরোলার। স্বীয় চাচা নওফেল ইবনে খোয়াইলিদ তাকে ইসলাম থেকে ফেরাতে ব্যাপক মারধর করতেন। গরম পাথরের ওপর চিত করে শুইয়ে নির্যাতন চালাতেন। তবু তিনি বলতেন, ‘যত কিছুই করুনÑ আমি কখনও কুফরের দিকে ফিরে যাব না।’ নির্যাতন-নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে হাবশায় হিজরত করেন। অতঃপর সপরিবারে মদিনায় হিজরত করেন।

নবীজি (সা.) এর প্রতি ভালোবাসা
একবার মক্কায় খবর রটে গেল, মোশরেকরা রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বন্দি করেছে। এ কথা শোনামাত্র তিনি তরবারি হাতে বের হয়ে গেলেন। খুঁজতে খুঁজতে রাসুলকে পেয়ে গেলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে জোবাইর? তিনি বললেন, শুনেছি আপনি বন্দি হয়েছেন।’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘যদি তা-ই হতো তাহলে তুমি কী করতে? তিনি উত্তর দিলেন, আমার এই তরবারি আপনাকে মুক্ত করত। এ উত্তর শুনে নবীজি খুশি হয়ে তার জন্য এবং তার তরবারির জন্য দোয়া করলেন। সিরাত বিশ্লেষকরা লেখেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জন্য আত্মোৎসর্গের উদ্দেশ্যে এটাই কোনো মুসলমানের প্রথম অস্ত্র ধারণ।’ (উসদুল গাবাহ : ১/৩৭৮)।

বিশেষ মর্যাদা
জোবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.) এর সবচেয়ে বড় মর্যাদা হচ্ছে তিনি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবি। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জন্য তিনিই সর্বপ্রথম তরবারি ধারণ করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে নিজের হাওয়ারি তথা সহযোগী আখ্যায়িত করেছেন। বদরের যুদ্ধে তার বেশ ধারণ করে ফেরেশতারা আগমন করেছিলেন। বনু কুরাইজার দিন নবীজি (সা.) তার উদ্দেশে বলেছেন, ‘ফিদাকা আবি ওয়া উম্মি। তথা আমার বাবা-মা তোমার জন্য উৎসর্গ হোক।’ (বোখারি : ৩/১৩৬২)। সাহাবিদের কাছেও তার সম্মান ও মর্যাদা ছিল স্বীকৃত। ওমর (রা.) মৃত্যুকালে পরবর্তী খলিফা নির্ধারণের জন্য ছয়জনের যে বোর্ড গঠন করেছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন জোবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.)।

নবীজির সঙ্গে জিহাদে অংশগ্রহণ
জোবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.) ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও আত্মপ্রত্যয়ী ব্যক্তি। তার মা তাকে ছোটবেলা থেকেই এমনভাবে গড়ে তুলেছেন, যাতে বড় হয়ে একজন বীর বাহাদুর পুরুষ হন। এ কারণে মা তাকে কঠোর অভ্যাসে অভ্যস্ত করতেন। মায়ের এমন কঠোর শাসন ও প্রতিপালনের প্রভাব তার জীবনে প্রতিফলিত হয়েছে। অল্প বয়স থেকেই তিনি বড় বড় পাহলোয়ান ও শক্তিশালী লোকদের সঙ্গে কুস্তি লড়তেন। মদিনায় হিজরতের পর তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে প্রতিটি জিহাদে অংশগ্রহণ করেছেন। প্রত্যেক জিহাদে তিনি অত্যন্ত সাহসিকতা ও বীরত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। বদরের জিহাদে তিনি এমন বেপরোয়া হয়ে লড়াই করছিলেন যে, তার তরবারি ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল। আঘাতে আঘাতে তার সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। একটি আঘাত এত গভীর ছিল যে, তা চিরদিনের জন্য একটি গর্ত হয়ে রইল। তার ছেলে উরওয়া বলেন, ‘শৈশবে আমরা সেই গর্তে আঙুল ঢুকিয়ে খেলা করতাম।’ (বোখারি : ৩৫১৬)।
বদরের যুদ্ধে তিনি হলুদ রঙের পাগড়ি পরিধান করেছিলেন। তা দেখে রাসুল (সা.) বললেন, ‘আজ ফেরেশতারাও এ বেশে এসেছিল।’ (উসদুল গাবাহ : ২/২৯৬)।
ওহুদের যুদ্ধে যে ১৪ সাহাবি নিজেদের জীবন বাজি রেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) কে রক্ষায় প্রতিরোধ ব্যূহ রচনা করেছিলেন জোবাইর (রা.) ছিলেন তাদের অন্যতম। এমনকি যুদ্ধ শেষে কাফেরদের পশ্চাধাবণ করার জন্য অন্যদের সঙ্গে তিনিও অগ্রসর হয়েছিলেন। খন্দকের যুদ্ধে মুসলিম নারীরা যে দিকে অবস্থান করেছিলেন, সে দিকটির প্রতিরক্ষার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। এ যুদ্ধে মদিনার ইহুদি গোত্র বনু কুরাইজা মুসলমানদের সঙ্গে সম্পাদিত মৈত্রী চুক্তি ভঙ্গ করে। রাসুল (সা.) তাদের অবস্থা জানার জন্য কাউকে পাঠাতে চাইলেন। তিনি তিনবার জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে তাদের সংবাদ নিয়ে আসতে পারে? প্রত্যেকবারই জোবাইর (রা.) বললেন, ‘আমি’। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার আগ্রহে সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ‘প্রত্যেক নবীরই হাওয়ারি (সহযোগী) থাকে। আমার হাওয়ারি হচ্ছে জোবাইর।’ (বোখারি : ২৮৪৬)।
খন্দকের পর বুন কুরাইজা এবং খাইবার যুদ্ধেও তিনি অংশগ্রহণ করেন। এসবেও তিনি অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় দেন। বায়াতে রেদওয়ান এবং মক্কা বিজয়ের দিন তিনি রাসুল (সা.) এর সঙ্গে ছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন যে তিনজন মুহাজির সাহাবি পতাকা ধারণ করেছিলেন তাদের মধ্যে জোবাইর (রা.)ও ছিলেন। হুনাইন যুদ্ধে কাফেররা তার ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালালে তিনি অত্যন্ত সাহসের তাদের মোকাবিলা করে হটিয়ে দেন। তায়েফ ও তাঁবুকের যুদ্ধসহ সব যুদ্ধেই তিনি ছায়া হয়ে নবীজির সঙ্গে ছিলেন। বিদায় হজেও তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সফরসঙ্গী ছিলেন।

খলিফাদের বিজয় অভিযানে অংশগ্রহণ
আল্লাহর দ্বীনের জন্য কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করা ছিল তার জীবনের ব্রত। ফলে তিনি বিভিন্ন যুদ্ধে দুশমনদের তির-বর্শার অসংখ্য আঘাত খেয়েছেন। মুসেল শহরের জনৈক ব্যক্তি বর্ণনা করেন, ‘আমি জোবাইর ইবনুল আওয়ামের সঙ্গে সফরে ছিলাম। একদিন তার দেহে এত ক্ষতচিহ্ন দেখতে পেলাম, যা অন্য কারও দেহে কখনও দেখিনি। জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এসবই ঘটেছে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে ও আল্লাহর রাহে।’ (তারিখে দিমাশক : ১৮/২৫৬)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ওফাতের পর ধর্ম ত্যাগের ফেতনা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলে তিনি সিদ্দিকে আকবরের সঙ্গে মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদে অবতীর্র্ণ হন। অতঃপর সিরিয়া অভিযানে অংশ নেন। দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা.) এর খেলাফতকালে সিরিয়ার ইয়ারমুক প্রান্তরে রোমান বাহিনীর সঙ্গে মুসলমানদের ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এটা ছিল সিরিয়ার ভাগ্য নির্ধারণী যুদ্ধ। জোবাইর (রা.) এ যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের চরম পর্যায়ে মুসলিম সৈনিকদের একদল সিদ্ধান্ত নিলেন, জোবাইর রোমান বাহিনীর মধ্যভাগে প্রচ- আক্রমণ চালাবেন এবং অন্যরা পাশে থেকে তাকে সহযোগিতা করবেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জোবাইর (রা.) ক্ষিপ্রতার সঙ্গে প্রচ- আক্রমণ চালিয়ে রোমান বাহিনীর ব্যূহ ভেদ করে অপর প্রান্তে চলে যান; কিন্তু অন্যরা তাকে অনুসরণ করতে সক্ষম হলেন না। এ অবস্থায় তিনি একাই রোমান বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে ফিরে আসার সময় ঘাড়ে প্রচ- আঘাত পান। উরওয়া বলেন, বদরের পর এটা ছিল দ্বিতীয় জখম, যার মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে ছেলেবেলায় খেলা করতাম।’
ওমর (রা.) এর শাসনামলে মিশর বিজয় হয়। এ বিজয়ে জোবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.) এর অসামান্য অবদান রয়েছে। তৃতীয় খলিফা ওসমান (রা.) দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা অবরুদ্ধ হলে তার নিরাপত্তার জন্য তিনি ছেলে আবদুল্লাহকে নিয়োগ করেন। অতঃপর ওসমান (রা.) কে শহীদ করা হলে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং নিজে সহযোগিতা করতে না পারায় আফসোস করেন। বিদ্রোহীদের থেকে তার হত্যার বদলা নেওয়ার ব্যাপারে তিনি জোর দাবি জানান। কিন্তু তাতে বিলম্ব করায় আয়েশা (রা.) এর সঙ্গে তিনিও জঙ্গে জামালে শরিক হন। তবে আলীর বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধে লিপ্ত হননি। বরং মুসলমানদের পারস্পরিক সংঘাত থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি দূরে চলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ইবনে জারমুজ তার পিছু নেয় এবং নামাজরত অবস্থায় তাকে শহীদ করে।
তিনি ৬৬ মতান্তরে ৬৭ বছর হায়াত লাভ করেছিলেন। আল্লাহভীতি এবং অত্যধিক সতর্কতার দরুন তিনি খুবই কম হাদিস বর্ণনা করতেন। একদিন ছেলে আবদুল্লাহ (রা.) এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, বেটা! অন্যদের থেকে রাসুলের সাহচর্য কোনো অংশে আমার কম ছিল না। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) এর একটি বাণী আমাকে হাদিস বর্ণনা করতে দারুণভাবে সতর্ক করে দিয়েছে। সে বাণীটি হলোÑ তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করবে, সে যেন জাহান্নামে তার আবাস্থল নির্ধারণ করে নেয়।’ (আবু দাউদ : ৩৬৫১)।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামেয়া উসমানিয়া
সাতাইশ, গাজীপুর

উৎস: আলোকিত বাংলাদেশ

শেয়ার করুন