জলবায়ুর পরিবর্তন এবং ডায়াবেটিসের বিস্তার

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

দেহে বহু ব্যাধির আহ্বায়ক, নীরব ঘাতক রোগ ডায়াবেটিসের অব্যাহত অভিযাত্রায় শঙ্কিত সবাইকে এটি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে যথা সচেতন করে তুলতেই আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশন আর বিশ্ব্বস্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯১ সাল থেকে ১৪ নভেম্বরকে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিগত শতাব্দীর শেষার্ধে সংক্রামক ব্যাধি নিচয়ের নিয়ন্ত্রণে গোটা বিশ্বে সবাই উঠেপড়ে লাগলেও এবং গুটিবসন্ত. কলেরা, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়ার মতো মহামারি নির্মূলে সফল হতে সক্ষম হলেও মানুষের সুন্দর-সাবলীল জীবন যাপনের পথে নীরবে তার সব কর্মক্ষমতা হরণকারী অসংক্রামক ব্যাধি ডায়াবেটিসের বিস্তার রোধে ও নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি সচেতনার অনিবার্যতা এবং এর জন্য সুপরিকল্পিত সর্বজনীন উদ্যোগ গ্রহণে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণের আবশ্যকতায় ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সমস্যা ও সীমাবদ্ধতাগুলোর প্রতি বিশ্ব দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সব সরকার ও জনগণের তরফে সংহত ও সমন্বিত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে ঐকমত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশ ২০০৬ সালে জাতিসংঘকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণকল্পে প্রস্তাব গ্রহণের আহ্বান জানায়। মূলত বাংলাদেশের প্রস্তাবে এবং যৌক্তিকতার প্রচারণা-প্রয়াসে ১৪ নভেম্বরকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়ে জাতিসংঘ ২০০৭ সালে ৬১/২২৫ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে। সেই থেকে জাতিসংঘের সব সদস্য দেশে, বিশ্ব ডায়াবেটিক ফেডারেশনের দুই শর অধিক সদস্য সংগঠনে, বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সংস্থা কম্পানি, পেশাজীবী সংগঠন ও ডায়াবেটিক রোগীদের মধ্যে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস নানা প্রাসঙ্গিক প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে উদ্যাপিত হচ্ছে। ২০০৭ সালেই জাতিসংঘের গৃহীত প্রস্তাবের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবসের ব্লু সার্কেল লোগোটিও নির্বাচিত হয়। নীল বৃত্ত জীবন ও স্বাস্থ্যের ধনাত্মক প্রতীক, নীলাকাশ সব জাতিনিচয়কে সংঘবদ্ধ করেছে এবং এ কারণে জাতিসংঘের পতাকার রংও নীল। নীল বৃত্ত বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস মহামারিকে নিয়ন্ত্রণ ও জয়ে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের প্রতীক। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে ১৯২১ সালে ফ্রেডরিক ব্যান্টিং (১৮৯১-১৯৪১) এবং চার্লস বেস্ট (১৮৯৯-১৯৭৮) কর্তৃক ইনসুলিনের আবিষ্কার এক যুগান্তকারী অগ্রগতি। এ জন্য ব্যান্টিং চিকিৎসায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯২৩ সালে। বলা বাহুল্য, ১৪ নভেম্বর ফ্রেডরিক ব্যান্টিংয়ের জন্মদিবসকেই তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ প্রদর্শনার্থে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস হিসেবে গৃহীত হয়েছে।

এবারের বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ডায়াবেটিস প্রতিটি পরিবারে উদ্বেগ’। ডায়াবেটিসের বিস্তার ও প্রতিরোধে পরিবেশের বিশেষ প্রভাবক ভূমিকার কারণে বিশ্বব্যাপী বিদ্যমান বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রসঙ্গটি সম্পৃক্ত করা হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীতে ঘাতকব্যাধি ডায়াবেটিস ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা মানবজাতির জন্য প্রধানতম ঝুঁকি হিসেবে দেখা দেবে। জলবায়ুর পরিবর্তনে ঘটে খরা, সুপেয় পানির দুষ্প্রাপ্যতা, অত্যধিক উত্তাপে ডিহাইড্রেশন, শরীরচর্চার সুযোগ সীমিত হয় বা শারীরিক শ্রমে বাধাগ্রস্ততা সৃষ্টি হয়, যা প্রকারান্তরে ডায়াবেটিসের প্রকোপ এবং মাত্রা বাড়ায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়। এ অবস্থায় সবাইকে এমনকি গর্ভবতী মহিলাদের এমন পুষ্টিহীনতায় পেয়ে বসে যে তাঁদের গর্ভের সন্তানেরও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। যাঁরা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ভোগেন, তাঁদের ওষুধ, সুষম খাবার সংগ্রহে ও শরীরচর্চায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। নগরায়ণ ও জনসংখ্যা আধিক্যের কারণে স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান, খাদ্যাভ্যাস অবলম্বন করা সম্ভব না হওয়ায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ডায়াবেটিস বৃদ্ধি পায়। উন্নয়নের অভিঘাতে নগরজীবনে ব্যস্ততা বাড়ে, হাঁটাচলার পথঘাট সংকুচিত হয়, বাসায় তৈরি সুষম খাবারের চেয়ে ফাস্ট ফুডসহ বাইরের খাবার গ্রহণ থেকে শুরু করে সর্বত্র একটা কৃত্রিমতা এসে ভর করে। এর ফলে সুষম খাদ্য গ্রহণ ও শরীরচর্চার ব্যাঘাত ঘটে শরীর মেদবহুল ও স্থূলকায় হয়ে যায়—ডায়াবেটিস হওয়ার যা একটি অন্যতম কারণ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের যা একটা প্রধান সমস্যা।

বিশ্বব্যাপী উষ্ণতা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে জলবায়ুর যে পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে তার সঙ্গে ডায়াবেটিসের বিস্তারের অন্তঃসম্পর্কটি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বাতাসে নিঃসৃত কার্বনের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে পরিবেশগত সমস্যায় জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটার প্রমাণ এখনই মিলছে। ২০৫০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ৫২ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরো ভয়াবহ রূপে বাড়িয়ে পৃথিবীকে বাসের অযোগ্য করে তুলতে পারে। ধনী দেশগুলো সবচেয়ে বেশি গ্যাস নিঃসরণ করলেও দরিদ্র দেশগুলো এর প্রতিক্রিয়া ভোগ করে বেশি। এ অবস্থার প্রতিকার না হলে প্রতি তিন বছরে জিডিপির ৫-২০ শতাংশ অর্থ ব্যয়িত হবে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায়। এর ফলে পুষ্টিহীনতা, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের বিস্তার, দারিদ্র্য ও বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে।

অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলেও জলবায়ুর পরিবর্তন ত্বরান্বিত হচ্ছে। দ্রুত ও দুর্বল নগরায়ণের ফলে বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যা এখন শহরে বাস করে। এখানে আছে যন্ত্রচালিত পরিবহনব্যবস্থা, চলছে বস্তির বিস্তার, শরীরচর্চাবিহীন যাপিত জীবনে বাড়ছে বয়োবৃদ্ধ জনসম্পদ, হচ্ছে বনজ প্রাকৃতিক সম্পদ উজাড়, প্রাণিজ ও সুষম খাদ্যের জায়গা দখল করছে কল-কারখানায় প্রক্রিয়াজাত কৃত্রিম অস্বাস্থ্যকর খাবার, পরিবর্তিত হচ্ছে আহার প্রক্রিয়া, বাড়ছে বিশ্ব খাদ্য-কৃষির ব্যবসা ও বিপণনে প্রতিযোগিতা। বর্তমানে বিশ্বে ৩৬৬ মিলিয়ন মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছে। ২০৩০ সাল নাগাদ এর পরিমাণ অর্ধ বিলিয়নে দাঁড়াবে। বছরে ৪.৬ মিলিয়ন মানুষ এ রোগে মারা যায়। ডায়াবেটিসে সবচেয়ে বড় ক্ষতি কর্মক্ষমতা হারানো, এ রোগের পেছনে বার্ষিক ব্যয় হয় ৪৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পাঁচজনের মধ্যে চারজন ডায়াবেটিক রোগী বাস করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। এ রোগ পরিবারকে অসচ্ছল করে, শ্রমশক্তি বিনষ্ট করে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পর্যুদস্ত করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষায় নগরায়ণ, ‘ওয়েস্টার্ন ফুড’ আর সার্বিক পরিবেশের ভারসাম্যহীনতায় এই রোগের বিস্তারকে করছে বেগবান। বিশ্ব রোগ নিরাময় কেন্দ্রের মতে, এই শতকের মাঝামাঝি পৌঁছার আগেই এটি মানবভাগ্যে মারাত্মক মহামারিরূপে উদ্ভাসিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ডায়াবেটিক তথ্য নিকাশ কেন্দ্রের হিসাব মতে, খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই এই ঘাতকব্যাধি বছরে ১৩২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিসাধন করে সে দেশের জাতীয় অর্থনীতির।

বাংলাদেশে ডায়াবেটিস চিকিৎসা আন্দোলনের পথিকৃৎ প্রাণপুরুষ জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম (১৯১৭-১৯৮৯) ১৯৫৬ সালে সেগুনবাগিচায় নিজের বাসভবনের আঙিনায় ছোট টিনের ঘরে দেশের ডায়াবেটিস চিকিৎসার যে উদ্বোধন ঘটিয়েছিলেন আজ তাঁর সেই প্রতিষ্ঠান জাতির গর্বের প্রতীক ‘বারডেম’। বারডেম এশীয় প্রশান্ত অঞ্চলে ডায়াবেটিস চিকিৎসার মডেল বা সেরা কেন্দ্র এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৮২ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানটিকে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ এবং গবেষণার ক্ষেত্রে তাদের একান্ত সেরা সহযোগী সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি, সম্মান ও সমীহ করে আসছে। তাঁর মিশন ও ভিশনের পতাকা তাঁরই গড়া বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস) দৃঢ় প্রত্যয়ে সযত্নে বহন করে চলছে। বারডেমে নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা এখন চার লাখের বেশি, প্রতিদিন তিন হাজারের বেশি (এর মধ্যে ৭৫ থেকে ১০০ জন নতুন) রোগী চিকিৎসাসেবার জন্য এখানে আসে। দেশের প্রায় সব জেলায় বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অধিভুক্ত শাখা রয়েছে, যেখানে স্থানীয়ভাবে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে অগণিত ডায়াবেটিক রোগী। উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সরকার সমিতির প্রধান অবকাঠামো নির্মাণে অর্থায়ন করেছে আর সমিতি নিজস্ব উদ্যোগে সেই অবকাঠামোয় তুলে ধরেছে স্বাস্থ্যসেবার ডালি। বাডাস দাতা সংস্থার সাহায্যনির্ভর না হয়ে আয়বর্ধক নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে ‘ক্রস ফিন্যানশিং’-এর মাধ্যমে স্বয়ম্ভরতা অর্জনে প্রয়াসী, প্রত্যাশী। ডায়াবেটিসের মতো মহামারি নিয়ন্ত্রণে মহতি উদ্যোগের মেলবন্ধন সুস্থ দেশ ও জাতি নির্মাণের দ্বারা জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি সুনিশ্চিত হবে সন্দেহ নেই।(উৎস: কালের কণ্ঠ)

লেখক : সরকারের সাবেক সচিব এবং এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

চিফ কো-অর্ডিনেটর, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি

শেয়ার করুন