অতিথিরা যেন নিরাপদে থাকে

মাহফুজুর রহমান খান

শীত আসি আসি করছে। শীত আসলেই বাংলাদেশে আগমন ঘটে অতিথি পাখির। প্রতিবছর শীতকাল এলেই জলাশয়, বিল, হাওর, পুকুর ভরে যায় নানা রঙ-বেরঙের নাম না জানা পাখি। আদর করে আমরা সেগুলোকে অতিথি পাখি নামে ডাকি। নাম অতিথি হলেও এই পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে আমাদের দেশে হাজির হয় নিজেদের জীবন বাঁচাতে। অতিথি পাখি দেখে লোকেরা আনন্দ পায়। আর অতিথি পাখির কলকাকলিতে এদেশের প্রকৃতি যেন আরো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। শীত এলে অতিথি পাখি দেখে সবাই আনন্দ উপভোগ করে থাকি। অতিথি পাখি শীত এলে শীত সহ্য করতে না পেরে অন্য দেশে যেখানে শীত অপেক্ষাকৃত কম সেখানে চলে যায়। তাছাড়া এ সময়টাতে শীতপ্রধান এলাকায় খাবারের দেখা যায় প্রচণ্ড অভাব। কারণ শীতপ্রধান এলাকায় এ সময় তাপমাত্রা থাকে অধিকাংশ সময় শূন্যেরও বেশ নিচে। সেই সঙ্গে রয়েছে তুষারপাত। তাই কোনো গাছপালা জন্মাতেও পারে না। তাই শীত এলেই উত্তর মেরু, সাইবেরিয়া, ইউরোপ, এশিয়ার কিছু অঞ্চল, হিমালয়ের আশ-পাশের কিছু অঞ্চলের পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে চলে আসে কম ঠাণ্ডা অঞ্চল বাংলাদেশের দিকে। অতিথি পাখিগুলো বসন্তকাল এলেই আবার নিজ দেশে চলে যায়। সত্যি অতিথি পাখিগুলো আসলেই অতিথির মতই। বাংলাদেশে পাখি এ দেশের প্রাকৃতিক উপাদানের মধ্যে অন্যতম হলেও কিছু অসাধু এবং কিছু অসচেতন মানুষ প্রতিবছর অনেক পাখি নিধন করে। যা প্রাকৃতিক পরিবেশকে ক্ষতিসাধন করে। আবার অনেকেই শখের বশে খাবারের জন্যে পাখি শিকার করে। একটি পাখি জবাই করলে প্রায় ১০০-২০০ গ্রাম মাংস পাওয়া যায়। এই অল্প মাংসের জন্য লোভ সামলাতে পারে না। অনেক পাখি তাদের বাচ্চা রেখে খাবারের উদ্দেশ্যে বের হয়। আর অনেক পাখির মধ্যে রোগ-জীবাণুও থাকে। যা মানুষ খেলে অনেক মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। যা অনেক অসচেতন মানুষ কখনো বুঝার চেষ্টাও করে না। ফলে মানুষের হাতে মারা যাচ্ছে অনেক অতিথি পাখি। পাখি নিধনের ফলে একদিকে প্রাণিজগত্ ধ্বংসের মাধ্যমে প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে প্রাকৃতিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশে বন্যপ্রাণি (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ নামে একটি আইন রয়েছে। এই আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি পাখি বা পরিযায়ী পাখি হত্যা করলে তিনি অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন। এ অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আইনে আরো বলা হয়েছে যে, যদি একই ব্যক্তি পুনরায় একই ধরনের অপরাধ করেন, তাহলে তার শাস্তি হবে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। এই আইনে আরো বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি পাখি বা পরিযায়ী পাখির মাংস দেহের অংশ সংগ্রহ করলে, দখলে রাখলে বা ক্রয়-বিক্রয় করলে বা পরিবহন করলে তিনি অপরাধি হবেন। এ অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। তাই অতিথি পাখিকে হত্যা বা শিকার করাকে তুচ্ছ করে দেখার সুযোগ নেই। শুধু অতিথি পাখি শিকারই নয়, পাখি কেনাবেচা, পাখির মাংস বিপণনও করা যাবে না এই আইন অনুযায়ী। অতিথি পাখির প্রতি কোনো ধরনের নিষ্ঠুর আচরণ করা যাবে না। তাই এই সঠিক আইনের প্রয়োগ চাই। জীব হত্যা মহাপাপ। তোমরা অন্যায়ভাবে জীবকে হত্যা করো না। তাই জীবের প্রতি মায়া মমতা দেখাতে হবে। আর এব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। অতিথি পাখি শুধু বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে আসে না কিন্তু, এদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। তাই অতিথি পাখির ব্যাপারে সাধারণ জনগণ আরো বেশি সচেতন হওয়া উচিত। সেই সঙ্গে অতিথি পাখি শিকার না করে, তাদেরকে বেঁচে থাকতে সহায়তা করি।

লেখক :শিক্ষার্থী, জামালপুর আইন কলেজ, জামালপুর

উৎস: ইত্তেফাক

শেয়ার করুন