‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নীতি ও বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ

ইকরামউজ্জমান

কয়েক মাস আগে রাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮ অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভালো ফুটবল দেখার জন্য বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ, উৎসাহ, ভালোবাসা ও উন্মাদনাই বলে দেয় খেলাটির জনপ্রিয়তা দেশে কোন পর্যায়ে বদ্ধমূল আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সুন্দর খেলা ফুটবল। এটি এমন একটি খেলা, যা সব বয়সী নারী-পুরুষকে চুম্বকের মতো টানে। এই আকর্ষণের পেছনে আছে খেলার চরিত্র, উত্তেজনার স্বাদ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মাঠে কুশলীদের উজ্জ্বল ফুটবল উপহার! তা ছাড়া ফুটবল তো শুধু একটি খেলা নয়। একটি জীবনবোধ। জীবনের গল্পের সঙ্গে আছে ফুটবলের মিল।

মাঠের ফুটবলে বাঙালিদের একটি সুমহান ইতিহাস ও ঐতিহ্য আছে। আর এই ঐতিহ্যের অধ্যায়ে আছে উল্লেখ করার মতো আলোকিত ফুটবল উপাখ্যান। গত দুই প্রজন্মের ফুটবল উৎসাহী দর্শকরা সেই ফুটবল বিষয়ে তেমন অবগত নয় এদের বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো, দেশের মাঠে ফুটবল দেখার ক্ষেত্রে মানুষ ক্রমেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। ঘরোয়া ফুটবলের আসর মানুষকে টানতে পারছে না। অথচ এরাই কিন্তু রাতের ঘুম আর বিশ্রামকে জলাঞ্জলি দিয়ে দেশের বাইরের বিভিন্ন টুর্নামেন্ট ও লিগের খেলা নিয়মিত দেখে। কারণ একটাই, ফুটবল দেখার ক্ষেত্রে আগ্রহ ও রুচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সবার প্রত্যাশা এখন ভালো ফুটবল উপভোগ করা।

আজ থেকে বিভাগীয় শহর সিলেটে শুরু হতে যাচ্ছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামকরণে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের পঞ্চম আসর। দেশে আন্তর্জাতিক ফুটবলের জমজমাট উৎসব। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপের খেলা এর আগেও অনুষ্ঠিত হয়েছে সিলেটে। মাঠভর্তি দর্শক সমাগম হয়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। মাঠে উপস্থিত থেকে ভালো ফুটবল দেখার সুযোগ কি কেউ ছাড়ে। ফিফা ও এএফসি স্বীকৃত আন্তর্জাতিক ফুটবলের বর্ণময় আসরের ট্রফি এখন হিমালয়ের দেশ নেপালের ঘরে! টুর্নামেন্টের যাত্রা শুরু হয়েছে ১৯৯৬ সাল থেকে। স্বাগতিক বাংলাদেশ বিগত চার আসরে গোল্ডকাপটি মাথার ওপরে তুলে ধরার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। আজ উদ্বোধনী খেলায় বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ লাওস। চলতি বছর মার্চ মাসে ভিয়েনতিয়েনে প্রীতি ম্যাচে বাংলাদেশ লাওসের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করেছে।

এবারকার পঞ্চম আসরে অংশ নিচ্ছে স্বাগতিক বাংলাদেশসহ ছয়টি দেশ। অন্য দেশগুলো হলো—লাওস, ফিলিপাইন, নেপাল, ফিলিস্তিন ও তাজিকিস্তান। অর্থাৎ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের ফুটবলের গুণগত মান, দেশগুলোর সংস্কৃতি, মাঠের লড়াইয়ে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, ফুটবলে বর্তমান অবস্থান ও অগ্রগতি দেখার সুযোগ মিলবে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের মাধ্যমে।

ফিফার র্যাংকিংয়ে অংশগ্রহণকারী পাঁচটি দেশ বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে আছে, এটা বাস্তবতা। র্যাংকিং অবশ্যই বড় বিষয়, তবে এটাই শেষ রায় নয়। মাঠে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে লড়াই এবং দলগতভাবে সামর্থ্যের প্রয়োগের মাধ্যমে সেরাটা ঢেলে দিয়ে খেলাটাই আসল। ইতিবাচক মানসিকতায় জয়ের ক্ষুধা নিয়ে সাহসের সঙ্গে খেলতে পারলে অনেক কিছুই অর্জন সম্ভব। চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হলে নিজের খেলার ওপর আস্থা ও বিশ্বাস জরুরি। দেশে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মাঠে ভালো খেলে ফুটবলে উত্তরণ। ফুটবল চত্বরে আস্থা সৃষ্টির জন্য।

সিলেটে ১ থেকে ৬ অক্টোবর গ্রুপ পর্যায়ের খেলা অনুষ্ঠিত হবে। ‘এ’ গ্রুপে আছে ফিলিস্তিন, নেপাল ও তাজিকিস্তান আর ‘বি’ গ্রুপে লাওস, ফিলিপাইন ও বাংলাদেশ। গ্রুপের খেলার পর ৯ ও ১০ তারিখে সমুদ্র শহর কক্সবাজারে সেমিফাইনাল। এরপর ১২ অক্টোবর ফাইনাল ম্যাচ ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। ফাইনালে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন দেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট—বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজক। জাতির জনকের নামে টুর্নামেন্ট, আর তাই এর গুরুত্ব ও মর্যাদা অন্য যেকোনো প্রতিযোগিতা থেকে ব্যতিক্রম। আমরা প্রথম থেকেই বলেছি, যেহেতু জাতির জনকের নাম জড়িত, আর তাই মর্যাদার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই। এখানে জাতীয় দল ছাড়া অন্য কোনো দলের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত নয়। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে ফুটবল ফেডারেশন কিন্তু তাদের নিজস্ব অবস্থানে অতীতে বিভিন্ন কারণে ঠিক থাকতে পারেনি। এতে বারবার কথা উঠেছে। বিএফএফ থেকে এবার বলা হয়েছে, প্রতিটি অংশগ্রহণকারী দেশ নিশ্চিত করেছে তারা জাতীয় দল পাঠাবে। আশা করব, বিএফএফ এ বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে।

সচেতন মহল জানে, একসময় দক্ষিণ-পূর্ব ও মধ্য এশিয়ায় অনেক জমজমাট ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হতো। এ সবই ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের দেশে বন্ধ হয়েছে আগাখান গোল্ডকাপ এবং আশির দশকে শুরু করা প্রেসিডেন্ট কাপও। এএফসি আর ফিফার ব্যস্ত কর্মসূচি এবং প্রতিটি দেশের নিজস্ব কর্মসূচির পরিপেক্ষিতে এখন আর সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুনামেন্টে খেলার। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এটি একটি বড় সমস্যা। এত কিছুর পর বিএফএফ (নিয়মিতভাবে না হলেও) জাতির জনকের নাম অনুকরণে টুর্নামেন্টটি চালিয়ে যাচ্ছে। আর এটি চালাতে হবে দেশের ফুটবলের স্বার্থে। এ ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতার একটি বিষয়ও আছে। আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে সাংগঠনিক কার্যক্রম সব সময় হাতে সময় নিয়েই শুরু করতে হবে। তাহলে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। আমরা বিশ্বাস করি, নিয়মিতভাবে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট আয়োজিত হলে দেশে ফুটবল রসিক মহল ভালো খেলা দেখার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি এই ফুটবল থেকে অনুপ্রাণিত হবে কিশোর ও তরুণ ফুটবল সম্প্রদায়। দেশের ফুটবলকে উজ্জীবিত এবং মাঠে আবার ভালো খেলার আয়োজনের মাধ্যমে সাধারণ দর্শকদের মাঠমুখী করার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে আমরা মনে করি।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু সারাটা জীবন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তা নয়, তিনি খেলাধুলাকেও ভীষণ ভালোবাসতেন। চল্লিশের দশকে ঢাকার ফুটবল লিগে ওয়ান্ডারার্স দলের হয়ে খেলেছেন তিনি। যেহেতু তিনি সব সময় শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য রাজনীতি করতেন, আর তাই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি নিয়মিতভাবে বছরের পর বছর ধরে খেলা। নিজে খেলায় সময় দিতে না পারলেও বন্ধু ক্রীড়া সংগঠকদের (এদের কেউ কেউ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন) সঙ্গে সব সময় তাঁর যোগাযোগ ছিল। আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক সরকারের মুখ্যমন্ত্রী যখন ছিলেন আতাউর রহমান খান—তখন শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। তখন খেলাধুলার মন্ত্রীর দায়িত্বেও ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এটা ছিল তাঁর অতিরিক্ত দায়িত্ব। তখন তো প্রদেশ বা কেন্দ্রে ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ছিল না।

স্বাধীনতা-উত্তর ঢাকা স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম ফুটবল শুরু হয় ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট একাদশ বনাম মুজিবনগর একাদশের মধ্যে প্রদর্শনী ম্যাচের মাধ্যমে। ভীষণ ব্যস্ততার মধ্যেও সেদিন মাঠে ছুটে গিয়ে ফুটবল খেলা দেখেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীন দেশে নতুনভাবে ফুটবল শুরু করা খেলোয়াড় ও সংগঠকদের উৎসাহ জুগিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন তিনি।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি নিজে ছিলেন মনে-প্রাণে একজন খাঁটি ক্রীড়ানুরাগী। স্বাধীনতার পর ক্রীড়াঙ্গনকে শূন্য থেকে ধাপে ধাপে পূর্ণ করার কথা প্রথমেই ভেবেছেন, উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর নামকরণে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ‘বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট’ শুরু করে ক্রীড়াঙ্গনের পক্ষ থেকে ঋণ শোধের সামান্যতম উদ্যোগের সফলতা কামনা করি।

খেলায় হার-জিত আছে। পঞ্চম বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টের পরিসমাপ্তিও হবে জয়-পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। তবে জাতির জনকের সেই আহ্বান ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নীতি এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোকে বাংলাদেশের আরো কাছে আনবে।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

উৎস : কালের কণ্ঠ

শেয়ার করুন