শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু আজ

ফাইল ছবি

সুনীল সিংহ, অতিথি প্রতিবেদক :: ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে সোমবার সূচনা ঘটছে বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার। পাঁচদিনের এ উৎসব শেষ হবে ১৯ অক্টোবর শুক্রবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। এ ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে সারাদেশে এখন উৎসবের আমেজ বইছে। পূজাকে আনন্দমুখর করে তুলতে দেশজুড়ে বর্ণাঢ্য প্রস্তুতিও শেষ হয়েছে।

এর আগে রোববার সারাদেশের পূজামণ্ডপগুলোতে দুর্গা দেবীর বোধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুর্গোৎসবের প্রাক্কালে এই বোধনের মাধ্যমে দক্ষিণায়নের নিদ্রিত দেবী দুর্গার নিদ্রা ভাঙার জন্য বন্দনা পূজা করা হয়। পঞ্চমীতে মণ্ডপে-মন্দিরে সায়ংকালে তথা সন্ধ্যায় এই বন্দনা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এবার দেবীর ঘোটকে (ঘোড়ায়) আগমন ও দোলায় গমন। মাতৃরূপে আজ মন্ডপে মন্ডপে ঠাঁই নেবেন দেবী। ঢাকে পড়বে কাঠি, ধূপের ধোঁয়া আর ঢাক-ঢোলের সঙ্গে ভক্তিমন্ত্রে মেতে উঠবে পূজামন্ডপ। খড়গ-কৃপাণ, চক্র, গদা, তীর-ধনুক, ত্রিশূল আর কল্যাণ নিয়ে উপস্থিত হবেন, আর মহিষাসুর বধ করে হেসে উঠবেন দেবী। আসুরিক শক্তির বিনাশ আর শান্তি, কল্যাণ আর সমৃদ্ধি লাভের জন্য হিন্দু সম্প্রদায় যুগ যুগ ধরে মা দুর্গার আরাধনা করে আসছে।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে শান্তি, সংহতি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য এবং দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনে বিশ্বব্যাপী মঙ্গল ধ্বনি দিয়ে মা দুর্গা এ সময় কৈলাশ ছেড়ে লোকালয়ে আসেন। দুর্গাপূজা হয় আশ্বিনের শুক্লা ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত। পুরাণ মতে, রাজা সুরথ প্রথম বসন্তকালে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। পরে রামচন্দ্র তাঁর পতœী সীতাদেবীকে উদ্ধারের জন্য শরৎকালে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। তাই, শরৎকালের এই পূজাকে অকাল বোধন বলা হয়। বোধন হয় বেল গাছের তলায়। দেবতারাও বেল গাছের তলায় বোধন করেছিলেন। বেল গাছের অন্য নাম শ্রীবৃক্ষ। শ্রী অর্থ সম্পদ বা সৌন্দর্য। তাই, পূজারীরা সম্পদ বা সৌন্দর্য বা সংসারের উন্নতির জন্য, জ্ঞান ভক্তি লাভের জন্য বিল্ববৃক্ষের মূলে দুর্গাপূজার বোধন করেন। বোধনে ঘট স্থাপন করা হয়। ঘট হল হৃদয়ের প্রতীক। ঘটের জলে যেমন প্রতিবিম্ব পড়ে, সেরকম ভক্তের হৃদয়েও মায়ের ভাব বা স্বরূপের ধারণা হয়। সেই ধারণা অনুযায়ী প্রতিমা তৈরী হয়।

অন্যদিকে, আবার এই প্রতিমা দেখেই ভক্তের মনের ভাব প্রকাশিত হয়। তাই, ভক্ত নিজের হৃদয়ে, ঘটে এবং প্রতিমায় মায়ের পূজা করে থাকেন। আজ কল্পারম্ভ। কল্পারম্ভ হলো পূজার পরিকল্পনার শুরু। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী এই তিনদিন মায়ের বিশেষ পূজার সংকল্প বা পরিকল্পনা হয় এই কল্পারম্ভে। কল্পারম্ভ হতেই শ্রী শ্রী চন্ডীপাঠ হয়ে থাকে। চন্ডী গ্রন্থ মার্কন্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত। এ চন্ডীতে মায়ের পূজার দার্শনিক ভাব ও প্রতিমায় বিশেষ করে মাটির প্রতিমায় পূজার মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর রয়েছে দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস। দুর্গাপূজার অধিবাস হলো বিভিন্ন সুগন্ধি ও মাঙ্গলিক দ্রব্য স্পর্শ করে অতিথি বরণ করে নেয়ার মত মা দুর্গাকে প্রতিমায় এবং নব পত্রিকায় বরণ করে নেওয়া। বোধনের পরেই প্রতিমায় মায়ের অধিবাস করার নিয়ম। আগামী ১৯ অক্টোবর বিজয়া দশমী। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে দুর্গোৎসব।

উৎসব চলাকালে পূজার প্রতিদিনই অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ ও ভোগ আরতির আয়োজন করা হবে। এছাড়া, মন্ডপে মন্ডপে আলোকসজ্জা, আরতি প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচীর আয়োজন করা হয়েছে। দেশের অন্যান্য স্থানের ন্যায় সিলেটেও বিপুল সমারোহে এবার দুর্গোৎসব উদযাপিত হচ্ছে।

এবার সিলেট বিভাগে পারিবারিক, বারোয়ারি ও সার্বজনীন পূজামন্ডপ (স্থায়ী ও অস্থায়ী) ২৬১৯টি। এর মধ্যে সার্বজনীন পূজা ২৩৬৯টি ও পারিবারিক পূজা ২৫০টি। বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পূজা মৌলভীবাজার জেলায় ৯৯৫টি আর উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কুলাউড়ায় ২১৭টি পূজার আয়োজন করা হয়েছে ।

এ বছর সিলেট জেলায় ৫৯৮টি মন্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। সিলেট মহানগর এলাকায় মোট ৬৩টি পূজার আয়োজন করেছেন পূজারীরা। এর মধ্যে সার্বজনীন পূজা ৪৮টি ও পারিবারিক পূজা ১৫টি। সিলেট সদর উপজেলায় সার্বজনীন পূজা ৫৫টি। দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় ২৩টি পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে সার্বজনীন ২২টি ও পারিবারিক পূজা ১টি। গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ৬৫টি মন্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে সার্বজনীন পূজা ৫৯টি ও পারিবারিক পূজা ৬টি। বালাগঞ্জ উপজেলায় ২৮টি মন্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে সার্বজনীন পূজা ২৬টি ও পারিবারিক পূজা ২টি। কানাইঘাট উপজেলায় সার্বজনীন পূজা ৩২টি। জৈন্তাপুর উপজেলায় সার্বজনীন পূজা ২২টি। বিশ্বনাথ উপজেলায় সার্বজনীন পূজা ২৪টি। গোয়াইনঘাট উপজেলায় এবার ৪০টি পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে সার্বজনীন পূজা ৩৯টি ও পারিবারিক পূজা ১টি। জকিগঞ্জ উপজেলায় জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এ উপজেলায় এবার সার্বজনীন পূজা ৯৭টি। বিয়ানীবাজার উপজেলায় ৪৯টি মন্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে সার্বজনীন পূজা ৩৪টি ও পারিবারিক পূজা ১৫টি। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ২৭টি মন্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে সার্বজনীন পূজা ২৫টি ও পারিবারিক পূজা ২টি। ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় ৩৯টি পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে সার্বজনীন পূজা ৩৭টি ও পারিবারিক পূজা ২টি আর ওসমানীনগর উপজেলায় ৩৪টি পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে সার্বজনীন পূজা ২৫টি ও পারিবারিক পূজা ৯টি।

মৌলভীবাজার জেলায় ৯৯৫টি পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে সার্বজনীন ৮৪২টি ও পারিবারিক ১৫৩টি। মৌলভীবাজার সদর ও পৌর এলাকায় ১০৬টি, রাজনগরে ১৩০টি, বড়লেখায় ১৫১টি, জুড়ি উপজেলায় ৬৮টি, কুলাউড়ায় ২১৭টি, কমলগঞ্জে ১৫৬টি ও শ্রীমঙ্গলে ১৬৭টি।

সুনামগঞ্জে ৩৮৩টি পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে সার্বজনীন ৩৫৪টি ও পারিবারিক ২৯টি। সুনামগঞ্জ পৌরসভায় ২৪টি, সদর উপজেলায় ১৯টি, দক্ষিণ সুনামগঞ্জে ২১টি, জগন্নাথপুর পৌরসভায় ৫টি ও উপজেলায় ২৭টি, ছাতক পৌরসভায় ১২টি ও উপজেলায় ২২টি, দিরাই পৌরসভায় ৬টি ও উপজেলায় ৫৩টি, শাল্লা উপজেলায় ২৬টি, তাহিরপুরে ২৯টি, ধর্মপাশায় ১৬টি, বিশ্বম্ভরপুরে ৩১টি, দোয়ারাবাজারে ১৬টি, জামালগঞ্জে ৪৮টি ও মধ্যনগরে ২৮টি।

হবিগঞ্জে ৬৪৩টি পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে সার্বজনীন ৬৩০টি ও পারিবারিক ১৩টি। হবিগঞ্জ পৌরসভায় ৩৫টি, সদর উপজেলায় ৪৯টি, লাখাই উপজেলায় ৬৫টি, চুনারুঘাট পৌরসভায় ৮টি ও উপজেলায় ৭০টি, বাহুবল উপজেলায় ৪৯টি, নবীগঞ্জ পৌরসভায় ৮টি, উপজেলায় ৮২টি, মাধবপুর পৌরসভায় ১২টি ও উপজেলায় ১০৫টি, বানিয়াচং উপজেলায় ১১৮টি, আজমিরিগঞ্জ উপজেলায় ৩৬টি, শায়েস্তগঞ্জে ৬টি।

শেয়ার করুন