শান্তিতে নোবেলজয়ী মুকওয়েগে ও নাদিয়া এবং সু চির নীরব ভূমিকা

শাওয়াল খান

অকুতোভয় যোদ্ধা ডেনিস মুকওয়েগে এবং নাদিয়া মুরাদকে অভিনন্দন। অভিনন্দন নরওয়ের নোবেল কমিটিকে, বিশ্বজুড়ে নিন্দিত যৌন-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইরত দুই সৈনিককে এবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করার জন্য। আর সেই সঙ্গে ধিক্কার জানাচ্ছি মিয়ানমারের ক্ষমতাধর নেত্রী, এক সময়ের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চিকে, যিনি নিজ দেশে ঘটে যাওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম নিধন, বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতন, নিপীড়ন, ধর্ষণ ও বিতাড়নের ঘটনা দেখেও না দেখার ভান করছেন, বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠার পরও রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছেন। রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হচ্ছেন না, তাদের নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকারের বিষয় আমলে নিচ্ছেন না, তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা পালন করছেন না। মানবতাবাদী চিকিৎসক কঙ্গোর স্ত্রী রোগবিশেষজ্ঞ ডেনিস মুকওয়েগে ও ইরাকের মানবতাবাদী এক তরুণী ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের প্রতিবাদের প্রতীক নাদিয়া মুরাদ এবং নরওয়ের নোবেল কমিটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন সু চি তোমার কপাল মন্দ, তুমি চোখ থাকতে অন্ধ।
বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া যৌন-সন্ত্রাস এক ভয়ংকর অপরাধের নাম। যে অপরাধের মধ্য দিয়ে মানুষ মনুষ্যত্ব হারায়, পশুত্বের বিকাশ ঘটায়, সেই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করা, প্রতিরোধ গড়ে তোলা নিঃসন্দেহে প্রশংসার কাজ। নোবেল কমিটি বিদ্যমান সময়ে এমন একটি বিষয় এবং এমন দুজন মানবতাবাদী মানুষকে বেছে নিয়ে যথাযথ কাজটিই করেছে। তাদের চিন্তাচেতনা, সাধনা, বিবেক, আবেগ, মনোবল, পরিশ্রম, প্রতিবাদ, যৌন নির্যাতনের শিকার নারীদের প্রতি ভালোবাসা, মমত্ববোধ, সমাজসচেতনতা এবং দূরদর্শিতাকে যথাযোগ্য মর্যাদায় মূল্যায়ন করে বিশ্ববাসীকে একটি বার্তাই দিয়েছেন আর নয় যৌন-সন্ত্রাস। শান্তির অন্বেষণ কর। যৌন নিপীড়ন রোধ কর, যৌন-সন্ত্রাস প্রতিহত কর। মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরি কর। যৌন নিপীড়নকারীদের ঘৃণা কর, যৌন নিপীড়নের শিকার যারা তাদের প্রতি মমত্ববোধ তৈরি কর, তাদের মনোবল তৈরিতে সাহস জোগাও, তাদের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দাও।
ডেনিস মুকওয়েগে ও নাদিয়া মুরাদ যৌন নিপীড়নকে যুদ্ধের হাতিয়ার করার প্রচেষ্টা বন্ধে ভূমিকা রাখায় এবার যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জিতে দুনিয়াময় চেতনা জাগিয়ে দিলেন, সবিনয়ে বার্তা ছড়ালেন ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীর জন্য লজ্জাকর নয়, লজ্জা বরং সেই পুরুষেরই পাওয়া উচিত, যে নারীর ওপর বলাৎকার করে।
যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে যৌন নিপীড়নকে হাতিয়ার করার প্রচেষ্টা বন্ধে দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন কঙ্গোর চিকিৎসক ডেনিস মুকওয়েগে। যুদ্ধে যৌন নিপীড়নের শিকার লাখো মানুষকে চিকিৎসা দিয়েছেন মুকওয়েগে ও তার সহকারীরা। ডেনিস মুকওয়েগে প্রসঙ্গে নিউইয়র্ক টাইমসের কলাম লেখক নিকোলাস ক্রিস্টোফ বলেছেন, আমার বহু পুরানো বন্ধু কঙ্গোর স্ত্রী রোগবিশেষজ্ঞ ডেনিস মুকওয়েগে, যিনি ঝুঁঁকি নিয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া অসংখ্য নারীকে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সহায়তা দিয়েছেন। গণধর্ষণের শিকার হয়ে ক্ষতবিক্ষত হওয়া নারীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মধ্য দিয়ে ডেনিস মুকওয়েগের সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় বুকাভু শহরে তার পিনাজি হাসপাতালে তিনি নারীদের ফিস্টুলা অপারেশন করতেন। (নারীদের প্রস্রাবের রাস্তা ছিঁড়ে পায়খানার রাস্তার সঙ্গে এক হয়ে যাওয়ার নাম ফিস্টুলা। এতে রোগী প্রস্রাব ধরে রাখতে পারে না। এ রোগের ভয়াবহতা হলো, এতে অনবরত প্রস্রাব পড়তে থাকে, যা ভয়ংকর অস্বস্তিকর)। এমন বহু নারীর দেহে অস্ত্রোপচার করে তিনি ফিস্টুলা সারিয়ে তুলেছেন, যাদের শুধু প্রস্রাবজনিত কারণে নয়; বরং গণধর্ষণ ও ছুরি দিয়ে আঘাত করার কারণে তারা ফিস্টুলায় আক্রান্ত হয়েছেন। প্রথম দিকে তিনি শুধু তাদের সারিয়ে তোলার কাজেই ব্যস্ত থাকতেন। কিন্তু পরে তিনি এ ধরনের নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন এবং এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার আন্দোলন শুরু করেন। ক্রমে ক্রমে তিনি ব্যাপকভাবে আলোচনায় উঠে আসতে থাকেন।
প্রায় ১০ বছর ধরে শান্তিতে সম্ভাব্য নোবেল বিজয়ীর তালিকায় ডেনিস মুকওয়েগের নাম আসছিল। দীর্ঘদিনের বন্ধু নিকোলাস ক্রিস্টোফের মতে, ডেনিস মুকওয়েগে অত্যন্ত দৃঢ়চিত্তের লোক। মুকওয়েগে খুব ভালো করেই জানতেন, তিনি কী করছেন এবং তাকে কত বড় বিপদ মাথায় নিয়ে এ ধরনের সংগ্রাম করতে হচ্ছে। কিন্তু তারপরও তিনি সংগ্রামটি চালিয়ে গেছেন। এসব নিয়ে মুকওয়েগের সঙ্গে আলাপচারিতার সূত্র ধরে নিকোলাস ক্রিস্টোফ বলেন, এ নিয়ে তার সঙ্গে আমার অনেকবার কথা হয়েছে। সেসব কথোপকথনে আমি বুঝেছি, তিনি তার অবস্থান থেকে সরে আসার মতো লোক নন। পশ্চিমে তার কাজ খুবই সমাদৃত হয়েছে; কিন্তু নিজের দেশে তাকে হামলা থেকে রক্ষা করার মতো লোক নেই বললেই চলে। ২০১২ সালে অস্ত্রধারীরা তার পুরো পরিবারকে জিম্মি করার পর তার ওপর হামলা চালায়। সেই হামলায় তার গাড়িচালক নিহত হন এবং তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।
আরেক সাহসী যোদ্ধা ইয়াজিদি তরুণী নাদিয়া মুরাদের পরিচয় আমরা জেনেছি নোবেল কমিটির কল্যাণে। যিনি নিজের ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং প্রতিবাদ-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মানবতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। ইরাক ও সিরিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে তার এলাকার কাছে আইএস ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে হামলা চালিয়ে ছিল। ইয়াজিদিদের ওপর তারা গণহত্যা চালিয়েছিল এবং নারী ও শিশুকন্যাদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহারের জন্য অপহরণ করে ছিল। তাদের মধ্যে তিনি নিজেও ছিলেন। সিঞ্জারের কোচো থেকে তাদের অপহরণ করা হয়। আইএসের সদস্যরা নাদিয়ার ৬ ভাই ও মাকে হত্যা করেছিল। তার বোনদেরও অপহরণ করে আইএস।
রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞে মুখ বুঝে থাকা, রোহিঙ্গা নারী ধর্ষণ, নির্যাতন-নিপীড়নে নীরব ভূমিকা পালন করার কারণে নিজের ভাবমূর্তি অবক্ষয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই অং সান সু চির। আর এ কারণে যদি নোবেল পুরস্কার বাতিলও হয় তাতেও তার কোনো পরোয়া নেই। কানাডার সম্মানসূচক নাগরিকত্ব বাতিলেও কিছু যায় আসে না তার। এসব কোনো কিছুই তোয়াক্কা করেন না তিনি। কারণ হিসেবে তার যুক্তি, পুরস্কার-সম্মান সব যায়-আসেÑ এটাই নিয়ম। ৬ অক্টোবর জাপানি সংবাদমাধ্যম এনএইচকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব মন্তব্য করেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি। কানাডার সম্মানজনক নাগরিকত্ব প্রত্যাহার ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বাতিলের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, এতে কিছু যায়-আসে না। নোবেলের মতো পুরস্কার বা সম্মাননা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। রোহিঙ্গাদের প্রতি তার আচরণ এবং কথাবার্তা শুনে আমাদের মনে হয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজ কর্তব্যজ্ঞান, দায়িত্ববোধ এবং মানবিক গুণাবলি সু চি হারিয়ে ফেলেছেন। যে মানবিক গুণাবলি, মানবাধিকার সমুন্নত করতে, মানুষের মধ্যে মানবাধিকার জাগ্রত করতে ডেনিস মুকওয়েগে ও নাদিয়া মুরাদরা নিজের জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম করছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন, অন্যের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়েছেন তাদের ফের অভিনন্দন। সু চির প্রতি অনুরোধ, ডেনিস মুকওয়েগে ও নাদিয়া মুরাদের দিকে একবার ফিরে তাকান, তাদের কৃতকর্ম থেকে শিক্ষা নিন রোহিঙ্গাদের প্রতি যে অমানবিক আচরণ হচ্ছে তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করুন। অন্যথায় মুখের চুনকালি ঘুচবে না।

লেখক ও শিক্ষাকর্মী

উৎস: আলোকিত বাংলাদেশ

শেয়ার করুন