মানুষ কি ক্রমে ছোট হয়ে আসছে?

বাহার উদ্দিন

ঘুম ভাঙল দেরিতে। জানালার পর্দা সরাতেই চোখে বিঁধল মেঘলা গুমসো আকাশ। কার্তিকের। শরতের। রোদ নেই বাইরে। ফুরফুরে মেজাজ উধাও। নিশ্চয় কোথাও দূরে, আরো দূরে, আমাদের ত্রিসীমানার আড়ালে মেঘ জমেছে। সিগারেটের ধোঁয়ায় বন্দি শ্লেষ্মাচ্ছন্ন বুকের মতো দিক হারাচ্ছে প্রকৃতির স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস। দূষণতাড়িত মানুষও একই রকম হয়তো বা বিভ্রান্ত।

বেডরুম থেকে বেরিয়ে দেখি বাড়ি খালি। হাসিখুশির মেয়েটি স্কুলে চলে গেছে। ছেলে অফিসে। যাপনের নিত্যসঙ্গী একা লড়ছেন, নতুন গৃহকর্মী দাঁড় বাইছেন, রান্নাঘরের ভেতরে। কূলহারা মাঝি যেন। বাসনে, কলের জলে ছলাত ছলাত শব্দ বাজছে। কখন কী করবেন, কোন কাজ আগে, পরে কোনটা, দিশা মিলছে না। গিন্নি তাকে নিয়ে ব্যস্ত।

তবু কাগজ পড়ছি, পড়তে হয়, না ‘পড়লে যে পিছিয়ে পড়ব।’ না, পেছানো যাবে না। এগোতে হবে। সামনে, আরো সামনে। সময় পেরিয়ে, নিজেকে দূরে সরিয়ে, ভবিষ্যতের তটরেখা বেয়ে, সমুদ্রের দিকে, পাহাড়ের দিকে, সীমান্তহীনতার দিকে এগোতে হবে।

এটাই জীবন, জীবনের ভেতরে ও বাইরে অনন্ত যাত্রা। যে যাত্রায় তারুণ্য, চাঞ্চল্য ছুঁয়ে থাকে সারা দিন। ঘুমে, স্বপ্নে, দুঃস্বপ্নে সর্বক্ষণ। এটাই কবিতা পড়ার, ছবি দেখার, সাহিত্য আর ইতিহাস পাঠের শিক্ষা। এটাই নিষ্কাম প্রেমেরও নিশ্চিত প্রশিক্ষণ।

সক্রেটিস থেকে, মহামানব বুদ্ধ থেকে, হজরত মুহাম্মদ (সা.) থেকে, একালের আরজ আলী মাতুব্বর, অমর্ত্য-শঙ্খ—সবাই বহুমাত্রিক ভঙ্গিতে আমাদের বাইরের আমির আবরণকে বিমুক্ত করে ভেতরের যে আমির সাধনা করে গেছেন, যাঁরা এখনো শাশ্বত প্রবাহের মতো জাগ্রত, নিরন্তর ধ্যানী আর কর্মী—তাঁদের সবার দর্শন আর বহুবিদ্যার অনুশীলনকে, ব্যক্তিত্বের দীপ্তিকে আমরা শুধু পুজোই করি, কিন্তু দৈনন্দিন অভ্যাসে, ক্ষমতামত্ততার চমক ও গমকে, কর্মের ক্ষুদ্রতায়, আচরিত বৈষম্যে, ভাষা, ধর্ম আর আঞ্চলিকতার অনুশাসনে ওই সব, এই সব মনীষার প্রেম আর অঙ্গীকারকে, অঙ্গীকারের উত্তরাধিকারকে অনবরত খণ্ডিত, ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছি। এই পাপ ও মহাপাপকে মহাকাল রেহাই দেবে না। প্রতিশোধ দাবি করবে। মনুষ্যত্বের গণহত্যা, মানুষকে ক্রমাগত খাটো করার রাষ্ট্রীয়, ভাষিক ও ধর্মের নামে অধর্মীয় রক্তপিপাসা, অবজ্ঞা ও উদাসীনতার মূল্য দিতেই হবে।

অপশক্তির নৃত্য অথবা স্থানিক স্বার্থচিন্তা, একভাষিক, সাম্প্রদায়িক আধিপত্য অথবা অসংগঠিত রাজনীতির হিসেবি-বেহিসেবি উল্লাস দেখে ভয় হচ্ছে, প্রশ্ন জাগছে, আসমান কি নেমে আসছে নিচে? মানুষ কি ক্রমে ছোট হয়ে আসবে? রূপান্তরিত হতে হতে কাফকার অবিস্মরণীয় গল্প মেটামরফসিসের নায়ক গ্রিগর সামসার মতো হঠাৎ প্রকাণ্ড কীটজীব হয়ে উঠবে?

নিশ্চিত, হবে না। হতে পারে না। কেননা মানুষের চিন্তা আর ভাবনা, স্বপ্ন আর নিত্যনতুন আবিষ্কার ও আত্মোন্মোচন আকাশকে স্পর্শ করতে ব্যস্ত, যে আকাশ নিচু হতে জানে না, যে আকাশ নিরালম্ব নয়, যে আকাশ তার উদারতা দিয়ে, অসীমের বিস্ময় দিয়ে আমাদের মন ও মননকে লোকাকীর্ণ ও লোকায়িত অভিপ্রায়কে দুঃসাহসী আর অপরাজেয় করে তুলতে প্রশ্রয় দেয়। ঝড় আসে, চলে যায়, মানুষ ও আকাশের নিতিযাপন, নীতিক্রিয়া বদলায় না। বিবর্তনে অভ্যস্ত হয়েও তাদের সচেতন-অবচেতন সব ইচ্ছারই লক্ষ্য অব্যয় আর বিনাশবিরোধী।

তবু মানুষের অনুশাসিত পাপ, কিছু কিছু স্বেচ্ছাচার, ক্ষীণ দৃষ্টি এবং পরধর্ম, পরভাষার দমনকামনা দেখে চমকে উঠতে হয়, ভাবতেও হয়, কোথাও কোথাও সে কেন হিংস্র, অসংযত, নিজের কাঙ্ক্ষিত চেহারার চেয়ে ক্ষুদ্রতর ও প্রবল অসুস্থতার সঙ্গী হয়ে উঠছে? কেন সে সর্বনাশা আত্মঘাতী জিঘাংসা আর রাষ্ট্র নামক যন্ত্রের সহযোগী হতে চাইছে। কেন, নিজেকে, অশেষের শুভ্রতাকে হেয় করছে। এই যে সিরিয়া আর আফগানিস্তানে, কাশ্মীরে প্রতিনিয়ত একদল আরেক দলকে খুন করছে; এই যে দিল্লি এসে ঢাকার একদল স্বদেশের আরেক দলের বিরুদ্ধে বিষ ছড়াচ্ছে, গঠনশীল রাজনীতিকে হটাতে ভিন্ন দেশের হস্তক্ষেপ দাবি করছে; এই যে অসমের দরং জেলায় বিদেশি, ডি ভোটার সাজিয়ে দেওয়ার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে পর পর দুই অসহায় ভারতপ্রেমিক, দুই বৈধ নাগরিক আত্মঘাতী হয়ে গেলেন—তাঁদের আমরা কোন পরিচয়ে শনাক্ত করব? ভাষা ও ধর্মীয় পরিচিতির নির্বোধ, ভুল, জাতিবিদ্বেষী রাজনীতির শিকার বলে? তারা কি শুধু বাঙালি? শুধু এক বিশেষ ধর্মাবলম্বী?

জন্মের আগে আর মৃত্যুর পরে আমাদের পরিচয়ের অভিজ্ঞান কী? একজন গর্ভজাত, আরেকজন সদ্যোমৃত। এই মানুষকে যারা হেয় করে, ক্ষুদ্রতার আভরণ দিয়ে ঢেকে দিতে চায় তার মৃত্যুহীন সত্তাকে, তারাই ক্রমে ছোট হয়ে আসছে। তাদের আকাশ নেই। স্থায়ী অবলম্বন নেই। মনুষ্য দেহ নিয়েও তারা অমানুষ। তারাই দুঃস্বপ্নে, ঘুমের ঘোরে, ঘুম থেকে জেগে উঠেও একদিন দেখতে পাবে—বিকৃত, প্রকাণ্ড বীভৎস কীট হয়ে নিজেকেই গিলে খেতে চাইছে। তাদের ধাওয়া করছে আসমান। পুড়িয়ে দিচ্ছে সূর্য। পালাতে চাইছে তারা। পালানোর পথ নেই। বিমুখ স্থল আর জল। সমবেত ঘৃণা, সমবেত অরণ্য, সমবেত জনসমুদ্রে তারা অবরুদ্ধ। তৃণখণ্ডের মতো উড়ছে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ।

লেখক : সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা

উৎস: কালের কণ্ঠ

শেয়ার করুন