বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০: বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদী ব্যবস্থাপনা

ড. শামসুল আলম

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক ও ব-দ্বীপপ্রধান দেশ। এ দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নদী ও পানিসম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং কৃষি উত্পাদনের জন্য দেশব্যাপী পানির চাহিদা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে, দেশের বৈচিত্র্যময় কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিবেশের জন্য পানির অপরিহার্যতা, শুষ্ক মৌসুমে পানির স্বল্পতা এবং বর্ষা মৌসুমে পানির আধিক্য বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় অন্যতম চ্যালেঞ্জ। অধিকন্তু, পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার ৯৩ শতাংশ পানির উত্স বাংলাদেশের বাইরে হওয়ায় পানিসম্পদের ব্যবস্থাপনাকে জটিল করে তুলেছে। বাংলাদেশ প্রায়শই প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, নদীভাঙন, বর্ষা মৌসুমে ঘূর্ণিঝড় এবং শুষ্ক মৌসুমে খরার সম্মুখীন হয়ে থাকে। একইসাথে রয়েছে জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, আর্সেনিক দূষণ ইত্যাদি সমস্যা। এছাড়াও বাংলাদেশকে তার উজানের দেশগুলোর সাথে নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা লাভে অনিশ্চয়তার মোকাবিলা করতে হচ্ছে। কাজেই সমন্বিত এবং সামষ্টিক কৌশলগত পদ্ধতিতে এ জটিল প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় উন্নয়নে পানি, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবেশ, প্রতিবেশগত ভারসাম্য, কৃষি, ভূমি ব্যবহার ও অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ একটি অভিযোজনভিত্তিক, সামগ্রিক এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত মহাপরিকল্পনা। পানিসম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং পানির দ্বারা সৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও নদী-ভাঙন রোধ ব-দ্বীপ পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য। ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি ব্যবস্থাপনার ওপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। পানি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ যেমন দেশব্যাপী বন্যা, নদী এবং মোহনা অঞ্চলের নদী-ভাঙন ও পলি জমা, উপকূলীয় জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততা, হাওরের আকস্মিক পাহাড়ি ঢল এবং জলাভূমি ব্যবস্থাপনা, আন্তঃদেশীয় পানি ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ শতবর্ষী ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০তে কতিপয় কৌশল ও কার্যক্রমের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও কৌশল: বন্যার পুনরাবৃত্তি বাংলাদেশের একটি স্বাভাবিক ঘটনা। নদী-প্রবাহ ও নিষ্কাশন সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর গড়ে দেশটির প্রায় ২০-২৫ শতাংশ অঞ্চল অতি প্লাবিত হয়। তিনটি প্রধান নদী (পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা) যখন একই সময়ে পানি-প্রবাহের চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছে, তখন দেশে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়। সাধারণত, চরম বন্যার সময় দেশের ৫৫-৬০ শতাংশ অঞ্চল প্লাবিত হয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বড় ধরনের বন্যার মাত্রা ও পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। উজানের দেশগুলোর নদীতে বাঁধ নির্মাণ, চর পড়ে নদী-প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, অবৈধভাবে দখলকৃত প্লাবনভূমিতে অপরিকল্পিত নগরায়ন, কাঠামোগত ও অ-কাঠামোগত পদক্ষেপ গ্রহণে সমন্বয়ের অভাব, প্রভৃতি মনুষ্যসৃষ্ট কারণে সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত কৌশলসমূহ হচ্ছে:

বন্যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশল :বন্যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশল তিনটি মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত যথা: ১) পরিবেশের ক্ষতি না করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহায়ক কৌশল; ২) প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করে জলবায়ু পরিবর্তন অভিঘাত-সহিষ্ণু বাংলাদেশ গড়ে তোলা; এবং ৩) সকলের অংশগ্রহণে জলবায়ু পরিবর্তন অভিঘাত সহিষ্ণুতার ওপর ভিত্তি করে উন্নয়ন।

বন্যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশল ১: অর্থনৈতিক

ভিত্তি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষা প্রদান

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে এরূপ অঞ্চলসমূহে একটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন। এ সংক্রান্ত সাধারণ কার্যক্রমগুলো হলো— বাঁধ নির্মাণ, ভাঙন রোধ এবং কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। উপরন্তু, হাসপাতাল, বিদ্যুত্ কেন্দ্র, শিল্প-কারখানা এরূপ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং তাদের আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থাদি বন্যা অভিযোজি হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বন্যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো এমনভাবে নেয়া হবে— যাতে বাঁধ বা অন্য কোনো অবকাঠামো নির্মাণের ফলে তা অন্য এলাকায় জলমগ্নতা ও বন্যাসহ কোনো নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে। বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-তে এ সংক্রান্ত উপ-কৌশলসমূহ হচ্ছে: ১) অর্থনৈতিকভাবে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অঞ্চল এবং প্রধান নগরসমূহ রক্ষায় বাঁধ, বন্যা প্রতিরোধক এবং বৃত্তাকৃতির বাঁধ (Ring dikes)-এর মাধ্যমে সুরক্ষা; ২) অভিযোজি এবং বন্যা-ঝড়-ঝঞ্ঝা সহিষ্ণু ভবন নির্মাণ; ৩) স্থানিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বন্যার বিপর্যয় অনুসারে অঞ্চলভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস/বন্যা ঝুঁকি মানচিত্র (flood hazard zoning) প্রণয়ন ও পদক্ষেপ বিবেচনা; ৪) বন্যা-পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদারকরণ (বেসিন ও হটস্পটভিত্তিক); এবং ৫) গুরুত্বপূর্ণ বাঁধসমূহের উচ্চতা (পোল্ডারসহ) ও দৃঢ়তা বৃদ্ধি এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন।

বন্যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশল ২: ভবিষ্যতের জন্য

বন্যা ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশন স্কিমের উন্নয়ন

একটি জলবায়ু-সহিষ্ণু বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য বর্তমান ভৌত ও আর্থ-সামাজিক চাহিদা এবং ভবিষ্যতের উন্নয়ন উপযোগী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন আছে। জলবায়ু এবং পানি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং পরিবর্তনশীল ভূমি ব্যবহার, অবকাঠামো ও নগরায়নের কথা চিন্তা করে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিদ্যমান প্রক্ষেপণে দেখা যায় যে, ২০৩০ সাল নাগাদ দ্রুত পরিবর্তনশীল আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট এ ক্ষেত্রে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বন্যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে উজানের দেশের পানিপ্রবাহ, নদীপথের পরিবর্তনে নদী-ভাঙন এবং চর জেগে ওঠার বিষয়টিও চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০তে এ সংক্রান্ত উপ-কৌশলসমূহ হচ্ছে: ১) নদীতে বন্যা ও পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যক্রম গ্রহণের পূর্বে ডুবোচর ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব প্রদান; ২) FMD (flood management and drainage) scheme-এর অভ্যন্তরে নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন; ৩) জলাধার সংরক্ষণ এবং বন্যা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পসমূহ রক্ষা/পুনঃস্থাপন; ৪) বাঁধ ও অন্যান্য পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা কাঠামো সংস্কার, পুনঃনির্মাণ, প্রয়োজন অনুযায়ী নকশা সংশোধন ও পরিবর্তন; এবং ৫) সম্ভাব্যতা জরিপের মাধ্যমে সকল নদীগুলোর খনন এবং ড্রেজিং সংক্রান্ত কার্যক্রম গ্রহণ।

বন্যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশল ৩: বিপন্ন

জনগোষ্ঠীর জীবিকার সুরক্ষা

অর্থনীতির ভিত্তিসমূহের সুরক্ষার পাশাপাশি দেশের বিপন্ন অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা প্রদান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ, যা রাষ্ট্রের ‘কাউকে পিছনে ফেলে নয়’ নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০তে এ সংক্রান্ত উপ-কৌশলসমূহ হচ্ছে: ১) বর্ষা মৌসুমে কিংবা বন্যার সময় নদীতে প্রবাহিত অতিরিক্ত পানি দ্রুততম সময়ে নিষ্কাশনের সুবিধা রেখে নদী ও সম্ভাব্য স্থানসমূহে বাঁধ ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম গ্রহণ; ২) নদী ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত বন্যা ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ;৩) বহুমুখি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রসমূহের সংখ্যা বাড়ানো, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ এবং আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও জরুরি সেবা সম্প্রসারণ; ৪) বন্যা প্রতিরোধী পানি সরবরাহ এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন; ৫) বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধী আবাসন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণ এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদান; ৬) সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং দুর্যোগপরবর্তী দ্রুত পুনরুদ্ধার কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ; এবং ৭) নদী ব্যবস্থাপনার সাথে সাথে বন্যা, নিষ্কাশন এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণে নদীর প্রবাহ নিশ্চিত করা।

নদী ব্যবস্থাপনা ও কৌশল: দেশের প্রধান নদ-নদীগুলো ব-দ্বীপ গঠনে মূল ভূমিকা পালন করেছে। তাই ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-তে নদী ব্যবস্থাপনার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নদীগুলোর জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশল প্রণয়ন জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে পানি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জগুলো গতিশীল এবং প্রবাহমান নদী থেকে উদ্ভুত হয়েছে। তাই নদী অঞ্চল এবং মোহনা সংশ্লিষ্ট কৌশলসমূহ হচ্ছে: ১) বন্যার ঝুঁকি কমাতে নদী ও পানি প্রবাহের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ রাখা; ২) পানি প্রবাহের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নদীগুলোকে ড্রেজিং-এর মাধ্যমে স্থিতিশীল রাখা; ৩) পর্যাপ্ত পরিমাণে ও মানসম্মত স্বাদু পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা; ৪) নদীগুলোর পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা; ৫) নদীগুলোতে নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য নৌ-পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং প্রধান নৌ-পথগুলো সাংবাত্সরিক চালু রাখা; ৬) নতুনভাবে জেগে ওঠা চর এলাকায় নদী ও মোহনা ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ; এবং ৭) সুদৃঢ় ক্যাপিটাল ড্রেজিং এবং রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচিসহ যথাযথ স্থিতিশীল পলি (sediment) ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। তাছাড়া বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০তে আন্তঃদেশীয় পানি ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ব্যবস্থারও বেশ কিছু কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে ।

আন্তঃদেশীয় পানি ব্যবস্থাপনা ও কৌশল:পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার সঙ্গমস্থল হওয়ায় এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে অন্ত ও আন্তঃদেশীয় প্রবাহ থাকায় ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার ও চীনের সাথে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত সহযোগিতা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে পৃথকভাবে প্রচেষ্টার চেয়ে যৌথ সহযোগিতার মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০তে এ সংক্রান্ত কৌশলসমূহ হচ্ছে: ১) উজানের নদীসমূহ হতে পানি সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিকে বিবেচনায় রেখে সে অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ; ২) উজানের পানি প্রবাহের বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় রেখে সংশ্লিষ্ট দেশের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে উপযুক্ত স্থান নির্বাচনপূর্বক প্রয়োজনে দেশের অভ্যন্তরে সম্ভাব্য স্থানগুলোতে বাঁধ বা ব্যারেজ নির্মাণের বিষয় বিবেচনা করা; ৩) পানিসংক্রান্ত কূটনীতির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধান এবং সংঘাত প্রতিরোধ; ৪) তিস্তার পানি বন্টনসংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদন তত্পরতা অব্যাহত রাখা; ৫) চাহিদাভিত্তিক যৌথ নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ; ৬) পানিসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে তৃতীয় পক্ষকে (বহুপক্ষীয় বা দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বা দেশ) সম্পৃক্তকরণ; এবং ৭) অববাহিকাভিত্তিক বন্যা পূর্বাভাস পদ্ধতির উন্নয়ন।

অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ব্যবস্থা ও কৌশল: বাংলাদেশের মোট এলাকার প্রায় সাত ভাগ জুড়ে আছে নদী, খাল-বিল মিলে প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটারের একটি নেটওয়ার্ক। নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এ দেশে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন সুবিধা অনেক বেশি। ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ব্যবস্থা গতিশীল করার জন্য প্রস্তাবিত কৌশলসমূহ হচ্ছে: ১) উজানের নদীসমূহ হতে পানি সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিকে বিবেচনায় রেখে সে অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে; ২) উজানের পানি প্রবাহের বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় রেখে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে উপযুক্ত স্থান নির্বাচনপূর্বক জলাধার তৈরিতে প্রয়োজনে দেশের অভ্যন্তরে সম্ভাব্য বাঁধ বা ব্যারেজ নির্মাণের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া; ৩) পানিসংক্রান্ত কূটনীতির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধান এবং সংঘাত প্রতিরোধ; ৪) তিস্তার পানি বন্টন সংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদন তত্পরতা অব্যাহত রাখা; ৫) চাহিদাভিত্তিক যৌথ নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ; ৬) পানিসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে তৃতীয় পক্ষকে (বহুপক্ষীয় বা দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বা দেশ) সম্পৃক্তকরণ; এবং ৭) অববাহিকাভিত্তিক বন্যা পূর্বাভাস পদ্ধতির উন্নয়ন।

বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০তে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদী ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত কর্মকৌশলসমূহের সুষ্ঠু ও কার্যকরি বাস্তবায়ন এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ন্যায়সঙ্গত সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং অন্যান্য ব-দ্বীপ সমস্যা মোকাবিলা করার সুযোগ তৈরি হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ সম্পূর্ণরূপে বাংলাদেশের নিজস্ব মহাপরিকল্পনা, যা সমন্বিত, সার্বজনীন এবং সময়ের সাথে পরিবর্তনশীল হিসেবে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। দেশের স্থিতিশীল আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এটি হবে ভবিষ্যতের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ। এই মহাপরিকল্পনা ভবিষ্যত্ প্রজন্মগুলোর জন্য বর্তমান প্রজন্মের একটি শ্রেষ্ঠ উপহার ।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব), সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন।

উৎস: ইত্তেফাক

শেয়ার করুন