সড়কে শৃঙ্খলা, কিভাবে সম্ভব?

মাসুদ কামাল

এবার ঈদে বাড়ি গিয়েছিলাম। আমার বাড়ি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায়। ঢাকা থেকে তেমন একটা দূরে নয়, মাত্র ১৩০ কিলোমিটার। তার উপর গাজীপুর থেকে চার লেনের নতুন রাস্তা হওয়াতে এই দূরত্বকে আরও অনেক কম মনে হয়। প্রথম যে দিন এই চার লেনের রাস্তায় উঠলাম, মনে হলো যেন গাড়ি উড়ে উড়ে চলেছে।

চার লেনের এই রাস্তার কারণেই আমরা যখন বাড়ি যাই, কেবল গাজীপুর পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার রাস্তার কথাই বিবেচনায় নিই। ভাবিÑ এই ৩২ কিলোমিটার পথটুকু পার হতে পারলে আর চিন্তা নেই, তারপর তো ফোর লেন! এবারও সেই হিসাব করে রওয়ানা হলাম। বিকাল পৌনে চারটায় গাড়ি ছাড়লো, গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার পথ পেরুতে সময় লাগলো সোয়া পাঁচ ঘণ্টা, অর্থাৎ গড়ে প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ছয় কিলোমিটার পথ। এটা যে কোনো সাধারণ মানুষের পায়ে হাঁটার গতি। চার লেনের রাস্তায় উঠে আমাদের চালক দ্রুত একটা হিসাব করে বললেন, এখন আর বেশি সময় লাগবে না, রাত এগারটার মধ্যে আমরা বাসায় পৌঁছে যেতে পারবো।

কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ড্রাইভার সাহেবের হিসাব ঠিক হয়নি। বাসায় পৌঁছেছি আমরা রাত আড়াইটায়। বাড়তি এই সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় গেছে ময়মনসিংহের একেবারে উপকণ্ঠে আরও একটা বিকট জ্যামে। এই যানজটের কারণ কি? এখানে তো ফোর লেন রাস্তা, তাহলে এখানে কেন জ্যাম হবে?

বসে বসে কি করা যায়, আমি ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিলাম। আমার স্ট্যাটাসে হয়তো সরকারের একটু সমালোচনা ছিল। যে কোনো দুর্ভোগেই আমরা যখন সরাসরি কোনো কারণ দেখতে না পাই, সরকারকে দায়ী করি। জাতি হিসেবে এটা আমাদের অনেকটা মজ্জাগত। আমিও অনেকটা সেরকম করলাম। স্ট্যাটাসটা আপ করতে যা সময় লাগলো, দু ধরনের প্রতিক্রিয়া খুব দ্রুতই পেতে শুরু করলাম। সরকারবিরোধী যারা, তারা সরকার আর প্রশাসনকে তুলোধোনা করতে শুরু করলেন। আর আওয়ামী লীগ সমর্থকরা আমাকে বিএনপি-জামায়াতের প্রতিনিধি হিসাবে চিহ্নিত করে এমনভাবে লিখতে শুরু করলেন, যেন জ্যাম-ট্যাম কিছু নয় সরকারের সমালোচনা করতেই এই জ্যামকে আমি উপলক্ষ হিসাবে বেছে নিয়েছি।
আমি লিখেছিলাম, চারদিকে এই যে এত উন্নয়নের কথা শুনি, এই যে দুর্বিষহ অবস্থায় আমি বসে আছি, এটা কোন উন্নয়নের প্রতিফলন? সরকার সমর্থকদের কাছ থেকে যেসব মন্তব্য পেলাম সেগুলো এরকম: জ্যামের সঙ্গে উন্নয়নের কি সম্পর্ক? সব লোক একসঙ্গে রাস্তায় নামলে জ্যাম তো একটু হবেই। মানুষের দুর্ভোগকে সরকারবিরোধী মনোভাবে রূপান্তরিত করতে ইচ্ছাকৃতভাবে এই জ্যাম সৃষ্টি করা হয়েছে। উন্নয়ন যদি না-ই হবে তাহলে রাস্তাটি চার লেন হলো কি করে? গাজীপুর থেকে চুড়খাই পর্যন্ত ৮০ কিলো রাস্তা যে দেড় ঘণ্টায় এলেন, সেটা তো লিখলেন না; কিছুক্ষণ জ্যাম পেয়েই এত বিরক্তি? রাস্তায় বসে স্মার্ট ফোনে ফেসবুকে এই যে স্ট্যাটাস দিতে পারছেন, এটা কি উন্নয়ন নয়? সরকারের এই ভালো কাজটাও কি চোখে পড়ছে না?

তবে যে বিষয়টা জানার আগ্রহ আমার শুরু থেকেই ছিল, সেটি মিটলো আমার এক বন্ধুর মন্তব্যে। বন্ধুটির বাড়ি আবার ওই চুড়খাই এলাকাতেই। তিনি লিখলেন, ‘এই দীর্ঘ জ্যামের কারণ কতিপয় পুলিশের চাঁদাবাজি। দিঘারকান্দা বাইপাসে গাড়ি থামিয়ে চলছে পুলিশের চাঁদাবাজির মহোৎসব।’ তার এই মন্তব্যকে সেই মুহূর্তে একেবারেই উড়িয়ে দিতে পারলাম না। দু দিন পর বাস মালিক সমিতির একজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হলো। তাকেও জিজ্ঞাসা করলাম, ওই দিনেই জ্যামের কারণ। তিনি জানালেন, গাজীপুর থেকে টাঙ্গাইলের রাস্তায় জ্যাম থাকায় উত্তরবঙ্গগামী অনেক গাড়িই ময়মনসিংহ হয়ে গেছে। গাড়ির বাড়তি এই চাপের বিষয় ওয়াকিবহাল ছিল না পুলিশ। ফলে ময়মনসিংহ বাইপাসে ঠিকমতো ট্রাফিক কন্ট্রোল করা যায়নি। তাই এই জ্যাম। পুলিশের চাঁদাবাজির কথা জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কোনো জবাব দিলেন না, কেবল একটু হাসলেন। তারপর বললেনÑ আসলে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টে একটু সমস্যা হয়েছিল। আরও বললেনÑ দেখুন, অনেকেই কিছু হলেই বাস মালিক-শ্রমিকদের দায়ী করে দায় সারেন। কিন্তু বলুন দেখি, এই জ্যামে আমাদের কি লাভ? জ্যাম না থাকলে আমরা একটা ট্রিপ বেশি দিতে পারতাম।

এই ঘটনা নিয়ে আমি আরও কয়েকটা পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। সব মিলিয়ে আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে, এমন দুঃসহ জ্যাম অবধারিত নয়, এটাকে এড়ানো যায়। এটা ঠিক ঈদের সময় রাস্তায় গাড়ির চাপ একটু বেড়ে যায়, ফলে গাড়ির গতি হয়তো একটু স্লো হবে, কিন্তু পাঁচ-সাত কিলোমিটার পথ যেতে সাড়ে তিন ঘণ্টা লাগবেÑ এমন হওয়ার কোনোই কারণ নেই। আমার চুড়খাইয়ের বন্ধু যে পুলিশের চাঁদাবাজির কথা বলেছেন, সেটা বোধকরি একেবারে অমূলক নয়। এমন কথা আরো কয়েকজন বলেছেন। গাড়ির এমন প্রবল প্রবাহের মধ্যে কোনো একটা গাড়িকে তিন মিনিট থামিয়ে রাখলেই পিছনে গাড়ির লাইন পড়ে যেতে বাধ্য।

চাঁদাবাজি হোক বা ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টের ঘাটতি হোকÑ দুটোরই দায় কিন্তু শেষ পর্যন্ত গিয়ে সরকারের উপরেই পড়ে। চার লেন রাস্তা করে দিলেন, আর সেই লেন দিয়ে গাড়ি কিভাবে চলাচল করবে তার দেখভাল করলেন না, তাহলে উন্নয়নের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছবে কি করে? ময়মনসিংহের এই চার লেনের রাস্তায় উল্টো পথে অহরহ গাড়ি চলাচল করতে দেখা যায়। আমি নিজে বহুবার দেখেছি উল্টো পথে আগে-পিছে পুলিশের গাড়ি নিয়ে ভিআইপির গাড়ি চলাচল করতে। সেদিন টেলিভিশনে এক সাংবাদিককে দেখলাম চট্টগ্রাম রোডে জ্যামের রিপোর্ট করতে গিয়ে তিনি যা দেখেছেন, সেটা বর্ণনা করছেন। তিনি বলছিলেন, মেঘনা ব্রিজের পর তিনি যখন রাস্তার একদিকে দীর্ঘ জ্যামে আটকে ছিলেন, তখন অপর পার্শ্বে উল্টো দিক দিয়ে পুলিশ প্রটোকলসহ যাচ্ছিল একটি মন্ত্রীর গাড়ি।

মন্ত্রী কিংবা ভিআইপির গাড়ি হলেই ট্রাফিক আইন ভাঙা যায়Ñ এমন নিয়ম কি পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে আছে? এমন আইন ভাঙা মন্ত্রী যখন সাধারণ মানুষকে আইন মানার কথা বলবেন, মানুষ তখন সেটাকে কিভাবে গ্রহণ করবে? এসব ঘটনার মাধ্যমে, একজন মাত্র ব্যক্তির কারণে, পুরো সরকারের প্রতিই কি একধরনের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে না? উল্টো পথে মন্ত্রীর যাওয়া যে আরও অনেককে যেতে উৎসাহিত করে, সেটাই বা কিভাবে রোধ করা যাবে। মন্ত্রী যান বলে, এমপি সাহেবরা যান। রাজনৈতিক নেতারা যান। তাদের মালিকানাধীন বাস ট্রাকও যায়। এভাবে যারা যারা নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করে, তাদের গাড়িই অবলীলায় যায় উল্টো পথে। উল্টো পথে যেতে মাড়িয়ে যায় এমনকি পুলিশের মোটরবাইকও, যেমনটি গত সপ্তাহে ঘটলো মানিকগঞ্জে। স্ত্রী-কন্যাকে বাইকের পিছনে বসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন এক পুলিশ কর্মকর্তা, উল্টো পথে আসা বাসে চাপা পড়ে কন্যাসহ পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হলেন। হতভাগ্য স্ত্রী এখনো হাসপাতালে। এই যে অনিয়ম, এটা কিন্তু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। চলতে থাকা ক্ষমতাবানের নিয়ম ভঙ্গের ধারাবাহিকতারই চূড়ান্ত পরিণতি কেবল।

ক্ষমতাবানের আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি উৎসব পার্বণে পুলিশের নির্লজ্জ চাঁদাবাজি, এটিও কি সরকারের জন্য বিব্রতকর নয়? অনেকেই বলে থাকেন, এই সরকারের আমলে পুলিশ যতটা বেপরোয়া আচরণ করছে, এতটা নাকি অতীতে আর কখনোই দেখা যায়নি। মানুষের মনে যদি এ ধরনের চিন্তা জন্ম নিয়ে থাকে, সেটাকে দূর করার দায়িত্বও সরকারকেই নিতে হবে। প্রকাশ্য চাঁদাবাজি চলতে দিলে বরং ওই চিন্তাতেই আরও ডালপালা গজাবে।

আমি সবসময়ই মনে করি, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সড়কগুলোতে যে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে, সেটা অনেকটাই কমানো যায় যথাযথ ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে। আইন যতটুকু যা আছে, সেটিকেই যদি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়, পরিস্থিতির উন্নতি হতে বাধ্য। সেদিন একটা তথ্য পেলাম, গত ২০১৭-এর জুলাই থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত সরকার ২৪ হাজারেরও বেশি ভারী যানবাহনের লাইসেন্স দিয়েছে। আর একই সময়ে ভারী যানবাহন চালানোর জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়েছে মাত্র ৬৪১ জনকে। তাহলে বাকি গাড়িগুলো কে চালাবে? গাড়ির লাইসেন্স যখন পাওয়া গেছে, রাস্তায় সেগুলো তো চলছে। কে চালাচ্ছে? নিশ্চয়ই লাইসেন্সবিহীন অথবা ভুয়া লাইসেন্সধারী কেউ। তো সেগুলোকে ধরলেই হয়। পুলিশ ধরে না কেন? আসলে পুলিশ ধরে, ধরে আবার ছেড়ে দেয় কিছু উৎকোচের বিনিময়ে। যদি ধরে ছেড়ে না দিতো, এরাও লাইসেন্স নিয়ে নিতো। এতো বেপরোয়াভাবে চালাতো না। নেতারা যখন উল্টো পথে চলেন, তার আগে-পিছে পুলিশ থাকে। এটা যে বেআইনি, সেটা কি এই পুলিশরা কখনো নেতাদের বলেছেন? এভাবে পুলিশ নিজেই যদি আইন ভাঙেন, তারা জনগণকে কিভাবে আইন মানতে বলতে পারবেন? আর আইন যদি মানাতে না পারেন, পরিস্থিতির উন্নতিই বা ঘটাবেন কিভাবে?

মূল কথা হচ্ছে, ওই আইন মানা। আর এটা শুরু হতে হবে উপরের দিক থেকে। আইন না মানার প্রবণতা যদি নিয়মে পরিণত হয়, উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিয়েও কোনো লাভ হবে না। অনিয়মের আবর্তে হারিয়ে যাবে সবকিছু।

মাসুদ কামাল: লেখক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

শেয়ার করুন