লন্ডনে দুইদিন ব্যাপী বাংলাদেশ বইমেলা অনুষ্ঠিত

প্রবাস ডেস্ক :: লন্ডনে দুইদিন ব্যাপী বাংলাদেশ বইমেলা চলছে রবিবার দুপুর থেকে। সোমবার সন্ধ্যায় হবে সমাপনী অনুষ্ঠান। বইমেলাকে কেন্দ্র করে কবি, লেখক, সাংবাদিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের আড্ডা জমে উঠেছে পূর্ব লন্ডনের ব্রার্ডি আট সেন্টার। এক বছর বন্ধ থাকার পর আবারো জমে উঠেছে বইয়ের পাঠ এবং প্রকাশনা সংস্থার নেতৃবৃন্দের পদচারনায়।

এবারের বইমেলায় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিষদ, যুক্তরাজ্য প্রয়াত সাংবাদিক আব্দুল মতিন ও তাসাদ্দুক আহমেদের নামে এখন থেকে প্রতি বছর নতুন দুটো পদক প্রদানের ঘোষণা দেয়।

এবারে আব্দুল মতিন সাহিত্য পদক পান কবি রব্বানী চৌধুরী ও তাসাদ্দুক আহমদ শিল্প ও সংস্কৃতি পদক পান মুক্তধারা নিউইয়র্কের কর্ণধার বিশ্বজিত সাহা। অনুষ্ঠানের ফাঁকে রব্বানী চৌধুরী ও বিশ্বজিত সাহার প্রতিনিধির হাতে পদক তুলে দেন অতিথিরা।

তৃতীয় বাংলা খ্যাত ব্রিটেনে বাংলা ভাষা, সাহিত্য সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে প্রায় ৪০টি সংগঠন ও বিভিন্ন লেখক, কবি সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিষদ প্রতিবছর আয়োজন করে থাকে বাংলাদেশ বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব।

পূর্ব লন্ডনের ব্রাডি আর্টস সেন্টারে রবিবার স্থানীয় সময় বেলা ১টায় বেলুন উড়িয়ে ফিতা কেটে উদ্বোধন করা হয় দুইদিনব্যাপী বাংলাদেশ বইমেলা, সাহিত্য ও সাংস্কৃ্তিক উৎসব ২০১৮। বেলুন উড়িয়ে এই উৎসব উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্যিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীসহ অতিথিরা। উদ্বোধন পরবর্তী আলোচনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি ফারুক আহমেদ।

আলোচকরা তাদের বক্তব্যে বলেন, বাংলা ভূখণ্ডের বাইরেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে ধরে রাখাও এর প্রসারে অভিবাসী বাংলাদেশিরা যেভাবে ভূমিকা রাখছেন, তাতে বাংলা ভাষা ও বই যে কখনো অস্তমিত হবে না এটি নিশ্চিত করে বলা যায়।

সংস্কৃতিকর্মী স্মৃতি আজাদ ও রেজওয়ান মারুফের যৌথ পরিচালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি আসাদ মান্নান।  বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক মাহমুদ শাহ কোরেশী, কানাডা প্রবাসী কবি সাইফুল্লা মাহমুদ দুলাল, শীর্ষ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘আগামী’র কর্ণধার ওসমান গণী, ব্রিটেনে মুক্তিযুদ্ধের প্রবীণ সংগঠক ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ সভাপতি সুলতান শরীফ এবং লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি সৈয়দ নাহাস পাশা।

স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা ইসহাক কাজল। আরো বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ থেকে আগত বিশিষ্ট লেখক, নাগরী গবেষক ও শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা সংস্থা উৎস প্রকাশনীর কর্ণধার মোস্তফা সেলিম, সাংবাদিক নজরুল ইসলাম বাসন, কানাডা থেকে আগত কবি আঞ্জুমান রোজি, ঢাকা থেকে আগত নাজমা মান্নান ও লন্ডন বারা অফ রেডব্রিজের লেবার দলীয় ডেপুটি হুইপ কাউন্সিলার সৈয়দা সায়েমা আহমেদ।

প্রধান অতিথি কবি আসাদ মান্নান ব্রিটেনে বাংলাদেশ বইমেলা আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, বই আমাদের মনের খোরাক জোগায়। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিষদ, ইউকে বইমেলা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে এই মনের খোরাকেরই যোগান দিচ্ছে, অভিনন্দন এই সংগঠনের প্রতি।

তিনি বলেন, বই না থাকলে আমি হয়তো আজকের আসাদ মান্নান হয়ে উঠতাম না। হয়তো পড়ে থাকতাম সন্দীপের কোনো এক অজ পাড়া গাঁয়ে। ‘বিষাদ সিন্ধু’ পড়ার মাধ্যমেই বইয়ের জগতে তার প্রবেশ এমনটি জানিয়ে সাম্প্রতিক সময়ের বাংলা কবিতার এই অন্যতম প্রাণপুরুষ বলেন, ‘বিষাদ সিন্ধু’র মাধ্যমে যে জগতে প্রবেশ করেছিলাম, সে জগতে এখনও সাঁতার কাটার চেষ্টা করছি।

এবারের লন্ডনের এই বইমেলায় বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কোনো আর্থিক সহযোগিতা নেই, এমন অভিযোগের উত্তরে সরকারের অন্যতম শীর্ষ আমলা কবি আসাদ মান্নান বলেন, সরকারি সহযোগিতা নিয়ে সাহিত্য-সাংস্কৃতি চর্চা হয় না, এই চর্চায় প্রয়োজন নিজের ভেতরের ইচ্ছে ও সৃজনশীল মানুষ। আমাদের কোনো কিছুরই অভাব নেই, অভাব সেই সৃজনশীল ‘মানুষ’ এর। বই পড়ার মাধ্যমে আমাদের সেই ‘মানুষ’ তৈরি করতে হবে। শিকড় সংস্কৃতির সাথে প্রবাসে বেড়ে ওঠা প্রজন্মকে সম্পৃক্ত রাখতে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিষদ, ইউকের ‘বাংলাদেশ বই মেলা’ বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকাশের ইতিহাসে অংশ হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেন কবি আসাদ মান্নান।

 

বিশেষ অতিথি আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, লন্ডনে বইমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে আট বছর ধরে। টানা ৭টি বছর অনুষ্ঠিত হওয়ার পর তৎকালীন উদ্যোক্তাদের কারো কারো অনিয়মের কারনে গত বছর এটি অনুষ্ঠিত হয়নি।

তিনি বলেন, সাহিত্য সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ব্যবসায়িক মনোভাব ঢুকে গেলে এ আন্দোলন আর ঠিকে থাকে না। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিষদের সাবেক কর্মকর্তাদের কারো কারো মধ্যে এই ব্যবসায়িক মনোভাব ঢুকে যাওয়ার কারনেই গত বছর বইমেলা হয়নি, বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ও তাদের সহযোগিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল।

গাফ্ফার চৌধুরী এ বছর আবার বইমেলা আয়োজন করায় উদ্যোক্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আপনাদের এ উদ্যোগ ইতিহাস হয়ে থাকবে।

বিশেষ অতিথি বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক মাহমুদ শাহ কোরেশী বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসারে ব্রিটেনের বাংলাদেশি কমিউনিটির অবিরাম চেষ্টার প্রশংসা করে বলেন, ব্রিটেনের মত দেশে বাংলাদেশ বইমেলার মতো এমন একটি আড়ম্বর আয়োজন আমাদের আরো দীর্ঘদিন বেচেঁ থাকার প্রেরণা জোগায়। আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী তার সহপাঠী, এমন তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, ব্রিটেনে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বিকাশের আন্দোলনে গাফ্ফার চৌধুরীকে পাশে পেয়েছেন, এটি আপনাদের পরম পাওয়া।

কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল ব্রিটেনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতি বছর বইমেলা আয়োজনের কথা উল্লেখ করে বলেন, যেখানেই এমন অনুষ্ঠান হয়, সেখানেই ছুটে যাই। আসলে বিশ্বব্যাপী আয়োজিত বাংলা এই বইমেলাগুলো আমাদের আশ্বাস দেয় বাংলা ভাষা ও বই কোনোদিন অস্তমিত হবে না।

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আগামীর কর্ণধার ওসমান গণি গাফ্ফার চৌধুরীকে আরেকটি বাংলাদেশ আখ্যায়িত করে বলেন, গাফ্ফার চৌধুরীদের উত্তরসূরীরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে নিয়ে যাবেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এটিইতো স্বাভাবিক। তিনি বলেন, শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা অনেক প্রকাশক লন্ডনের বইমেলায় আসি। এবারও এসেছি গাফ্ফার চৌধুরীর অনুরোধে।

বিশিষ্ট নাগরী গবেষক মোস্তফা সেলিম আলোচনা অনুষ্ঠানের অর্ডিয়েন্সকে জানান, নাগরী ভাষার ইউনেস্কো স্বীকৃতির পথে আগাচ্ছেন তারা। বিপুল সংখ্যক নাগরী পুঁথি তারা প্রকাশ করেছেন, এমনটি জানিয়ে তিনি বলেন, আরো ২০/২৫টি নাগরী গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ করলেই ইউনেস্কো স্বীকৃতির দাবিদার হতে পারি আমরা। দেশে গিয়েই এই কাজগুলো করতে চাই।

দুইদিনব্যাপী এই বই মেলায় ‘আগামী’, ‘উৎস’, ‘ইত্যাদি’, ‘পাঞ্জেরি’, ‘রূপসী বাংলা’সহ অর্ধশতাধিক প্রকাশনা সংস্থা অংশ নিচ্ছে। মেলার প্রথম দিনই দর্শক সমাগমে মূখর হয়ে উঠে মেলা প্রাঙ্গণ।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিষদ, যুক্তরাজ্যের সভাপতি ফারুক আহমদ বই মেলার বিপুল উপস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, যে উৎসবের সাথে লেখক ও পাঠকের আবেগ অনুভূতি জড়িত তা নিয়ে কোনো ব্যবসা চলে না। মনের তাগিদ থেকেই আমরা আমাদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে বিগত বছরগুলোতে বই মেলা করে এসেছি, ভবিষ্যতেও করবো।

বাংলাদেশ থেকে আসা প্রকাশনীগুলো অপ্রত্যাশিত বই বিক্রিতে খুশী। আগামী প্রকাশনীতে হুমায়ূন আজাদের বইয়ের ক্রেতা ছিলেন সবচেয়ে বেশী। মেলা শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সব বই শেষ হয়ে যায়। অনেক ক্রেতাই স্টলে গিয়ে হুমায়ূন আজাদের বই খুঁজে না পেয়ে আশাহত হয়েছেন। আগামীতে আরো বেশী সংখ্যক বই নিয়ে মেলায় অংশ নেওয়ার প্রত্যয় ব্যাক্ত করেন প্রকাশক।

বইমেলায় দিনব্যাপী স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আবৃত্তি, স্বরচিত কবিতা পাঠ, শিশুদের বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ছিল উল্লেখযোগ্য।

সূত্র: কালের কন্ঠ, কৃতজ্ঞতা জুযেল দাস।

শেয়ার করুন