যন্ত্রনির্ভর জীবনে সুখ ও অসুখ

জয়া ফারহানা

‘আশ্বিন মাস পড়িতে আর দুই-চার দিন বাকি আছে। ভোরের বেলায় অতি ঈষৎ মধুর নবীন শীতের বাতাস নিদ্রোক্ষিতের দেহে নতুন প্রাণ আনিয়া দিতেছে। সেই আবেশে তরুপল্লব শিহরিয়া উঠিতেছে’ [ঘাটের কথা : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]। আশ্বিন আসেনি তখনো। ভাদ্রের শেষেই শীতের বাতাস! না, আমাদের ভাগ্য অত দূর প্রসন্ন নয়। তার পরও আশ্বিন বললে অনেক ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। চুপচাপ সকালে সবুজ রঙের খড়খড়ির জানালা দিয়ে এক চিলতে মিঠে রোদ পিছলে পড়ছে লাল সিমেন্টের বারান্দায়। পূজারিরা শাল পাতায় মুড়ে পুজোর ফুল নিয়ে যাচ্ছেন। দরজার সামনে সুতলিতে বাঁধা দৈনিক খবরের কাগজ আর খেজুর পাতায় ডোবানো দুধের কলস আভাস দিত সকাল শুরুর। এখন আউটডোর ইউনিটে যে ক্যামেরা বসানো হয় তাতে ২৫ ফুট পর্যন্ত স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। আছে হুটার, ভিডিও ডোর ফোন, স্মোক অ্যালার্ম, সিসিটিভি। যন্ত্রের ওপর এই নির্ভরতা পারস্পরিক অবিশ্বাসের এক দুখী উদাহরণ। এখন কী বৈশাখ, কী আশ্বিন, সকাল শুরু যন্ত্রের যন্ত্রণা নিয়ে। সিনেমার পর্দায় দেখা প্রিয় তারকার মতো হওয়ার বাসনা থেকে হোক আর জিরো ফিগারের মোহের কারণেই হোক জিমে যেতে অনিচ্ছুক মনকে শেষ পর্যন্ত সেখানে যেতেই হয়। মানসিক প্রশান্তির জন্য শেষমেশ নির্ভর করতে হচ্ছে যন্ত্রের ওপরে। সকাল সাড়ে ৫টায় ঘুম জড়ানো চোখে জিমের ব্যাগ টানতে টানতে ট্রেডমিলে ওঠার মাধ্যমে যে অপ্রসন্ন সকালের শুরু, মাঝরাতে সোশ্যাল সাইটে রিচেকিংয়ের মাধ্যমে তার শেষ। কবি লিখেছেন, ‘আর দিও না যন্ত্রণা, মানুষ আমি, যন্ত্র না।’ কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সারা দিন ‘কুল’ থাকতে গিয়ে কুলের যা রসদ আমরা জোগাড় করছি তার সবই যন্ত্র। মানুষের সঙ্গে মানুষের ইগো ক্ল্যাশ আছে, যন্ত্রের সঙ্গে নেই। মানুষ কি তবে মানুষের চেয়ে যন্ত্রকে বেশি ভালোবাসতে শুরু করল? হতেও পারে।

স্কুল প্রজেক্টের জন্য কেনা ল্যাপটপ এখন রূপান্তরিত হয়েছে গেম স্টেশনে। আর এর সঙ্গে চ্যাট সিনেমা টুইটার তো আছেই। ইউরোপের গবেষকদল তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, ওয়াই-ফাই সংযোগ নিরবচ্ছিন্ন না থাকাটাই নাকি এই মুহূর্তে পারিবারিক সংঘাতের ট্রিগার পয়েন্ট। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সংযোগহীনতা নয়, ওয়াই-ফাইয়ের ডিসকানেক্টিভিটিই পারিবারিক সংঘাতের প্রধান কারণ! বাংলাদেশেও কি ইন্টারনেটের প্রতি অন্ধ আনুগত্য তৈরি হয়নি? ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, হাজারটা গেমিং এবং ডেটিং সাইট। মনস্তাত্ত্বিকরা বলছেন, কোনো গেম লেভেলে জিতলে যে পরিমাণ অ্যাড্রিনালিন হ্রাস হয়, তা নাকি প্রায় হেরোইন অ্যাডিক্টের সিপ নেওয়ার সমান। একটি অ্যানড্রয়েড বা আইফোন ছাড়া জীবন অন্ধকার। সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইলে মেসেজ চেক করা থেকে শুরু করে রাতে শুতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত একে এক মুহূর্তের জন্য কাছ ছাড়া করে না কেউ। এমনি মহার্ঘ বস্তু এটি! শুধু তা-ই নয়, পেন্ডিং কলস আর মেসেজ চেক করার জন্য মন এতই উতলা হয়ে ওঠে যে কেউ কেউ ঘুম থেকে জেগেও এ কাজটি করেন। মোবাইল ফোন হারিয়ে যাওয়া বা মোবাইল ফোন থেকে দূরে থাকার ভয়ে ইংল্যান্ডের ৬৬ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত। চিকিৎসাশাস্ত্রের ভাষায় এ রোগের নাম নোমোফোবিয়া। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যন্ত্রের সান্নিধ্যে থাকা যায় অথচ গাছে ঘেরা পাতায় ছাওয়া ঘাসের ওপর ৩০ মিনিট হাঁটতে পারি না আমরা। পারলে বিএমআই ইনডেক্সের দিকে তাকিয়ে অবসাদগ্রস্ত হতে হতো না। যন্ত্রনির্ভর নাগরিকের কাছে হাঁটার চেয়ে অধিকতর সহজ বেরিয়াট্রিক সার্জারির অপারেশন টেবিলে শুয়ে পড়া। হাঁটার জন্য মাত্র ৩০ মিনিট বের করতে না পারার কারণে মস্তিষ্কের সক্রিয়তা কিভাবে কমে আসছে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। জেরিয়াট্রিক মেডিসিন কনসালট্যান্টরা বলছেন, যন্ত্র মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

আমরা সারা দিন যা শুনি বা দেখি তা মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তির কুঠুরিতে জমাও তো করা চাই। নইলে একটা সময়ের পর আর কিছুই মনে পড়বে না। সবে অফিস যাওয়ার জন্য বাস গাড়িতে উঠছেন হঠাৎ মনে পড়ে গেল জরুরি ফাইল ফেলে এসেছেন ব্রেকফার্স্ট টেবিলে। সন্ধ্যায় বাড়ির পথে পা বাড়িয়েছেন, সেলফোনে বসের বিরক্ত কণ্ঠস্বর। জলদি জরুরি রিপোর্টগুলো নিয়ে চেম্বারে যাওয়ার তাগিদ। এ ছাড়া চাবির রিং বা সেলফোন মিসপ্লেস করা, তাড়াহুড়ায় জরুরি কাজ ভুলে যাওয়া—এসব তো আছেই। তাই সারা দিন কাজের শেষে রাত জেগে সিনেমা, টেলিভিশন বা অনলাইন চ্যাটিং নয়। জার্মানির একটি গবেষণায় ১৮ থেকে ৩২ বছর বয়সী কয়েক হাজার তরুণকে জটিল অঙ্কের উত্তর বের করতে দেওয়া হয়েছিল। ফলাফলে দেখা গেছে, যারা ভোরে ঘুম থেকে ঊঠে, রাতে পর্যাপ্ত ঘুমায়, সারা দিনে বিশ্রাম নেয় এবং প্রকৃতিঘনিষ্ঠ জীবন যাপন করে, তারা অঙ্কের হিসাব মিলিয়ে দিয়েছেন। বাকিরা পারেননি। রাস্তাঘাটে বের হলে ছোট ছেলে-মেয়েদের চোখে হাই পাওয়ারের চশমা এখন আর আমাদের অবাক করে না। তবে নতুন যা তা হলো, অল্প বয়সীরা এখন কানেও কম শোনে। এর একমাত্র কারণ চারপাশের প্রবল শব্দদূষণ এবং প্রযুক্তির অতিমাত্রায় ব্যবহার। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের প্রায় ৬৫.৫ মিলিয়ন মানুষ কানে কম শোনে। অথচ কয়েক দশক আগেও বধিরতার মতো সমস্যাগুলো একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে দেখা যেত। যানবাহনের হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার, চারপাশে চলতে থাকা মেশিনারিজের আওয়াজ, লাউড মিউজিক এবং মোবাইলের অতিমাত্রায় ব্যবহার অল্প বয়সীদের হেয়ারিং এইড ব্যবহার করতে বাধ্য করছে। একুশ শতকের সকাল মাধুর্যবর্জিত। এখন কোনো রকমে পড়ি পড়ি করে সাড়ে ৯টার মধ্যে অফিসে প্রবেশ। তারপর কাজের পাহাড়-পর্বত ডিঙোতে না ডিঙোতে শুরু হয়ে গেল জরুরি মিটিং। সেটা শেষ না হতেই আগামীকালের প্রেজেন্টেশন শেষ করার তাড়া। দফায় দফায় মেইল চেক। ওয়েবসাইট নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি। এত কাছে আকাশ, তবু কত অচেনা আমাদের। কত দূরে সরে গেছে ঘাস নক্ষত্র প্রজাপতি ফড়িং।

দীর্ঘদিন পর্যন্ত করপোরেট জগতে মাল্টি টাস্কিং নিয়ে বেশ মাতামাতি ছিল। হালফিল বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বের করেছেন, মাল্টি টাস্কিং ব্রেইনের জন্য ক্ষতিকর। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখিয়েছেন, মানুষের মস্তিষ্ক একই সময়ে অনেক কাজ করলে কোনো কাজেই সঠিক মনোযোগ দেওয়া যায় না। কাজটিও ভালো হয় না। কিছুদিন আগে পর্যন্ত টেফলন আস্তরণযুক্ত ননস্টিক কুকওয়্যারের কত প্রচারণাই না শুনেছি। এর কারণে বাসনের গায়ে আঁচড় লাগে না। টেফলন থাকায় খাবার আটকে যায় না। তেলের সাশ্রয় হয়। ‘গ্লোবাল ওয়েট লস ইন্ডাস্ট্রির’ মূল্য এখন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার। এই সুযোগে এর বাণিজ্য ভালোই চলেছে। এখন শোনা যাচ্ছে এসব কুকওয়্যারের টেফলনই বরং শরীরের জন্য ক্ষতিকর। ই-ব্যাংকিংয়েরও ঢের বিজ্ঞাপন দেখি। ঠিক যে নেট ব্যাংকিং বেশ কিছু সুবিধা এনে দিয়েছে গ্রাহকদের। কিন্তু এর ঝুঁকিও কম নয়। ই-মেইলে ব্যাংকের ব্যালান্স, কার্ড নম্বর, পিন নম্বর, বাড়ির ঠিকানা বা ব্যক্তিগত তথ্য, পাসওয়ার্ড কপি পেস্ট করা হলে যেকোনো সময় বিপদ। সিকিউরিটি সিস্টেম কিছুদিন পর পর চেক না করলে ব্যাংকের ডিটেইলস চলে যেতে পারে বিপজ্জনক জোনে।

দুই

আগাথা ক্রিস্টির গল্পে আমরা পড়েছি আজ গৃহপরিচারিকা গ্ল্যাডিস বা ফ্লোরেন্সের সেদিন ডে-আউট ছিল। তাই অপরাধী নির্বিবাদে বাড়িতে ঢুকে যেতে পেরেছিল বা তাকে খুন করে ফেলা হলেও সারা দিন তার খোঁজ পড়েনি। আমাদের দেশে গ্ল্যাডিস বা ফ্লোরেন্স নেই। কিন্তু রহিমা বা আমিনারা তো ছিল। রান্নাঘরের হাজারটা গ্যাজেট রহিমা-আমিনাদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে চাইছে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, আগামী পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কৃত্রিম বুদ্ধির রোবট। ফ্রাংকেনস্টাইনের জনক মেরি শেলীর কথা মনে আছে তো? আমরা কেউই মেরি শেলীর পরিণতি চাই না।

তিন

সবুজ বনস্পতির নিবিড়তা, বাঁশপাতা পচা পাটের মিষ্টি গন্ধে ভরে ওঠা ডোবা ওলকচু মনসার ফাঁকে ফাঁকে আশশেওড়ার বেড়া কিংবা গরুর গাড়ির চাকায় বিক্ষত মাটির রাস্তা আমাদের হয়তো এ জীবনে দেখা হয়ে উঠবে না। জনস্ফীতির কারণে জায়গা কমছে। হাজার স্কয়ার ফিটের মধ্যেই তৈরি করে নিতে হচ্ছে এক চিলতে গ্রিন কোজি কর্নার। এই এক চিলতে সবুজ ফার্ন দিয়েই কি শুরু হতে পারে আমাদের গ্রিন রেভল্যুশন?

লেখক : কথাশিল্পী

শেয়ার করুন