বিশ্ব আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার চাই

আহমদ রফিক

বিষয়টির প্রাথমিক পর্বের সূচনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উপলক্ষে গণহত্যা ও ইহুদি হত্যার বিচারের ঘটনায়। অমানবিক যত রকম নৃশংসতা সম্ভব—যেমন চরম নির্যাতন, ব্যাপক নারী ধর্ষণ এবং জাতিগত ও গোষ্ঠীগত হত্যা—সবই করেছিল বিশেষভাবে হিটলার-মুসোলিনি-তোজোর মতো শাসক শ্রেণির নির্দেশে তাঁদের ঘাতক বাহিনী। প্রচার সর্বাধিক হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর।

শুধু রণাঙ্গনে সৈনিক হত্যা নয়, স্বদেশে ও অধিকৃত অঞ্চলে হত্যা, নাশকতা ও নারী ধর্ষণ নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হিটলারের যেমন ক্রোধ ছিল প্রথমত ইহুদি জাতিগোষ্ঠীর ওপর, তেমনি দ্বিতীয়ত রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর; বিশেষত কমিউনিস্ট নেতাকর্মীদের ওপর। তাঁর নীতি তাদের নির্বিচার হত্যা। শেষোক্ত ঘটনাটি রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘উইচহান্টিং’ নামে পরিচিত।

ইতিহাসের পরিহাস এবং অন্যতম শক্তিমান সাম্রাজ্যবাদী বিজয়ের কারণে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে গিয়ে গণহত্যার অংশ হিসেবে কমিউনিস্ট নিধনের বর্বরতা সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লিখিত হয়নি। যেমন জার্মানিতে, তেমনি ইতালিতে। এবং তার শুরু যুদ্ধ শুরুর অনেক আগে থেকেই। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিচারটি ছিল মূলত যুদ্ধাপরাধের, সেই সঙ্গে আনুষঙ্গিক গণহত্যার।

এ বিচারের পরিপ্রেক্ষিতে ইহুদি হত্যার প্রতিদান হিসেবে ইহুদি জাতির প্রাপ্তি ইসরায়েল রাষ্ট্র, মিত্রশক্তির সম্মিলিত সিদ্ধান্তে। কিন্তু রাজনৈতিক হত্যা আমলে আসেনি। তবে এই বিচার ও আদালত প্রতিষ্ঠার সুফল হলো ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার সুবিচারের সুযোগ। কিন্তু সে সুযোগ কি সর্বত্র বা সবার জন্য মিলেছে? জাতিসংঘ কি ততটা স্বাধীন হাত-পা খেলাতে পারে, কিংবা আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত তথা আইসিসি কি ততটা আদর্শনিষ্ঠ, নিয়মনিষ্ঠ? তারা তাদেরই নিয়ম-কানুনের কতটা ধারক-বাহক?

আফ্রিকা থেকে বলকান অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি চিলি, ইন্দোনেশিয়া, এমনকি ইরানে সংঘটিত গণহত্যাগুলোর মধ্যে কয়টির বিচার হয়েছে, ইতিহাস এ সম্পর্কে কী বলে তা আমাদের অজানা নয়। ইন্দোনেশিয়ায় কমিউনিস্ট হত্যার নামে গণহত্যার ব্যাপকতা এতটাই ছিল যে লাশের বাধায় নদীর জলস্রোত ব্যাহত হয়েছিল। তৎকালীন সংবাদপত্রে এমন তথ্য প্রকাশ পেয়েছিল। চিলির ঘটনাও ভিন্ন ছিল না।

আর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যা? ব্রিটিশ ও মার্কিন দৈনিক পত্রিকা ও সাময়িকীগুলোর খবরে ও হিসাবে এবং বিচারে পূর্ববঙ্গে অপারেশনরত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বাঙালি গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিল। এ বিষয়ে লেখার সংখ্যা খুব একটা কম নয়। তবু সে গণহত্যার বিচার হয়নি আন্তর্জাতিক আদালতে। বরং দেরিতে হলেও বাংলাদেশ পাকিস্তানি সেনা অপরাধীদের বিচার করতে না পারলেও তাদের বাঙালি মূল দোসর কিছুসংখ্যকের বিচার করেছে। তাতেই আপত্তি শোনা গেছে পাকিস্তানসহ একাধিক মহলে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে।

দুই.

বেশ কিছুকাল থেকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা, পরবর্তী সময়ে কথিত গণতন্ত্রী সু চি ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায়ও রাখাইন অঞ্চলে রোহিঙ্গা গণহত্যার বর্বরতা সংঘটিত হয়েছে একাধিক ধারায়, তার চরিত্রও ভিন্ন কিছু নয়; যদিও সেখানে কোনো প্রকার যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করেনি। সুস্পষ্ট বিচারে তা ছিল ধর্মীয় জাতিসত্তা হিসেবে রোহিঙ্গাদের তাদের স্বভূমি থেকে উচ্ছেদ করা। সেই উচ্ছেদ উদ্দেশ্য সফল করতে রোহিঙ্গা নির্মূল অভিযান শুরু করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, সঙ্গে ঘাতক-সন্ত্রাসী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ক্যাডার বাহিনী।

নরহত্যার এ বর্বরতা সংঘটিত হয়েছে দফায় দফায়। বেশ কয়েক বছর থেকে গণহত্যার সূচনায় যখন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে চট্টগ্রাম সীমান্তে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল, তখন বাংলাদেশ শরণার্থী বিষয়টিকে সমস্যা হিসেবে ততটা গুরুত্ব দেয়নি। সেসব শরণার্থী তাই তাদের স্বদেশে ফিরে যায়নি। ফেরত পাঠানোর ততটা তাগিদ দেওয়া হয়নি; যদিও কিছু সামাজিক জটিলতা শুরু হয়েছিল।

এরপর এবারকার গণহত্যার সংখ্যাধিক্য এবং সংঘটিত ঘটনার বর্বরতার মাত্রাধিক্য যেমন বাংলাদেশকে শঙ্কিত ও সচেতন করে তোলে, তেমনি ঘটনার বর্বরতা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, বিশেষ করে জাতিসংঘের। তদুপরি মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠী জাতিসংঘের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি এমনকি তাদের উপদ্রুত অঞ্চলে প্রবেশে অনুমতি না দেওয়ার প্রাথমিক আচরণ জাতিসংঘকে ক্ষুব্ধ করেছে। পরিস্থিতির জটিলতা ক্রমেই বেড়েছে।

জাতিসংঘ ক্রমে বাস্তব অবস্থার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে, ঘটনার চরিত্র অনুধাবন করেছে, শরণার্থীদের জবানবন্দি নিয়ে নিশ্চিত হয়েছে সংঘটিত অপরাধের গুরুত্ব সম্পর্কে, যা গণহত্যার তুল্যমূল্য। বাংলাদেশ সরকারও ঘটনাবলির গুরুত্ব ও তাৎপর্য আগের তুলনায় অধিক সচেতনতায় অনুধাবন করতে পেরেছে। তাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে যে মিয়ানমার শরণার্থীদের ফেরত নিতে মোটেই ইচ্ছুক নয়।

কথার চাতুর্যে ও ছলাকলায় সিদ্ধহস্ত মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও শাসক শ্রেণি প্রত্যাবাসনের বিষয়টিকে বিলম্বিত করে রাজনৈতিক হিমঘরে ফেলে রাখার কৌশল গ্রহণ করেছে। এখন এটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তারা প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে ইচ্ছা করেই পিছিয়ে রয়েছে; যাতে রোহিঙ্গারা প্রতিকূল পরিবেশে ফিরতে রাজি না হয়, জাতিসংঘও যাতে একই ধারায় পথ চলে।

মিয়ানমারের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী যে কতটা নির্মম-নিষ্ঠুর, কতটা অগণতন্ত্রী ও অমানবিক তার প্রমাণ সম্প্রতি রয়টার্সের দুই সাংবাদিকের সাত বছর কারাদণ্ড। অপরাধ? তাঁরা রাখাইন অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত সহিংসতার বিষয়টি নিয়ে বাস্তব সত্য জানতে চেষ্টা এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা করেছে। এই অপরাধে (?) পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে।

এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া ব্যাপক। শুধু রয়টার্স ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে তা-ই নয়; জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, হিউম্যান রাইটসের মতো আন্তর্জাতিক ও বহু সংখ্যক আঞ্চলিক সংগঠন এ রায়ের বিরুদ্ধে বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে। অনুরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ একাধিক রাষ্ট্র।

হতে পারে দুই সাংবাদিকের অন্যায় কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার কারণে হয়তো একসময় ওই সাংবাদিকদ্বয় মুক্তি পেয়েও যেতে পারেন। কিন্তু একটি বিষয় সহজ ও সরল যে মিয়ানমারের শাসকরা রাখাইন অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত বর্বর গণহত্যার সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করার সুযোগ দেবে না।

বাংলাদেশকে বুঝতে হবে যে মিয়ানমার পর্যাপ্ত চাপে না পড়া পর্যন্ত শরণার্থী রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরে আসতে দেবে না। এরই মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতার ফলাফল প্রায় শূন্য। জাতিসংঘ চেষ্টা সত্ত্বেও সফল হতে পারছে না। এ অবস্থায় একমাত্র ওষুধ আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার অভিযোগ উপস্থাপন এবং বিচারের জন্য নিয়মতান্ত্রিক চেষ্টা চালানো।

কিন্তু বিষয়টি যত সহজে বলা গেল, তত সহজ নয়। এসব বিচারের প্রক্রিয়ায় রয়েছে যথেষ্ট নিয়মতান্ত্রিক জটিলতা, সেসব পার হয়ে বিচার শুরু করা একটি দীর্ঘস্থায়ী বিষয়। অবশ্য সংবাদপত্রগুলোতে নিজস্ব প্রতিবেদনে বা একাধিক আইনজ্ঞ বা বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষকের যেসব মতামত প্রকাশিত হচ্ছে তার ঘোরপ্যাঁচে না গিয়ে আমাদের সহজ-সরল বক্তব্য—সম্ভাব্য সব পথেই যেকোনো সংশ্লিষ্ট সংস্থায় বা আদালতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মিয়ানমারকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা বাংলাদেশকে চালাতেই হবে।

এটা একটা শ্রমসাপেক্ষ, জটিল, নিরন্তর প্রক্রিয়া—তবু এ ক্ষেত্রে অবহেলার বা প্রয়োজনমাফিক সাড়া দেওয়ার দীর্ঘসূত্রতার কোনো অবকাশ নেই। পররাষ্ট্র ও আইন বিভাগের জন্য প্রয়োজন হবে সার্বক্ষণিক সচেতনতার। এ বিষয়ে পরিবেশ বাংলাদেশের জন্য কিছুটা হলেও অনুকূল। সে সুযোগ হারানো যাবে না।

কারণ আমরা জানি, অতীত অভিজ্ঞতা বলে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান ব্যাহত হওয়ার খুবই সম্ভাবনা। চীন এ ক্ষেত্রে বিরোধিতা করতে পারে তার ভেটোদানের ক্ষমতা প্রয়োগ করে। সে ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান অমীমাংসিত থেকে যাবে। তাই বিচারের পথে, আদালতে যাওয়ার পথ ধরেই চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে। কূটনৈতিক তৎপরতা হতে হবে সর্বমাত্রিক। এতে বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার প্রয়োজন রয়েছে যথেষ্ট মাত্রায়।

একটি বিষয় বাংলাদেশকে মনে রাখতে হবে যে মিয়ানমারের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী শুধু যে উগ্র জাতীয়তাবাদী চরিত্রের, যা ফ্যাসিবাদের তুল্য তা-ই নয়, তাদের মিথ্যাচার, তথ্য বিকৃতি, ছলনা-প্রতারণা তুলনারহিত। তাদের কথায় ও কাজে আকাশ-পাতাল প্রভেদ। তাদের সঙ্গে আচরণে বাংলাদেশকে সতর্ক পদক্ষেপে চলতে হবে, মৌখিক, এমনকি লিখিত প্রতিশ্রুতির ওপরও শতভাগ নির্ভর না করে, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি কাজে পরিণত না হয়।

গত বছরের তুলনায় এ বছর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে বাংলাদেশ কিছুটা ভালো অবস্থানে আছে। জাতিসংঘের অনুসন্ধানী দল নিশ্চিত হয়েছে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়টি নিয়ে। তারা এ ব্যাপারে কিছুটা তৎপরতা চালানোর উদ্যোগ নিয়েছে, যদিও তা সময়সাপেক্ষ। তারা গণহত্যার বিচার অনুষ্ঠানেও আগ্রহী। তাই বলে বাংলাদেশের আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই।

আর সে জন্যই বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হবে। শুধু তা-ই নয়, এ ক্ষেত্রে চীনা-বিরোধিতার মুখে (মিত্র দেশ ভারতও এ ব্যাপারে সমর্থক মিত্র নয়) ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে তাদের সমর্থন আদায়ের জন্য। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই পারবে মিয়ানমারকে কোণঠাসা করতে সামরিক ও বাণিজ্যিক অবরোধের হুমকির মাধ্যমে। যে কায়দায় তারা সু চিকে ক্ষমতায় বসিয়েছে, একই ধারায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা রাখাইনের সামাজিক-রাষ্ট্রনৈতিক পরিস্থিতি, যা প্রত্যাবাসনের অনুকূল না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা নতুন করে বৈনাশিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে চাইবে না। আর তাদের জোর করে মৃত্যু ও নির্যাতনের মুখে ঠেলে দেওয়াও যাবে না। এ বিষয়ে মিয়ানমার এখনো অনড় অবস্থানে। এই স্পর্শকাতর দিকগুলোও জাতিসংঘ ও পরাশক্তির সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্বের সঙ্গে সামনে আনতে হবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে বাংলাদেশ বাস্তবিকই এখনো উভয়-সংকটে। কবে যে এ সংকট ও সমস্যার সমাধান হবে বলা কঠিন।

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

উৎস: কালের কণ্ঠ

শেয়ার করুন