প্রকৃতি যেখানে রূপ বদলায় ক্ষণে ক্ষণে

ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া

এদেশের প্রতিটি অঞ্চলের কিছু না কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা যুগে যুগে বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকের সাহিত্যে উপজীব্য হয়ে উঠেছে। তবে শুধু কবি-সাহিত্যিকই নয়, এ দেশের রূপ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বারে বারে মুগ্ধ করেছে হাজারো পর্যটককে। এ দেশের অনেক অঞ্চলে এমনও দুর্গম স্থান রয়েছে যেখানে মানুষের পদচারণা খুব বেশিদিনের নয়। ঠিক এমনই এক পর্যটনের অপার সম্ভাবনার নাম বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল, যা পার্বত্য চট্টগ্রাম নামে অধিক পরিচিত।

পার্বত্য চট্টগ্রাম মূলত তিনটি জেলা নিয়ে গঠিত। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি এলাকা, যা তিনটি জেলা—রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, ও বান্দরবান নিয়ে গঠিত। চট্টগ্রাম বিভাগের এই এলাকা পাহাড় ও উপত্যকায় পূর্ণ বলে এর নামকরণ হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। দেশের একটা বিশাল অংশের বনভূমি এই অঞ্চল জুড়ে আছে। পর্যটনের একটি প্রধান উপজীব্য হলো এই পাহাড়, যা যুগে যুগে মানুষকে আকর্ষণ করে গেছে। এটি যেন ক্ষণে ক্ষণে প্রকৃতির রূপ বদলানোর খেলা। এখানে শীতে যেমন এক রূপে ধরা দেয় ভ্রমণ-পিপাসুদের কাছে, ঠিক তেমনি বর্ষায় অন্য এক রূপ হাজির হয়। শীতে পাহাড়, কুয়াশা আর মেঘের চাদরে যেমন ঢাকা থাকে, তার সঙ্গে থাকে সোনালি রোদের মিষ্টি আভা। আবার বর্ষায় চারদিক জেগে উঠে সবুজের সমারোহ। এই সময় প্রকৃতি ফিরে পায় তার নতুন যৌবন। বর্ষায় মূলত অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিস্টদের পদচারণা সবচেয়ে বেশি থাকে এই পার্বত্য অঞ্চলে। তখন এখানে ঝর্ণা, ঝিরি কিংবা নদীপথগুলো নতুনরূপে সেজে ওঠে।

দেশের প্রায় গুরুত্বপূর্ণ এক-দশমাংশ ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত পার্বত্য তিন জেলা। পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, ঝর্ণা ও গাছপালা বেষ্টিত মনোরম দৃশ্যের এ ভূমিতে রয়েছে বাঙালি ও ১৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত। এই তিন জেলার প্রতিটিতে কিছু না কিছু প্রাকৃতিক সম্পদ ছড়িয়ে আছে।

বাংলাদেশের তিনটি পার্বত্য জেলার মধ্যে একটি হলো বান্দরবান। এটি বাংলাদেশের পাহাড়ি-কন্যা নামে খ্যাত। ভৌগোলিক কারণেই বান্দরবানে অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। পাহাড়, নদী ও ঝর্ণার মিলনে অপরূপ সুন্দর বান্দরবান জেলা। বান্দরবান জেলার আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রের মধ্যে বগা লেক, কেওকারাডং, মেঘলা, নীলগিরি, নীলাচল, নাফাকুম, স্বর্ণমন্দিরসহ আরো অনেক পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। বান্দরবান জেলা সদর থেকে ৪৭ কি.মি. দক্ষিণ-পূর্বদিকে লামা উপজেলার অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২২০০ ফুট উপরে বাংলাদেশের নতুন পর্যটন কেন্দ্র নীলগিরির অবস্থান। জায়গাটিকে অনেকে ‘বাংলাদেশের দার্জিলিং’ বলেন, যেখানে পাহাড় আর মেঘের মিতালি চলে দিনরাত। সুপরিকল্পিতভাবে এই পর্যটন কেন্দ্রটি গড়ে উঠেছে। বর্তমানে বান্দরবানের স্বর্ণমন্দির উপাসনালয়টি বাংলাদেশের একটি অন্যতম পর্যটন স্পট হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। বাংলাদেশের সর্ববৃহত্ ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম এই ‘বৌদ্ধ ধাতু জাদী’ স্বর্ণমন্দির নামে পরিচিত। এটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উল্লেখযোগ্য একটি উপাসনালয়, যা বান্দরবান শহর থেকে ৪ কি.মি. উত্তরে বালাঘাট নামক এলাকায় পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। এর নির্মাণশৈলী মিয়ানমার, চীন ও থাইল্যান্ডের বৌদ্ধ মন্দিরের আদলে তৈরি। বান্দরবান জেলা শহরে প্রবেশের ৭ কি.মি. আগে মেঘলা পর্যটন এলাকা। এটি সুন্দর কিছু উঁচু-নিচু পাহাড়বেষ্টিত একটি লেক ঘিরে গড়ে উঠেছে। সবুজ গাছ আর লেকের স্বচ্ছ পানি পর্যটককে প্রকৃতির কাছাকাছি টেনে নেয় প্রতিনিয়ত। পানিতে যেমন রয়েছে প্যাডেল বোট, তেমনি ডাঙায় রয়েছে মিনি চিড়িয়াখানা। রয়েছে রোপওয়ে কার। এখানে সবুজ প্রকৃতি, লেকের স্বচ্ছ পানি আর পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দেখতে পাবেন বান্দরবানের নয়নাভিরাম দৃশ্য। তাছাড়া নীলাচল বান্দরবান শহর হতে ১০ কি.মি. দক্ষিণে ১৭০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত একটি পর্বত শীর্ষ। যেখান থেকে নীল আকাশ যেন তার নীল আঁচল বিছিয়ে দিয়েছ ভূমির সবুজ জমিনে। যেদিকে দু’চোখ যায় অবারিত সবুজ ও নীল আকাশের হাতছানি। মুগ্ধতায় ভরে উঠবে মন-প্রাণ।

এছাড়া বান্দরবানের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে বগা লেক পরিচিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় তিন হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বগা লেক। কেওকারাডাং-এর কোল ঘেঁষে বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে এবং রুমা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। পাহাড়ের উপরে প্রায় ১৫ একর জায়গা জুড়ে বগা লেক। এ পানি দেখতে প্রায় নীল রঙের। এ লেকের পাশে বাস করে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র উপজাতীয় বম ও খুমী সমপ্রদায়। অদ্ভুত সুন্দর এই নীল রঙের লেকের সঠিক গভীরতা বের করা যায়নি এখনও পর্যন্ত। স্থানীয়ভাবে দু’শ’ থেকে আড়াইশ’ ফুট বলা হলেও সোনার মেশিনে ১৫১ ফুট পর্যন্ত গভীরতা পাওয়া গেছে। এটি সম্পূর্ণ আবদ্ধ একটি লেক। এর আশেপাশে পানির কোনো উত্সও নেই। তবে বগা লেক যে উচ্চতায় অবস্থিত তা থেকে ১৫৩ মিটার নিচে একটি ছোট ঝর্ণার উত্স আছে যা বগাছড়া (জ্বালা-মুখ) নামে পরিচিত। আগামী পর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাকি দুটি জেলা রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা করা যাবে।

লেখক : চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি

ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন