দেশীয় টিভি চ্যানেল কেন দর্শক হারাচ্ছে?

রেজাউল করিম খোকন

টেলিভিশন এখন প্রাত্যহিক জীবনের একটি আবশ্যকীয় বিনোদনের অংশ হয়ে উঠেছে। কেবল বিনোদন নয়, সংবাদ ও টকশোর জন্যও টেলিভিশন এখন জনপ্রিয়। সংবাদের জন্য দেশীয় চ্যানেল তুলনামূলকভাবে জনপ্রিয় হলেও বিনোদনের জন্য আমাদের দর্শকদের বড় একটি অংশ বিদেশি চ্যানেলকেই বেছে নিচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে, দেশে টিভি চ্যানেলের সংখ্যা অনেক বাড়লেও দর্শকদের মন ভরাতে ব্যর্থ হচ্ছে বেশিরভাগ টিভি চ্যানেল। অনেক নতুন নতুন টিভি চ্যানেল চালু হলেও দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারছে না দুর্বল এবং অনুন্নত মানের অনুষ্ঠানের কারণে। এমন অনেক দর্শক রয়েছেন যারা বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলের মাত্র কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলো একেবারেই দেখেন না। এসব চ্যানেলের প্রতি তাদের তেমন আকর্ষণ নেই। অথচ চ্যানেলগুলো নিয়মিতই ধারাবাহিক নাটক, টক শো, সংগীতানুষ্ঠান এবং ঘণ্টায় ঘণ্টায় সংবাদ প্রচার করে যাচ্ছে।

দর্শকদের চাহিদা ও পছন্দের কথা বিবেচনায় না এনে টিভি চ্যানেলগুলো অনুষ্ঠান নির্মাণ করছে দায়সারাভাবে, কোনোভাবে জোড়াতালি দিয়ে, যা দর্শকদের বিরক্তি উত্পাদন করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দর্শক সেইসব টিভি চ্যানেল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, অধিকতর উপভোগ্য আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান দেখার জন্য রিমোটের বোতাম টিপছেন।

ক্যাবল টিভি বিস্তার গ্রামের মানুষকেও এখন অবাধে দেশি-বিদেশি অগণিত চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। এখন হাতে ধরা রিমোটের বোতাম টিপে ইচ্ছেমতো স্টার জলসা, জি বাংলা, স্টার প্লাস, সনি, কালারস, জি টিভি প্রভৃতি চ্যানেলের বাংলা-হিন্দি সিরিয়াল, সিনেমা, গেম-শো, রিয়েলিটি শো, নাচ-গান কৌতুকের অনুষ্ঠান হরদম দেখছেন তারা। এক সময় তাদের শুধুমাত্র বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখে সন্তুষ্ট থাকতে হতো। ক্যাবল টিভির দ্রুত বিস্তার আমাদের ঘরোয়া বিনোদনে দারুণ বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে।

শুরুতে যখন মাত্র কয়েকটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করে, তখন দর্শক অনেক আশাবাদী হয়ে তা দেখতে শুরু করেছিল। সবার প্রত্যাশা ছিল, প্রতিটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল তাদের নিজ নিজ স্লোগানে প্রদত্ত অঙ্গীকার পূরণের মাধ্যমে যথার্থই দর্শকপ্রিয় হয়ে উঠবে। দিনে দিনে তাদের দিগন্ত প্রসারিত হবে। দেশের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে খ্যাতি, পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়বে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, জীবনধারা, ইতিহাস, সাহিত্য, সংগীত, চিন্তা-ভাবনা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে।

কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেল দেশের ভেতরেই দর্শকদের মনে ঠাঁই করে নিতে অনেকাংশে ব্যর্থ হয়েছে।

আমাদের দেশীয় টিভি চ্যানেলগুলোর অতি বাণিজ্যিক মনোভাবও তাদের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনছে। ভিনদেশি টিভি চ্যানেলের পক্ষপাতি আমরা কেউই নই। তবে দেশি চ্যানেলগুলোর শোচনীয় ব্যর্থতা আমাদের দর্শকদের মনোযোগ, আগ্রহ কৌতূহলকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করছে। মাত্র কয়েকটি বিদেশি টিভি চ্যানেলের কাছে আমাদের প্রায় দুই ডজন চ্যানেলের পরাজয় দুঃখজনক।

এজন্য দেশীয় টিভি চ্যানেলকে অতি বাণিজ্যিক মানসিকতা ত্যাগ করে সময়োপযোগী বিনোদন-সম্ভার নিয়ে দর্শকের কাছে নিজেদের আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরতে হবে। তা না হলে আমাদের সিনেমা শিল্পের মতো চরম বিপর্যয় নেমে আসবে টিভি অঙ্গনেও। একসময়ে অধিকাংশ টিভি চ্যানেল পরিত্যক্ত হিসেবে বিবেচিত হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

লেখক: ব্যাংকার

শেয়ার করুন