জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে কিছুদিন

বঙ্গবীর জেনারেল এম এ জি ওসমানী

শাহনূর চৌধুরী :: বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী ছিলেন একজন নিখাদ দেশপ্রেমিক। আমাদের প্রিয় জন্মভূমির স্বাধীনতা যুদ্ধ আর পুনর্গঠনেরও অন্যতম এক নায়ক তিনি। আমার সৌভাগ্য মহান এই মানুষটির সান্নিধ্য লাভ করেছিলাম। কাছে থেকে দেখেছি তাঁর জীবনবোধ আর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন অভিব্যক্তি।  ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি জেনারেল ওসমানীর এপিএস (অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রাইভেট সেক্রেটারি) হিসেবে যোগদান করি। মার্চ মাসের প্রথম দিকেই সরকারি গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে আমার নিয়োগ কার্যকর হয়।

আমি তখন সাব ইন্সপেক্টর অব এক্সাইজের কাজে নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলাম রাজশাহীর নওগাঁ মহকুমায়।  সেই কাজে ইস্তফা দিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই জয়েন করি জেনারেল ওসমানী সাহেবের মন্ত্রণালয়ে। জেনারেল ওসমানী সাহেব তখন দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। ১. শিপিং, অ্যাভিয়েশন এন্ড আইডব্লিউ টিএ (ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট অথোরিটি) ২. পোস্ট টেলিফোন এন্ড টেলিগ্রাফ। অবশ্য এই দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেবার আগেই তিনি সেনাপ্রধানের দায়িত্ব থেকে অবসর নেন।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সনের স্বাধীনতা যুদ্ধ তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে নিপুণভাবে পরিচালনা করেন। প্রয়াত সিএসপি লোকমান আহমদ ছিলেন পোস্টাল ডিপার্টমেন্টের সেক্রেটারি এবং প্রয়াত সিএসপি সুলতানুজ্জামান খান ছিলেন শিপিং অ্যান্ড অ্যাভিয়েশনের সেক্রেটারি। মোফাজ্জল করিম ছিলেন অ্যাভিয়েশনের ডেপুটিসেক্রেটারি। ইফতেখার আহমদ চৌধুরী ছিলেন মন্ত্রী মহোদয়ের প্রাইভেট সেক্রেটারি। পরবর্তী সময়ে তিনি কেয়ারটেকার সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। সাইদুর রহমান ছিলেন পাবলিক রিলেশন অফিসার এবং আব্দুস সাত্তার ছিলেন পিএ (পারসোন্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট)।

জেনারেল ওসমানী সাহেব ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন এবং বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ ও গোলাপগঞ্জ-ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে এমএনএ (মেম্বার অব দি ন্যাশনাল এসেম্বলি) নির্বাচিত হন। তখন তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনেক তুখোড় নেতা ছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন গহরপুরের মৌলানা নুর উদ্দীন সাহেব। সত্তরের নির্বাচনী প্রচারে আমার এলাকাতে (দেওয়ানবাজার ইউনিয়ন) আওয়ামী লীগের অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল ছিল। যতদূর মনে পড়ে আমার এলাকার – অধ্যাপক শফিক (রতনপুর), প্রয়াত চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান (আনরপুর), প্রয়াত মখলিছুর রহমান (সিরাজপুর), প্রয়াত মাহমুদ আলী (শিওরখাল), প্রয়াত রানু বাবু (খান্দি গাঁও), কাজল লস্কর (খান্দি গাঁও), মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মুকিত চৌধুরী (আনরপুর), মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত আখতার আহমদ (জামালপুর), মুক্তিযোদ্ধা মনির উদ্দিন (জামালপুর), মুক্তিযোদ্ধা মজির উদ্দিন (জামালপুর), মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান (জামালপুর), মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার ফখরুদ্দিন (তালতলা), প্রয়াত অ্যাডভোকেট খন্দকার মবশ্বির আলী (বশিরপুর), ইয়াওর খান (খালপার), আব্দুস শহিদ চৌধুরী (সুলতানপুর), হেড মাস্টার আব্দুর রহমান (আলাপুর), প্রয়াত সুরুজ আলী সরদার (হায়দরপুর), আমরু মিয়া (খাঁ পুর), মনা মাজন (আলাপুর), ইসকন্দর আলী (সুলতানপুর) সহ কিছু তরুণ যুবক আওয়ামী লীগের স্বপক্ষে কাজ করেন। আরও কয়েকজন সাহসী তরুণ ছিলেন যাঁদের নাম এই মুহূর্তে মনে আসছে না। নামগুলো উল্লেখ করতে না পারায় আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।

জেনারেল মুহম্মদ আতাউল গনি ওসমানী ১৯১৮ সনের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীনপূর্ব বাংলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতৃভূমি বর্তমান সিলেট জেলার ওসমানীনগর থানার দয়ামীর গ্রাম। তিনি ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪ সালে লন্ডনে পরলোক গমন করেন। তার মরদেহ তাঁরই শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর মায়ের কবরের পাশে হযরত শাহ জালাল (রহ.) মাজারের পাশে সমাহিত করা হয়। তিনি অত্যন্ত সৎ এবং নিষ্ঠাবান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি আঞ্চলিকতা এবং স্বজনপ্রীতিকে নিন্দা করতেন এবং নিজেকে দুর্নীতির ঊর্ধ্বে রাখতেন। তাঁর নির্বাচনী এলাকায় যে কয়েকটি কাজ তিনি সম্পন্ন করেছিলেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আমার জন্মস্থান গহরপুরকে বিদ্যুতায়ন এবং পাবলিক কল অফিস (পিসিও), সিলেট বালাগঞ্জ রোড ভায়া তাজপুর। অসমাপ্ত কাজের মধ্যে সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (যা পরে সিলেট ওসমানী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট), সিলেট বালাগঞ্জ রোড ভায়া সুলতানপুর সড়ক।

ওসমানী সাহেব নির্লোভ এক জন ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর দরজা সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল। একবার যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য ঢাকা সিলেট ফ্লাইট বাতিল হয়ে গিয়েছিল। অন্তত ১৫/১৬ জন যাত্রী তাঁর মিন্টু রোডের বাসায় এসে উপস্থিত হন। তিনি বলেন তাদের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। এদের তিনজনের নাম আমার মনে আছে বালাগঞ্জের আলকাছ মিয়া, জগন্নাথপুরের সাত্তার আর সিলেটের ছাত্র নেতা তোফা। কি আর করা। তাঁর নির্দেশে আমাদের সিলেটের এক ভদ্রলোক, নাম শামসুদ্দিন (বাড়ী শেরপুর)। কাকরাইলে তার আশা নামে একটি হোটেল ছিল । আমি শামসুদ্দিনকে বলে ৩/৪টা রুমের ব্যবস্থা করে ছিলাম। তাঁর বসার ঘরে কার্পেটের মধ্যে ৩/৪ জনকে রাত কাটাতে হয়েছিল। পরের দিন সকালে বিমানের চেয়ারম্যন এ কে খোন্দকারকে (পরবর্তীতে এয়ারভাইস মার্শাল ও আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রী) অনুরোধ করে সিলেটে বিশেষ ফ্লাইট-এর ব্যবস্থা করে সবাইকে সিলেটে পাঠানো হয়। খাবার ব্যবস্থা তাঁর বাসায় করতে হয়েছিল।

মুক্তিযোদ্ধা যাঁরা আহত তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা বা কোনো কাজে ঢাকা এসেছেন এদের অনেকেই অনেক সময় তাঁর বাসায় অবস্থান করতেন। অনেককে নিজের পকেট থেকে ভাড়ার টাকা দিতেন। অনেকের চিকিৎসার দায়িত্ব তিনি নিয়েছিলেন। অনেকেই জানেন তিনি বাকশাল গঠনের বিরোধিতা করে মন্ত্রিত্ব এবং সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। পদত্যাগ করে পুরাতন সংসদ ভবন থেকে রিকশা যোগে মিন্টো রোডের বাসায় এসেছিলেন। তিনি সংসদ থেকে বেরিয়ে মন্ত্রীর গাড়িতে চড়েননি। ঐদিনই তার চাচাত ভাই মুফলেহ ওসমানীর ইস্কাটনের বাসায় গিয়ে উঠেন এবং মিন্টো রোডের মন্ত্রীর বাড়ি ছেড়ে দেন। তিনি ইচ্ছা করলে নিয়ম অনুযায়ী কিছু দিন থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নাই।

আরেকটি মজার ঘটনা। মন্ত্রীদের একটা ফান্ড থাকে। ওই ফান্ড থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন চ্যারিটিতে বা কোনো গরিবকে বা কোনো স্কুল কলেজে তাৎক্ষণিক অর্থমন্ত্রণালয়ের কোনো অনুমোদন ছাড়া সাহায্য করতে পারেন। ঢাকার এক লাইব্রেরির জন্য কিছু বই কেনার সাহায্য চেয়ে এক ভদ্রলোক আমার কাছে আসেন। তিনি পাঁচ হাজার টাকা চেয়েছিলেন, আমি দুই হাজার টাকা রিকোমেন্ড করেছিলাম। সাধারণত টাকা দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এই দরখাস্তে ওসমানী সাহেব সই না করে আমার অজান্তে পিআরও সাইদুর রহমান সাহেবকে দিয়ে সত্যতা যাচাই করেন। দেখা গেল ওই লাইব্রেরির আদৌ কোন অস্তিত্ব নেই। পরে আমাকে ডেকে বললেন রিকোমেন্ড করার পূর্বে যেন আমি সতর্ক হই। ওসমানী সাহেব তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন একজন লোক ছিলেন। আমি চিন্তাও করিনি এই দরখাস্ত মিথ্যে হতে পারে। অথচ তিনি বুঝতে পেরে তদন্ত করিয়েছিলেন।

তিনি দুই বার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেছিলেন। একবার জিয়াউর রহমান, আরেকবার বিচারপতি সাত্তার এর প্রতিপক্ষ হিসেবে। আওয়ামী লীগ তাঁকে সমর্থন দিয়েছিল। মন্ত্রিপরিষদ থেকে বেরিয়ে কিছুদিন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে শুরু করেন। অবশ্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখা অনেক আগে থেকেই শুরু করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত পান্ডুলিপিটি আজও পাওয়া গেল না। আমি ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৭ বা ৮ তারিখ ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তাঁকে দেখে আসি। আমি সামান্য আঙ্গুর তাঁর জন্য নিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকেই খাইয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ফ্রিজ খুলে দেখালেন অনেক ফল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।  তার খাবার রুচি কম। আমি যেদিন সিএমএইচএ তাঁকে দেখতে যাই ওইদিন সকালে প্রেসিডেন্ট এরশাদও তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন লন্ডনে উন্নত চিকিৎসার জন্য আসতে পারেন। লন্ডন আসার পর তার কাজিন শাহি ভাই এর বাসায় আমি দুইবার তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। তাঁর মৃত্যুর পর তার মরদেহ ইস্ট লন্ডন মসজিদে দেখতে গিয়েছিলাম। ওসমানী সাহেব প্রত্যেকদিন সেভ করতেন। তার মরদেহের মুখ দেখে মনে হল গতকাল তিনি শেভ করেননি।

ওসমানী সাহেব সময় নষ্ট করতেন না। সময়ের ব্যবহার যথাযথভাবে করতেন। তিনি সকালে ভোরে ঘুম থেকে উঠতেন। তখন অফিস সময় ছিল সকাল ৮টা থেকে বিকাল ২টা পর্যন্ত। সকালে বাথরুমে যাওয়ার সময় ফোন আর পত্রিকা সাথে নিয়ে ঢুকতেন। ফোনের তার অনেক লম্বা ছিল যাতে অফিস রুম থেকে সহজে বাথরুমে নিয়ে ব্যবহার করা যায়। বাথরুম থেকেই জরুরি ২/১টা ফোন করে নিতেন। পত্রিকার শিরোনাম গুলো দেখে নিতেন। আমি তার বাসাতেই থাকতাম। বেশির ভাগ সময় একসঙ্গে অফিসে যেতাম। গাড়িতে বসেই তিনি ফাইলে মনযোগ দিতেন। সব সময় ৪/৫টা ফাইল সঙ্গে থাকত। গাড়িতে বসে রাস্তার দিকে কমই তাকাতেন। ফাইল দেখতে দেখতে সচিবালয় পৌঁছে যেতেন। দেশ প্রেমিক সাধারণ মানুষের বন্ধু সৎ নিষ্ঠাবান স্বল্পভাসী, সদালাপী জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন জেনারেল ওসমানী।

তিনি আমাকে বলেছেন, যে বছর তিনি কমিশন লাভ করেন ঐ বৎসরেই তিনি আইসিএস এ অংশগ্রহণ করে সফল হন। কিন্তু আইসিএস এর তুলনায় ব্রিটিশ আর্মির সেকেন্ড লেফটেন্যান্টের বেতন একটু বেশি ছিল এবং মর্যাদাপূর্ণ ছিল। তাই তিনি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেননি। অবশ্য সেনাবাহিনীতে কাজ করার ইচ্ছেটাই বেশি ছিল তাঁর। বাংলাদেশের সৌভাগ্য তিনি আর্মিতে যোগদান করেছিলেন। নইলে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সিপাহসালার কে হত? সকল রাজনীতিবিদ, মুক্তিযোদ্ধা, কলমযোদ্ধা, সংস্কৃতিকমী, সাংবাদিক, সকলের প্রতি সম্মান রেখে বলছি। জেনারেল ওসমানী না থাকলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া কঠিন হত। যাঁরা আজ ওসমানী সাহেবকে অপছন্দ করেন তাঁদের বলছি, আপনারা নিরপেক্ষভাবে সব কিছু বিবেচনা করুন। দেশ স্বাধীনের পরেই যখন বঙ্গন্ধু সহ বিশ্বের অন্যান্য বন্ধু দেশের নেতৃবৃন্দ যুদ্ধ বিধ্বস্ত হবার কারণে পুনর্বাসন এবং দেশ গড়ার কাজে ব্যস্ত তখনই দেখা দেয় প্রাকৃতিক দূর্যোগ। ১৯৭৩ সালে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বন্যা হলে দেশে খাদ্যের ঘাটতি হয়। বন্ধু দেশ থেকে সাহায্য এলে তা রিলিফের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। বৃহত্তর সিলেটের যে সব এলাকায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় সে সব এলাকায় জেনারেল ওসমানী নিজ হাতে রিলিফ বণ্টনে উপস্থিত হন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য রাজনগর। রাজনগরের তৎকালীন এমপি ছিলেন তৈয়বুর রহিম। রিলিফ বিতরণের জন্য রাশিয়া আমাদেরকে পাইলটসহ হেলিকপ্টার দিয়ে সাহায্য করে। ওসমানী সাহেব ও আমি হেলিকপ্টারে করে ৩০০ লুঙ্গি ও শাড়ি নিয়ে রাজনগরে গেলে এমপি তৈয়বুর রহিম আমাদেরকে আশ্বস্ত করলে উনাকে বিতরণের দায়িত্ব দিয়ে ফিরে আসি। সপ্তাহ খানেক পর মৌলভীবাজারের স্থানীয় পত্রিকায় এই মর্মে ছাপা হয় যে আমরা রিলিফ বিতরণ করিনি। এরপর এমপি সাহেবকে জানানোর জন্য আমাকে দায়িত্ব দিলে আমি নিজে গিয়ে এমপি সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সহিত দুঃখ প্রকাশ করেন এবং অনতিবিলম্বে তা গরিবদের মধ্যে বিতরণ করেন।

এখানে উল্লেখ না করলে আমার কৃপণতা ধরা পড়বে, এমপি তৈয়বুর রহিম অত্যন্ত সৎ একজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মূলত স্বপরিবারে যুক্তরাজ্যে বসবাস করতেন এবং দেশের প্রতি তার মমত্ববোধ তাকে দেশের সেবায় টেনে নিয়ে যায়। এই অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তাদেরকে তিনি আইনের আওতায় নিয়ে এসেছিলেন। এবং এই খবর ওসমানী সাহেবের কানে পৌঁছলে তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। আমি ইফতেখার চৌধুরীর অনুপস্থিতিতে পিএস হিসেবে সই করতাম কিন্তু লিখতাম এপিএস। ওসমানী সাহেব বললেন এখন তুমি ভারপ্রাপ্ত পিএস, এপিএস নও। একবার ফরেন অফিস এক চিঠিতে তার নাম ভুল বানান করেছিল, তিনি একটু অসন্তুষ্ট হয়ে নাম শুদ্ধিকরণের জন্য নিজে চিঠি ড্রাফট করে আমাকে ভারপ্রাপ্ত পিএস লিখে সই করে পাঠাতে নির্দেশ দেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি খুব দুর্বল ছিলেন। যাঁরাই তার সান্নিধ্যে আসতেন তাদের তিনি ভীষণ আদর সমাদর করতেন। সিলেটের আক্তার আহমেদ (বালাগঞ্জ), সিরাজ উদ্দীন (সদর), এনামুল হক চৌধুরী (বালাগঞ্জ), এমপি আশরাফ আলী (বালাগঞ্জ), এমপি শাহ আজিজ (ওসমানীনগর), ইয়ামিন চৌধুরী (গোলাপগঞ্জ), আলকাছ মিয়া (বালাগঞ্জ), ড. মকদ্দছ (ওসমানীনগর), মুজিবুর রহমান চৌধুরী (বিশ্বনাথ), এমপিএ ও বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়াম্যান লুৎফুর রহমান (ওসমানীনগর), মুকিত চৌধুরী (বালাগঞ্জ), নুরুল ইসলাম খান (বিশ্বনাথ), দেওয়ান গৌছ সুলতান ময়না (ফঞ্চুগঞ্জ), নাজিম উদ্দিন লস্কর ময়না (সদর), হুমায়ুন (গোলাপগঞ্জ), রেকি (সদর), তরী (সদর), আলী ইসমাইল (বিয়ানীবাজার), এডভোকেট শাহ্ মোদাব্বির আলী মানিক (বিশ্বনাথ) সহ আরো অনেকে তখন তাঁর সান্নিধ্যে আসতেন।

তিনি ২৮ বৎসর বৃটিশ আর্মিকে সেবা করে উৎসর্গ করেন। প্রায় দুই বৎসর সেনাধিনায়ক হিসেবে বাংলাদেশ আর্মির নেতৃত্ব ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজেকে উৎসর্গ করেন। দুই বৎসর দুইটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করেন। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে এ দুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় চালানো সহজ কথা ছিল না। দুইবার তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ফেরদৌস কোরেশী, মাজহারুল হক ও নুরুল ইসলাম খান সহ অনেকেই জনতা পার্টি গঠন করেছিলেন। ৬৬ বছরের জীবনে প্রায় সবটাই দেশের সেবায় কাটিয়েছেন নির্লোভ জেনারেল ওসমানী। তাঁর নিজের জন্য কিছুই রাখেননি। বাড়ি সহ সব কিছু দান করে গেছেন। জন্মশত বার্ষিকীতে মহান এই দেশপ্রেমিকের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক : প্রাক্তন সহকারী একান্ত সচিব (মন্ত্রী থাকাকালীন সময় জেনারেল ওসমানীর), বেঙ্গলী ইন্টারপ্রেটার – মিনিস্ট্রি অব জাস্ট্রিজ ইউকে।

শেয়ার করুন