কারবালার শিক্ষা

ধর্ম ডেস্ক:: ইমাম হোসাইন (রা.), নামটি বড়ই সুন্দর, কারণ হোসাইন নামের অর্থই ‘সুন্দর’। হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) কোনো সাধারণ ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি ছিলেন একদিকে দোজাহানের ইমাম রহমাতুল্লিল আলামিন হজরত রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নয়নের মণি, আদরের নাতি। তাঁরা দুই ভাই অর্থাৎ হজরত হাসান ও হোসাইন (রা.) ছিলেন রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অতি আদরের।

অন্যদিকে তাঁরা ছিলেন জান্নাতে নারীদের সর্দারিনী রহমাতুল্লিল আলামিনের প্রিয় কন্যা হজরত ফাতিমা (রা.) এবং ইসলামকে রক্ষা করার জন্য যিনি জীবনের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছিলেন, সিংহমানব হজরত আলী (রা.)-এর প্রিয় সন্তান। ৬১ হিজরির ১০ মহররম যাকে আশুরা হিসেবে আমরা জানি ইমাম হোসাইন (রা.) কারবালার ময়দানে নির্মমভাবে শাহাদাতবরণ করেছিলেন। যা প্রতিটি মোমিনের হৃদয় ব্যথিত ও মর্মাহত করে; আত্মা কেঁপে ওঠে। দুই নয়নে অঝরে অশ্র“ ঝরতে থাকে। মানুষ কীভাবে এত নির্মম ও নির্দয় হয় তা কোনোভাবেই মোমিনের দিল মানতে চায় না। বড়ই নির্মম ও নিষ্ঠুর হৃদয়বিদারক ঘটনা। হজরত হোসাইন (রা.) নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে দেখিয়ে দিলেন দীনের (ইসলামের) খেদমত করার মত ও পথ। কোনো অবস্থাতেই অন্যায়ের সঙ্গে আপস নয় তা তিনি বুঝিয়ে দিলেন। সর্বাবস্থায় আল্লাহর দীনের ওপর অটল ও অবিচল থাকতে হবে। তা তিনি অকপটে শিক্ষা দিয়ে গেলেন।

তাই মুসলিম জাতিকে ন্যায়ের পথে চলতে হবে, অন্যায়ের পথ পরিহার করতে হবে। একনিষ্ঠভাবে দীনের ওপর অটল থেকে রব্বুল আলামিনের ইবাদতে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে। এ সম্পর্কে আল কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘মানুষের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধাদ্বন্দ্বে জড়িত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি সে কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, তবে ইবাদতের ওপর অটল থাকে এবং যদি সে কোনো পরীক্ষায় পড়ে, তবে পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। সে ইহকাল ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত।’ সূরা হজ : ১১। আলোচ্য আয়াতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে বা বিপদাপদে দীন থেকে ছিটকে পড়া লোকদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। মানুষ দীন থেকে কেন ছিটকে পড়ে? মৌলিকভাবে মানুষ দীন থেকে ছিটকে পড়ে অনেক কারণে। যেমন কেউ কেউ সামাজিক লজ্জায় পড়ে দীন থেকে সরে পড়ে। কেউ কেউ পরস্পর সম্পর্কের কারণে দীন থেকে সরে পড়ে। কেউ কেউ অতি সুখের কারণে দীন থেকে সরে পড়ে। কেউ কেউ অতি দুঃখের কারণে দীন থেকে সরে পড়ে। তবে অনেকে উল্লি­খিত অবস্থার সম্মুখীন হয়েও নিজেদের দীনের ওপর অটল রাখতে সক্ষম হয় এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। কারণ ইসলামের বিধান হলো সুখে-দুঃখে এক কথায় সর্বাবস্থায় নিজেকে দীনের ওপর অটল রাখতে হবে। আমার খালিক (স্রষ্টা) রব্বুল আলামিন। তিনি আমাকে যেভাবে রাখতে পছন্দ করেন তার ওপরই আমি সন্তুষ্ট আছি। তিনি যদি সুখে রাখেন তাও আলহামদুলিল্লাহ। আর যদি দুঃখে রাখেন তাও আলহামদুলিল্লাহ। সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্মরণ বা জিকিরে ফিকিরে থাকতে হবে। অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তাদের এ ছাড়া কোনো নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, নামাজ আদায় করবে ও জাকাত দেবে। এটাই সঠিক ধর্ম।’ সূরা বাইয়্যেনা : ৫। আলোচ্য আয়াতে একমাত্র আল্লাহ রব্বুল আলামিনের জন্যই ইবাদতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর ইবাদত হবে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে। সুখে থাকলে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হওয়া আর দুঃখে থাকলে ইবাদত ছেড়ে দেওয়া বা বিপদে পড়লে তাঁকে ডাকা আর বিপদ দূর হয়ে গেলে তাঁর ডাক ছেড়ে দেওয়া কোনো ইমানদারের কাজ হতে পারে না। প্রিয় পাঠক! রহমাতুল্লিল আলামিনের অতি আদরের কলিজার টুকরা ইমাম হোসাইন (রা.) নির্মমভাবে শাহাদাতবরণ করেছেন। তিনি আমাদের জন্য যা কিছু রেখে গেছেন তা প্রিয় নবীর তরিকার অনুসরণে বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রতিটি নেক আমলের ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে আমলটি যেন কোরআন-হাদিসভিত্তিক হয়। কোরআন-হাদিস বহির্ভূত যেন না হয়। এ সম্পর্কে আল কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে মুহাম্মদ! (আপনি বলুন) আমি কি তোমাদেরকে এমন লোকদের সম্পর্কে অবহিত করব না যারা আমলের দিক দিয়ে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত। তারা সেই সমস্ত লোক, যাদের কৃত সমস্ত পরিশ্রম দুনিয়ায় বিফল হয়েছে, অথচ তারা (মূর্খতাবশত) এই ধারণা করে যে, তারা উত্তম কাজ করেছে।’ সূরা কাহাফ : ১০৩, ১০৪।

আল্লামা ফুজায়েল ইবনুল আয়াজ (রহ.) ওই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘কোনো কাজ আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার জন্য শর্ত হলো, তা যেন সহি তরিকায় আদায় ও সুন্নত মোতাবেক হয়। কেননা যে কোনো কাজ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না করে কোনো মাখলুককে সন্তুষ্ট করার জন্য করা হয় সেই কাজ আল্লাহর দরবারে কখনো কবুল হয় না।’ প্রিয় পাঠক! প্রতিটি মানবের সৃষ্টির উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করা। চলুন আমরা সুখে ও দুঃখে দীনের ওপর অটল থেকে তাঁর ইবাদতে মগ্ন হই। যে পথে ও মতে চললে রব্বুল আলামিন নারাজ হন সেই পথ বর্জন করি। যে পথে চললে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হবে তা বাস্তবায়নের আপ্রাণ চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ অনুসরণ ও অনুকরণ করে সব ইবাদত করার তাওফিক দান করুন।

লেখক : মুফতি আমজাদ হোসাইন হেলালী
মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও খতিব, বারিধারা ঢাকা।

শেয়ার করুন