সিরিজ বোমা হামলার ১৩ বছর আজ

সিলেটের সকাল ডেস্ক :: নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবি কর্তৃক দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার কলঙ্কময় দিন শুক্রবার (১৭ আগস্ট)।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে একযোগে রাজধানীসহ দেশের ৩০০টি স্থানে ৫০০ বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। মাত্র আধ ঘণ্টার ব্যবধানে চালানো এ সিরিজ বোমা হামলায় দু’জন নিহত হন, আহত হন দুই শতাধিক মানুষ। ৬৪ জেলার মধ্যে শুধু মুন্সিগঞ্জ জেলায় কোনো বোমা হামলার ঘটনা ঘটেনি সেদিন।

পিলে চমকানো ঐ হামলার ঘটনায় ১৫৯টি মামলায় আসামি করা হয় ১১০৬ জনকে। বিভিন্ন অভিযানে গ্রেফতার করা হয় ১০২৩ জনকে। সাজাপ্রাপ্ত ৩৩৪ জনের মধ্যে ২৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এর মধ্যে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হলেও বাকি ২১ জন এখনও পলাতক। এসব মামলায় খালাস দেয়া হয়েছে ৩৪৯ জনকে। বাকি আসামিরা পলাতক।

বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন ওই হামলার পর সামনে চলে আসে জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও জঙ্গিদের এমন তৎপরতায় হতবাক হয়ে পড়ে। অতি গোপনে জঙ্গিরা শক্তি সঞ্চয় করে দেশবাসীকে একযোগে জানান দিয়েছিল।

বৃহস্পতিবার (১৬ আগস্ট) দুপুরে পুলিশ সদর দফতর এবং অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের সদস্যদের সঙ্গে আলাপে এসব তথ্য জানা যায়।

সূত্র জানায়, একযোগের ঐ হামলার পর দায়ের করা ১৫৯টি মামলার মধ্যে ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া হয় ১০টির। এখনও বিচারাধীন ৩৪টি মামলা, আসামির সংখ্যা ৩৮৬ জন। বাকি মামলাগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে। ঘটনার পর পর মোট ১০২৩ জনকে গ্রেফতার করা হলেও অনেকেই জামিন নিয়ে পলাতক।

সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় সর্বোচ্চ ২৩টি মামলা হয় ঢাকা ও খুলনা রেঞ্জে। সর্বনিম্ন ৩টি করে মামলা হয় খুলনা মহানগর ও রেলওয়ে রেঞ্জে। মহানগরীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয় ডিএমপিতে। ডিএমপিতে ১৯টি মামলা হলেও ৯টি মামলায় চার্জশিট দেয়া হয়েছে। ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া হয়েছে ৯টির। এই ১৩ বছরে মোট ৭ জন আসামির স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। তবে ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে ৬ জনের। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানি। এখনও সব মামলার বিচার শেষ হয়নি।

জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) প্রধান অতিরিক্ত আইজি শফিকুল ইসলাম বলেন, যাদের ফাঁসি এখনও কার্যকর করা যায়নি, তারা পলাতক। যারা সাজা খেটে বেরিয়ে গেছেন বা জামিন নিয়ে পলাতক আছেন তারা ঝুঁকি তৈরি করছে। তারা নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, তারা পুলিশের নজরদারিতে রয়েছেন। অনেকে ধরা পড়ছে। এই মুহূর্তে বড় ধরনের হামলা চলানোর শক্তি তাদের নেই। জঙ্গিরা যাতে মাথাচাড়া দিতে না পারে সেজন্য পুলিশ সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে।

পুলিশের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের বোমা হামলার পর জঙ্গিদের তৎপরতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পায় পুলিশ। তাদের দমনে কাউন্টার টেরোরিজম এবং অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটসহ বিভিন্ন ইউনিট গড়ে তোলা হয়েছে। এসব ইউনিটের অত্যাধুনিক সরঞ্জামাদি সরবরাহ করা হয়েছে। পুরনো এবং নব্য জেএমবির মাস্টারমাইন্ডদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী জেলে। পুলিশের তৎপরতার কারণে তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জঙ্গিরা বেশিরভাগ স্থানেই রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। কোথাও টিফিন ক্যারিয়ারে বোমা রাখা ছিল। এসব বোমা জঙ্গিদের হাতে তৈরি। হামলার স্থান হিসেবে ওরা সুপ্রিমকোর্ট, জেলা আদালত, বিমানবন্দর, বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়, প্রেস ক্লাব ও সরকারি-আধাসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে বেছে নেয়। হামলাস্থলে জেএমবির লিফলেট ছিল। সেখানে ‘আল্লাহর আইন কায়েম ও প্রচলিত বিচার পদ্ধতি’ বাতিলের দাবি ছিল। ওই হামলার পর থেমে থাকেনি জঙ্গি কার্যক্রম। ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশ হত্যা করে প্রিজন ভ্যান থেকে আসামি ছিনতাই, বিভিন্ন স্থানে ব্যাংক লুটের ঘটনায় জঙ্গিদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, হলি আর্টিজান, শোলাকিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঐ সিরিজ বোমা হামলার পথ ধরেই।

শেয়ার করুন