রবীন্দ্রসাহিত্যে নাট্যভাবনা

মামুনুর রশীদ

মহৎ লেখকদের মধ্যে একটা বড় প্রবণতা দেখা যায়, তা হলো নাটক লেখা এবং নাটক লিখে মানুষকে সচেতন করা। আমাদের রবীন্দ্রনাথও সেই ভাবনা থেকে সমাজকে সচেতন করার কাজে নাটককে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। ‘রক্তকরবী’, ‘বিসর্জন’, ‘মুক্তধারা’, ‘রথের রশি’—সবই প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লেখা নাটক। অন্যদিকে ‘ডাকঘর’ নাটকটি শিশু-কিশোরদের নিয়ে অর্গলবদ্ধ জীবনকে নিয়ে লেখা হলেও তা একটি অবরুদ্ধ শিশুর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে দেখানো হয়েছে। নাটকগুলো বিভিন্ন আঙ্গিকে অভিনীত হলেও যে বিষয়টি লক্ষ করা গেছে তা হলো যে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া গণমানুষের কাছে পৌঁছতে পারেনি।

কিন্তু সেই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, চিঠিপত্র, ভ্রমণকাহিনি, কবিতা, গান খুব সহজেই বিপুল পরিমাণ পাঠক ও শ্রোতার কাছে পৌঁছে জীবনকে প্রভাবিত করেছে। এসব ভাবনা থেকে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত বর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে দুই বাংলার ২১ জন নাট্যকারকে নিয়ে সাতজন নাট্যকারের একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এ কর্মশালার একজন নাট্যকার ও শিক্ষক হিসেবে আমি অংশগ্রহণ করি। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও রামমোহন লাইব্রেরি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শান্তিনিকেতনে এ কর্মশালার কার্যক্রম চলতে থাকে। প্রখ্যাত নাট্যকার ও অধ্যাপক মনোজ মিত্র সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন। উৎসাহী তরুণ নাট্যকাররা খুব সহজেই কবিতা, গল্প, এমনকি ভ্রমণকাহিনি থেকে নাটক রচনার প্রস্তাবনা তৈরি করেন। দিনের একটা বড় সময় শিক্ষক নাট্যকারদের সঙ্গে তরুণ নাট্যকাররা আলোচনায় বসতেন এবং আলোচনার পর সবাই দু-এক পৃষ্ঠা লেখার চেষ্টা করতেন। সেসব লেখা নিয়ে আবার পর্যালোচনা। এভাবেই দুই সপ্তাহের কর্মশালা শেষ হওয়ার তিন মাসের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ নাটক রচনা করেন। রবীন্দ্রনাথের ‘সামান্য ক্ষতি’, ‘বোষ্টমী’সহ নানা গল্প কবিতা, কবিতা তো আছেই, সেই সঙ্গে তাঁর ভ্রমণকাহিনি নিয়েও নাটক রচিত হয়। এভাবে ২১টি নাটক লেখা হয়ে গেল। সেগুলো অভিনীত হলো এবং হচ্ছে।

রবীন্দ্রনাথের সব লেখায়ই কি নাটকীয় উপাদান আছে? খুঁজলে দেখা যাবে, তাঁর চিঠিপত্র নিয়েও নাটক করা সম্ভব। গান নিয়ে তো রয়েছেই। নাটকগুলো পড়ে মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম যেহেতু সমাজভাবনায় ঋদ্ধ, তাই তাঁর লেখা থেকে অনায়াসেই নাট্য উপাদান আবিষ্কার করা সম্ভব। নাটকের বাইরে চলচ্চিত্রের উপাদানও ছড়িয়ে আছে গল্পে, উপন্যাসে। ‘স্ত্রীর পত্র’, ‘চারুলতা’, ‘ঘরে বাইরে’র মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।

কর্মশালার সাফল্যের বিষয়টি হচ্ছে নাটকের বাইরেও রবীন্দ্রনাথের গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও ভ্রমণকাহিনি নিয়ে যে ভালো নাট্য প্রযোজনা হতে পারে তার সম্ভাবনার বিয়ষটি দেখার। রবীন্দ্রনাথের নাটক নিয়ে যে নিরীক্ষার জায়গাগুলো আছে সেগুলোর দ্বারও উন্মোচিত করা প্রয়োজন। মণিপুরের কানাইহা লালের ‘ডাকঘর’ দেখে আমরা ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। শিশু অমলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন মধ্য সত্তরের একজন অভিনেত্রী সাবিত্রী। এই প্রযোজনায় অমলকে এক সর্বজনীনতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সব বয়সের মানুষের মধ্যে যে একজন অমল আছে সেই বার্তাটি দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন কানাইহা লাল। অনেক নাট্যবোদ্ধা-সমালোচক আবার এটাকে ভিন্নভাবে দেখেছেন, তাঁরা বলেছেন, এটা অত্যন্ত অন্যায় ও স্পর্ধিত প্রযোজনা। রবীন্দ্রনাথের নাটকে নিরীক্ষার অধিকারটি দিতেই হবে। এ জন্য অবশ্য একসময় শম্ভু মিত্রকেও অনেক গালমন্দ সহ্য করতে হয়েছে। এ বিষয়ে উৎপল দত্তও বারবার বলেছেন, রবীন্দ্র পাণ্ডাদের জন্য অনেক নিরীক্ষাধর্মী কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এই সঙ্গে একটি সংবাদ দেওয়া প্রয়োজন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোল্যান্ডের একটি শিশু-কিশোরদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ‘ডাকঘর’ অভিনীত হয়েছিল। কী করে, কিভাবে নাটকটি পৌঁছল এবং নাটকের অভিনয় বন্দিশিবিরের শিশুদের আলোড়িত করল, তা-ও কিন্তু ভাবার বিষয়। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে অপার সম্ভাবনার কথা নাট্যকর্মীদের ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য ওই কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছিল। এ ধরনের কর্মশালা ও উদ্যোগ আজও নেওয়ার প্রয়োজন আছে।


লেখক : নাট্যব্যক্তিত্ব

শেয়ার করুন