ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি

তপন চক্রবর্তী

চলে গেল মানবতার কবি, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণ দিবস। তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

উপ-মহাদেশ নয়, পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানুষ, জনগণের কবি, সঙ্গীত বিশারদ ও কথাশিল্পী কাজী নজরুল ইসলাম অনন্য সৃষ্টিকর্মে নিবেদিত থাকা অবস্থায় ক্রমে নির্বাক হয়ে যান। এর রহস্য উন্মোচনে অনেকে অনেক অবান্তর গল্প দাঁড় করানোর অপপ্রয়াস নিয়েছেন। আজো বেশিরভাগ মানুষ তাঁর বাকশক্তি রহিত হওয়ার বৈজ্ঞানিক কারণ জানেন না। অনেকে এও জানেন না যে এই দুরারোগ্য রোগ থেকে কেউ বাঁচতে পারেননি।

কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৪২ সালে বাকরুদ্ধ হন। ১৯৩০ সালে নজরুলের ‘প্রলয়শিখা’ প্রকাশিত হওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার রাজদ্রোহের অভিযোগে গ্রন্থটির বিপণন নিষিদ্ধ করে এবং কবিকে কারা অন্তরালে যেতে হয়। গাঁধি-ইরউইন চুক্তির আলোকে ১৯৩১ সালে তাঁর কারামুক্তি ঘটে।

কারামুক্তির পর দুর্বার গতিতে কবির নানামুখী প্রতিভার বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে। ১৯৩৩ সালে তাঁর রচিত প্রবন্ধসমূহ ‘আধুনিক বিশ্ব সাহিত্য’ শিরোনামে সংকলিত হয়ে প্রকাশিত হয়। ১৯২৮-১৯৩৫ সালের মধ্যে দশ ভল্যুমে ৮০০ সংগীত গ্রন্থাকারে বের হয়। ৮০০- এর মধ্যে ৬০০-এর অধিক গান রাগাশ্রিত ছিল। প্রায় ১০০টি বাউলাঙ্গের কীর্তন ও ৩০টি দেশপ্রেম বিষয়ক গান ছিল। নজরুল প্রায় ২৬০০টি গান লিখেছিলেন জানা যায়। এর মধ্যে অনেক গান হারিয়ে গেছে। তিনি বাউল, ঝুমুর, সাঁওতালি, ঝাঁপতাল ও বেদেনীদের সাপ খেলানো, ভাটিয়ালি ও ভাওয়াইয়া ইত্যাদি সুরে গান বেঁধেছেন। তাঁর গান কাব্যময় ও গীতিময়। যে কারণে শ্রোতা মুগ্ধ হয়ে শোনে। এই সময়ে তিনি বেশ কিছু শিশুসাহিত্যও রচনা করেন।

এর পর কবি সিনেমা জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তিনিই বাংলা সিনেমার প্রথম মুসলিম পরিচালক। তিনি ‘ধ্রুব ভক্ত’ পরিচালনা করেছিলেন। নিজে অভিনয়ও করেছিলেন। তাঁর রচনা ‘বিদ্যাপতি’ সিনেমায় রূপান্তরিত হয়েছিল। তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘গোড়া’ অবলম্বনে নির্মিত সিনেমার মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবে সাফল্য অর্জন করেন। তিনি শচীন সেনগুপ্তের ‘সিরাজ-উদ-দৌলা’, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘জাহাঙ্গীর’, ‘অন্নপূর্ণা’ ইত্যাদি সিনেমার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি এই সময় আকাশবাণীর কলকাতা কেন্দ্রের সংগীত প্রযোজনা ও প্রচার তত্ত্বাবধায়কের পদে কাজ করেন। সেই সঙ্গে তিনি সংগীতের সমালোচনা ও বিশ্লেষণমূলক ‘হারামণি’ ও ‘নবরাগ-মল্লিকা’ ডকুমেন্টারি নির্মাণ করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনি ভৈরবী রাগে অসংখ্য সংগীত রচনা করেছিলেন।

১৯৩৯ সালে তাঁর স্ত্রী প্রমিলা ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর কোমর থেকে পা পর্যন্ত অবশ হয়ে যায়। স্ত্রীর চিকিত্সার জন্য কবি ৪০০ টাকায় তাঁর গ্রামোফোন রেকর্ড ও সাহিত্যকর্ম বাবদে প্রাপ্য সম্মানী বন্ধক রাখেন। ১৯৪০ সালে তিনি এ. কে. ফজলুল হক প্রকাশিত ‘নবযুগ’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব নেন।

১৯৪১ সালের ৮ আগস্ট রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে কবি ভীষণ আঘাত পান। তিনি রবীন্দ্রনাথকে গুরুপদে বরণ করেছিলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আকাশবাণীতে পাঠের জন্য ‘রবিহারা’ নামে এক অমর কাব্য রচনা করেন এবং পাঠ করেন। এক মাসের মধ্যে তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ক্রমে বাকশক্তি হারাতে থাকেন। কবির স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। তাঁর আচরণ রুক্ষ হয়ে ওঠে এবং দু’হাতে পয়সা খরচ করতে থাকেন। প্রথমে তাঁকে হোমিওপ্যাথি ও আয়ুর্বেদী চিকিত্সা প্রদান করা হয়। প্রমীলা অসুস্থ অবস্থায়ও স্বামীর সেবার প্রতি দৃষ্টি রাখতেন। নিজেও যতটুকু সম্ভব করতেন।

চিকিত্সায় সাড়া না দেওয়া এবং কবির মানসিক স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতি দেখা দিলে তাঁকে ১৯৪২ সালে কলকাতার মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কবি সেখানে চার মাস ছিলেন। কিন্তু অবস্থার উন্নতি হয়নি। এভাবে অসুস্থ কবি ও পঙ্গু কবিপত্নী ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালে কবিকে রাঁচী মনোরোগ চিকিত্সালয়ে ভর্তি করা হয়।

নজরুলের গুণমুগ্ধ বিশাল ভক্তগোষ্ঠী ‘নজরুল চিকিত্সা সোসাইটি’ গড়ে তুলেন। তাঁরা কবি ও কবিপত্নীকে প্রথমে লন্ডন ও পরে ভিয়েনায় পাঠান। সেখানে চিকিত্সকরা অভিমত দেন যে, প্রমীলার রোগ সারবে না। কারণ তিনি পূর্বে যথার্থ চিকিত্সা পাননি। স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক হ্যানস হফ কবিকে পরীক্ষা করে বলেন যে তিনি দুরারোগ্য পিক’স রোগে ভুগছেন। এই রোগ সারে না। কবি ১৯৫৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯৬২ সালে তাঁর স্ত্রীবিয়োগ হয়। কবিকে ইনটেনসিভ মেডিক্যাল কেয়ারে রাখা হয়।

জার্মানির প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিভাগের প্রফেসর আর্নল্ড পিক স্মরণশক্তিহীন রোগীদের মগজ পরীক্ষা করতে গিয়ে এই রোগ আবিষ্কার করেন। তাঁর নামেই রোগের নাম রাখা হয়। বেশ কিছু বিখ্যাত ব্যক্তি এই রোগের শিকার হয়েছেন। মগজের ফ্রন্টোটেম্পোরাল নামক অংশ ক্রমে ক্ষয় হতে হতে মানুষ স্মৃতিসহ বাকশক্তি হারাতে থাকে। এটি একপ্রকার নিউরোডিজেনারেটিভ ডিজিজ। পিক’স রোগের প্রকৃত কারণ জানা যায়নি।

লেখক : চিকিত্সক

উৎস: ইত্তেফাক

শেয়ার করুন