পিয়াইনে ১৫ বছরে অর্ধশত দর্শনার্থীর মৃত্যু ।। মৃত্যুবরণকারীদের অধিকাংশ ছাত্র

জাফলংয়ে বাড়ছে প্রাণহানি  ।। 

জাফলং জিরো পয়েন্টে দর্শনার্থীদের ভীড়। ছবিটি ঈদুল আজহার পরদিন তোলা হয়েছে। ছবি: সিলেটের সকাল

বিশেষ প্রতিবেদন :: ছুটিতে অনেকেই ছুটে যান ‘প্রকৃতিকন্যা’ জাফলংয়ে। আনন্দ উপভোগে দর্শনার্থীরা এখানে ভিড় জমালেও অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় জায়গাটি। তথ্য বলছে, সাঁতার না জানা ও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় ১৫ বছরে অর্ধশত দর্শনার্থীর মৃত্যু হয়েছে জাফলংয়ে। সাঁতার না জানা এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় ‘প্রকৃতিকন্যা’ খ্যাত জাফলংয়ে প্রতি বছর মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। আর নিহতদের অধিকাংশই ছাত্র। সর্বশেষ গত শনিবার পিয়াইন নদীতে গোসল করতে নেমে প্রাণ হারান ঢাকা সিটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রিফাত আহমদ।

‘‘মৃত্যুবরণকারীদের অধিকাংশ ছাত্র। তারা অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধা মানতে চায় না। একদিকে, তাদের বোঝানো যায় না, অন্যদিকে তাদের ‘আঘাত’ও করা যায় না। তাদের মধ্যে অনেকেই আবার সাঁতার জানে না। যে কারণে প্রতি বছরই জাফলংয়ে পানিতে ডুবে পর্যটকদের মৃত্যু হচ্ছে।’’

এমনটি জানালেন গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) হিল্লোল রায়। রিফাতের মৃত্যুর পর তারা জাফলংয়ে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছেন বলেও জানান তিনি।

জাফলংয়ে ট্যুরিস্ট পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক দেবাংশু কুমার দে’র মতে, জাফলংয়ে পর্যটক মৃত্যুর মূল কারণ ‘তারুণ্যের জোস’। তিনি জানান, শনিবার জাফলংয়ে লক্ষাধিক পর্যটকের ঢল নামে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় নদীতে তিনটি নৌকা নিয়ে তারা টহল দেন। তার মতে, এখানে মৃত্যুবরণকারী পর্যটকদের বেশিরভাগের বয়স ১৯ থেকে ২৩ বছর। তিনি জানান, গেল ২ বছরে জাফলংয়ে মারা যাওয়া তিন পর্যটকের সবাই ছাত্র।

‘‘পিয়াইন নদীর মধ্যখানে তীব্র স্রোত থাকে। এ স্রোতে অনেকেই টিকতে পারে না। আবার নদীর তলদেশে চোরাবালিও রয়েছে। এ দুইয়ের কারণেই সেখানে পর্যটকের মৃত্যু হচ্ছে।’’-এমনটিও জানান তিনি।

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তঘেঁষা পর্যটন এলাকাগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে জাফলং। পাহাড়-নদী, পাথর আর স্বচ্ছ জলরাশির মেলবন্ধন দেখতে এখানে বছরের সবসময়ই পর্যটক-দর্শনার্থীর ভিড় লেগে থাকে। জেলা সদর থেকে মেঘালয়ের পাদদেশের জাফলংয়ের দূরত্ব ৫৮ কিলোমিটার। জাফলংয়ের পর্যটক আকর্ষণের অন্যতম হচ্ছে বল্লাঘাট জিরো পয়েন্ট।

ভারতের পাহাড় থেকে নেমে আসা ডাউকি নদী ও বাংলাদেশের পিয়াইন নদীর সংযোগস্থলের সৌন্দর্য অবলোকনে এ জিরো পয়েন্ট এলাকায় বেশি ভিড় করেন পর্যটক। বিশেষ করে দুই ঈদের ছুটিতে সেখানকার সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা। এসময় বেশির ভাগ পর্যটক-দর্শনার্থী পিয়াইনের স্বচ্ছজলে গা ভিজিয়ে নিতে নদীতে নেমে পড়েন। তখনই ঘটে দুর্ঘটনা।

গোয়াইনঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিশ্বজিত কুমার পাল জানান, জাফলংয়ে পর্যটকদের সতর্ক করার জন্য বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি এজেন্সি কাজ করছে। সেখানে সাঁতার না কাটতে সাইনবোর্ডও সাঁটানো রয়েছে। এরপরও পর্যটকরা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গোসল করতে নামেন। যে কারণে সেখানে প্রায় দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রতিবারের ন্যায় এবারও জাফলংয়ে পর্যটকদের নিরাপত্তায় একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্বরত ছিলেন।

পুলিশ এবং পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী জাফলংয়ে গেল ১৫ বছরে অর্ধশতাধিক পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সালের ১৫ আগস্ট জাফলং বেড়াতে গিয়ে পিয়াইন নদীতে ডুবে প্রাণ হারান সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রেজাউর রহমান ফয়সাল ও রাজন আহমদ। এ ঘটনার পর পর্যটন এলাকায় দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল স্থানীয় প্রশাসন। এরপরও তাদের উদ্যোগ তেমন সফলতা পায়নি। থামেনি মৃত্যুর মিছিল।

এর মধ্যে ২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পিয়াইন নদীতে ডুবে মারা যান চট্টগ্রাম সিটি কলেজের শিক্ষার্থী ফয়সল হোসেন সৌরভ ও ময়মনসিংহ এ্যাপোলো ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী কামাল শেখ। ২০১৬ সালে চারজনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ৩০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর সোহরাব, ২৪ আগস্ট উপজেলার প্রতাপপুরের ফরিদ আহমদ, ১৯ আগস্ট গাজীপুরের মো. আসিফ এবং ৩ আগস্ট সিলেট ব্লু-বার্ড স্কুলের শিক্ষার্থী আশফাক সিদ্দিকীর মৃত্যু হয়।

২০১৫ সালের ২২ জুলাই ঢাকার কবি নজরুল কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল্লাহ অন্তর ও সোহাগ ঘোষ নামে দুজনের মৃত্যু হয়। তারা ঈদুল ফিতরের ছুটিতে জাফলং বেড়াতে এসেছিলেন। একইভাবে ২০১৪ সালে ২ আগস্ট নদীতে গোসল করতে নেমে মারা যান নারায়ণগঞ্জের জসিম উদ্দিন। একই বছরের ৩১ জুলাই পিয়াইন নদীতে নৌকাডুবে মারা যান মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাকিল, মামুন ও সাদেক হোসেন। একই দিন চোরাবালিতে তলিয়ে মৃত্যু হয় সিলেটের শাহী ঈদগাহ হোসনাবাদ এলাকার কামরুল এবং সাঁতার কাটতে গিয়ে মারা যান অজ্ঞাত এক যুবক।

এছাড়া ২০১৩ সালের ১৭ আগস্ট ঢাকার শনির আখড়া এলাকার শুভ আহমদ, ২৫ অক্টোবর ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কলেজের ছাত্র ইমরান হোসেন এবং ৩০ মে মাদারীপুর সদর উপজেলার চলকিপুর গ্রামের মো. ইব্রাহীমসহ চারজন মারা যান। ২০১২ সালের ২২ আগস্ট ঢাকা জেলার ফাহাদ উদ্দিন, ৩০ আগস্ট মৌলভীবাজারের কুলাউড়া এলাকার হিমেল রাজ সঞ্জয়সহ দুইজন মারা যান। ২০১০ সালের ২৩ মার্চ ঢাকার খিলগাঁও এলাকার তারেক আহমেদ, ২০ মে রফিকুল ইসলাম ও গৌরাঙ্গ কর্মকার, ২২ মে ঢাকার শাহরিয়ার আহমেদ রাব্বি, ২ জুলাই ঢাকার তেজগাঁও এলাকার শাহরিয়ার শফিক, ৩০ জুলাই জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ এলাকার মুস্তাকিন তালুকদার, ১২ সেপ্টেম্বর ঝালকাঠি জেলার রুহুল আমিন খান রুমিসহ সাতজন মারা যান।

২০০৯ সালের ২৬ জানুয়ারি হবিগঞ্জ বানিপুর এলাকার ইউনুছ মিয়া, ৮ মে ঢাকার মিরপুরের ফারুক আহমদ, ২১ জুন নরসিংদী সদর এলাকার সজিব মিয়াসহ তিনজন মারা যান। ২০০৮ সালের ৯ নভেম্বর ঢাকার পল্লবী এলাকার দিলশাদ আহমেদ ও ২০০৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি গোয়াইনঘাট উপজেলার মুসা মিয়া, ১৬ আগস্ট একই উপজেলার ফখরুল ইসলামসহ দুইজন মারা যান। ২০০৪ সালে ২ জন, ২০০৫ সালে ১ জন এবং ২০০৭ সালে দুই পর্যটকের মৃতু্যু হয়।

শেয়ার করুন