পতঙ্গ চাষ ও বাণিজ্য সম্ভাবনা

বিধান চন্দ্র দাস

জাতিসংঘের খাদ্য কর্মসূচি (এফএও) গত ২০০৩ সাল থেকে ভোজ্য পতঙ্গ (এডিবল ইনসেক্ট) উৎপাদনের ব্যাপারে নানা ধরনের উৎসাহমূলক কর্মসূচি পালন করে আসছে। এফএওর ভোজ্য পতঙ্গ সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে অনেক ধরনের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এফএও ভোজ্য পতঙ্গ সংক্রান্ত বেশ কিছু পুস্তিকা, প্রতিবেদন, প্রবন্ধ ও বই প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা ভোজ্য পতঙ্গ সংক্রান্ত গবেষণা পরিচালনা করছেন এবং সেসব গবেষণার ফলাফলও প্রকাশিত হচ্ছে। এসব প্রকাশনার মাধ্যমে জানা যায় যে পৃথিবীতে বর্তমানে মোট ১০৮টি দেশের প্রায় ২০০ কোটি মানুষ বিভিন্ন প্রকার পতঙ্গ খাচ্ছে। এ ছাড়া এসব প্রকাশনায় মাছ ও হাঁস-মুরগি চাষের জন্য প্রচলিত প্রোটিনের বিকল্প উৎস হিসেবে পতঙ্গ অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এফএও বিশ্বব্যাপী পতঙ্গ চাহিদা মেটানোর জন্য ব্যাপকভাবে পতঙ্গ চাষ করা প্রয়োজন বলে প্রচার করছে। নানা রকম তথ্য-উপাত্ত প্রকাশের মাধ্যমে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ এই দপ্তর পতঙ্গ চাষের ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে চলেছে।

গত বছর নভেম্বর মাসে (২৩ নভেম্বর ২০১৭) যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় ফিনল্যান্ডে ঝিঁঝি পোকার স্পেশাল পাউরুটি বিক্রির সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। ফিনল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক বিখ্যাত ফুড ইন্ডাস্ট্রি ফেজার গ্রুপ ঝিঁঝি পোকার সেই স্পেশাল পাউরুটি তৈরি করে বাজারে ছেড়েছিল। পৃথিবীর ৪০টি দেশে প্রায় পৌনে ২০০ কোটি ইউরো বার্ষিক খাদ্যসামগ্রী বিক্রির রেকর্ডধারী ফেজার গ্রুপ সেই পাউরুটিকে আমিষের ভালো উৎস হিসেবে দাবি করেছিল। কিন্তু এ বছরের শুরুতেই কম্পানির প্রেসিডেন্ট-কাম-প্রধান নির্বাহী মি. ক্রিস্টফ পাউরুটি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ঝিঁঝি পোকার পাউডার স্বল্পতার কথা সংবাদমাধ্যমকে জানান। একটি পাউরুটি তৈরি করতে প্রায় ৭০টির মতো ঝিঁঝি পোকার পাউডার প্রয়োজন হয়। ফেজার কম্পানি নেদারল্যান্ডস থেকে ঝিঁঝি পোকার পাউডার আমদানি করছিল। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট না হওয়ায় কম্পানি এখন বিকল্প নানা উৎস থেকে ঝিঁঝি পোকার পাউডার সংগ্রহ করছে।

আগামী সাড়ে তিন দশকেরও কম সময় অর্থাৎ ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর লোকসংখ্যা দাঁড়াবে ৯০০ কোটি। বিশাল সেই জনসংখ্যার প্রোটিন চাহিদা পূরণের জন্য পতঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিজ্ঞানীরা বলছেন। এফএওর একটি প্রকাশনায় ভোজ্য পতঙ্গে মানবশরীরের পক্ষে উপকারী উচ্চ মাত্রার ফ্যাট (আনস্যাচুরেটেড ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড), প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল ও আঁশ থাকার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার পতঙ্গ প্রজাতি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে খাচ্ছে।

প্রচলিত ধারায় প্রোটিনের উৎস হিসেবে গবাদি পশু পালনে যে পরিমাণ স্বাদু পানি ও খাবার খরচ হয় এবং যে পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাসের উৎপত্তি হয়, তুলনামূলকভাবে পতঙ্গ চাষে তা হয় না। রান্নাঘরের সবুজ আবর্জনাসহ বিশেষ ময়লা-আবর্জনা পতঙ্গদের খাবার হিসেবে দেওয়া যায়। এ কারণে পতঙ্গ চাষকে পরিবেশবান্ধব বলে অভিহিত করা হচ্ছে।

তবে আমাদের সামাজিক ও সংস্কৃতির বাস্তবতায় এখনই পতঙ্গকে আমাদের খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব নয়। যদিও কোনো কোনো সময় আমাদের অজান্তে আমরা পতঙ্গ খেয়ে ফেলি; যেমন—মেশিন ছাড়া আহরিত কোনো কোনো মধুর সঙ্গে, চাল-আটা কিংবা শাকসবজির সঙ্গে। আমরা যা করতে পারি তা হচ্ছে বিদেশের চাহিদা মোতাবেক পতঙ্গ চাষ করা। যেমন চিংড়ি চাষ করছি। গত শতকের ষাটের দশক পর্যন্ত দেশে এখনকার মতো চিংড়ি চাষ করা হতো না। মূলত বিদেশে চাহিদার কারণেই দেশে ব্যাপকভাবে চিংড়ি চাষ শুরু হয়েছিল।

বাংলাদেশের আবহাওয়া ভোজ্য পতঙ্গ চাষের জন্য উত্তম। শীতপ্রধান দেশে কৃত্রিমভাবে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও আলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পতঙ্গ চাষ করা হচ্ছে। এসব দেশে কর্মচারী বা শ্রমিকদের পারিশ্রমিকও বেশি। সে জন্য ওই সব দেশে পতঙ্গ চাষ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আগামী ২০২৪ সালের মধ্যে ভোজ্য পতঙ্গকেন্দ্রিক বিশ্ববাজার ৭২৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। অল্প জায়গায় অতি দ্রুত পতঙ্গ চাষ করা যায় বলে ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তায় ভোজ্য পতঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। এ কারণে আগামী দিনে বাংলাদেশে চাষকৃত পতঙ্গ রপ্তানির অপার সম্ভাবনা দেখা যায়।

এ ছাড়া আমাদের দেশে আপাতত মাছ ও মুরগির খামারে দেওয়া খাদ্য তৈরিতে পতঙ্গ ব্যবহার করা যেতে পারে। বাংলাদেশে মাছ ও মুরগির খামারে বছরে প্রায় ৮০ লাখ মেট্রিক টন খাবারের (ফিশ ও পোল্ট্রি ফিড) চাহিদা রয়েছে। আর এসব খাবার তৈরিতে প্রাণিজ অংশ (মাছ বা মাছের অংশ, মাংস, নাড়িভুঁড়ি, হাড় ইত্যাদি) মেশানোর প্রয়োজন হয়। কিন্তু ফিডের পরিমাণ বিপুল হওয়ায় ফিড প্রস্তুতকারী কারখানাগুলো এসব প্রাণিজ অংশ প্রয়োজন অনুযায়ী সহজে সংগ্রহ করতে পারছে না। বিদেশ থেকে প্রাণিজ এসব উপাদানের আমদানি খরচও অনেক বেশি। ফলে মাছ ও মুরগির খাবার তৈরিতে যে পরিমাণ প্রাণিজ উপাদান থাকা প্রয়োজন, তা সঠিক মাত্রায় বেশির ভাগ খাবারে থাকছে না।

কোনো কোনো ফিড প্রস্তুতকারী কারখানা প্রাণিজ অংশ হিসেবে ফিড প্রস্তুতিতে ট্যানারির বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবহার করছে। একসময় হাজারীবাগের বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য প্রাণিজ উপাদান হিসেবে মিশিয়ে বেশ কয়েকটি ফিড প্রস্তুতকারী কারখানা মাছ ও মুরগির খাবার তৈরি করত। পরে সাভারের ভাকুর্তার মোগড়াকান্দায়ও ট্যানারির বর্জ্য মাছ ও মুরগির খাবারে মেশানো শুরু হয়। জনস্বাস্থ্যের জন্য ট্যানারির বর্জ্য মিশ্রিত ফিড অত্যন্ত ক্ষতিকর। বাংলাদেশে গবেষণায় এ ধরনের খাবার খেয়ে বেড়ে ওঠা মুরগি কিংবা মাছের দেহে ক্রোমিয়াম ও সিসার মতো ক্ষতিকর পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ কারণে ২০১১ সালে হাইকোর্ট বেঞ্চ ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে মাছ-মুরগির খাবার তৈরির কারখানা বন্ধের নির্দেশ দেন।

কয়েক বছর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি একজন গবেষক ছাত্রকে মাছির শূককীট ও মূককীট তৈরি করে তার পাউডার মিশিয়ে মাছের খাবার প্রস্তুত করে মাছকে খাওয়াতে বলেছিলাম। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে তার থিসিসের কাজ হিসেবে এই গবেষণা সে খুব সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছিল। গবেষণার ফলাফল ছিল মোটামুটিভাবে সন্তোষজনক। তবে সেই গবেষণাটি আরো দু-তিনবার করার প্রয়োজন ছিল। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের করা এ ধরনের একটি গবেষণাকাজ ইউটিউবে আছে।

বাংলাদেশে পতঙ্গবৈচিত্র্য ও প্রাচুর্য অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি বলে ধারণা করা হয়। অবশ্য এ বিষয়ে সন্তোষজনক কোনো পরিসংখ্যান আমাদের দেশে এখনো তৈরি করা হয়নি। আমাদের অনেকের কাছে পতঙ্গ মানেই ক্ষতিকর জীব। মৌমাছি, রেশমপোকা ও লাক্ষাকে উপকারী পতঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও অনেকে অন্য সব পোকা মানুষের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করে। বর্তমানে অবশ্য নানা ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মশালার মাধ্যমে কিছু পোকা, বিশেষ করে যারা ফসলের জন্য ক্ষতিকর অন্য পোকাকে খায় তারা কৃষকের বন্ধু হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশ পতঙ্গ প্রজাতি সম্পর্কে আমাদের ধারণা অত্যন্ত ক্ষীণ। হাতে গোনা কয়েকটি পতঙ্গ ছাড়া, আমরা জানি না, আমাদের দেশে সত্যিকারে কী কী পতঙ্গ প্রজাতি আছে। পরাগায়ণ, মাটির গুণাগুণ বজায় রাখা, পানিকে পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে পতঙ্গকুল দৃশ্যমান ও অলক্ষ্যে থেকে কিভাবে এবং কত প্রকারে বাস্তুতান্ত্রিক সেবা আমাদের প্রদান করছে তার সন্তোষজনক কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমাদের পরিবেশ, অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য এ তথ্যগুলো সংগ্রহ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে পতঙ্গবৈচিত্র্যের পরিসংখ্যান দেশে সঠিকভাবে পতঙ্গ চাষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত বিটল, মথ, ফড়িং, বোলতা ও মাছিজাতীয় পতঙ্গের বিভিন্ন প্রজাতি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চাষ করা হয়। পতঙ্গের এই গ্রুপগুলো আমাদের দেশেও আছে। কিন্তু প্রতিটি গ্রুপে কয়েক হাজার কিংবা লক্ষাধিক প্রজাতি থাকার কারণে তাদের চেনা ও বাছাই করে সঠিক প্রজাতিগুলো চাষ করতে হলে গবেষণা প্রয়োজন। দেশে মাছ-মুরগির খাবারে মেশানোর জন্য বিকল্প প্রাণিজ উপাদান হিসেবে পতঙ্গ পাউডার সস্তা ও সহজলভ্য হলে ফিড কম্পনিগুলো তখন সেগুলোই ব্যবহার করবে বলে আশা করা যায়।

লেখক : অধ্যাপক, প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন