ঈদ ট্যুরিজম:অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন দিগন্ত

ড. সন্তোষ কুমার দেব

সাংস্কৃতিকভাবে বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধ দেশ, এ দেশের রয়েছে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক-ঐতিহ্যের পরিক্রমা। নানা রকম কৃষ্টি-কালচার এদেশের সামপ্রদায়িক চেতনাকে উপেক্ষা করে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে এসেছে একটি সমপ্রীতির বিন্দুতে, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিকশিত করে।

ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের ভ্রমণপ্রবণতা ও নানারকম বিনোদন কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবকিছুই ফেস্টিভাল ট্যুরিজমের অন্তর্গত— যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির ফলশ্রুতিতে মানুষের কর্মব্যস্ততা বেড়েছে, আয় বেড়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে ভ্রমণ-প্রবণতাও। মানুষ আজকাল বিভিন্ন ফেস্টিভালে যোগ দিতে দূর-দূরান্ত থেকে হাজির হয়। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঈদ সবচেয়ে আকর্ষণীয় অবকাশ যাপনের মাধ্যম। ঈদের ছুটিতে শহর শূন্য হয়ে যায়, গ্রাম হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব একসঙ্গে ঈদ কাটানোর উদ্দেশ্যে শহরের কৃত্রিম ব্যস্ততা ঘেরা পরিবেশ ছেড়ে নাড়ির টানে বাড়ি ছুটে আসে। বিশেষ করে ঈদের সময় মানুষের ভ্রমণের জন্য একটা আলাদা বাজেট তৈরি হয়ে যায়। অনেকেই ঈদের ছুটিতে দেশের নানা জায়গায় ভ্রমণ করে থাকে।

অর্থনৈতিক বিবেচনায়, ঈদে আর্থিক লেনদেন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা আর্থ-সামাজিকভাবে তাত্পর্যপূর্ণ। ঈদকে কেন্দ্র করে পোশাক-পরিচ্ছদ, ঘরোয়া তৈজসপত্র, খাদ্যসামগ্রী ও উপহারসামগ্রী কেনা-বেচা ব্যবসা বৃদ্ধি পায়— যা অর্থনীতিকে গতিশীল করে। ফেস্টিভাল ট্যুরিজম বিশেষ করে ঈদের বাজারে যে বিশাল চাহিদা তৈরি করে তা সাপ্লাই-চেইনকে গতিশীল করে। উত্পাদন ও সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশাল সংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারীর আয় বেড়ে যায়। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তরুণ-যুবক চুক্তিভিত্তিক ও অস্থায়ীভাবে কাপড়ের দোকানে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করে, এতে করে আয়ের একটা সুষম বণ্টনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। আয়প্রবাহ সমাজের শিক্ষিত-আধাশিক্ষিত বেকারদের দিকে ধাবিত হয়— যা তাদের ঈদের আমেজকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। অর্জিত আয় আবার ব্যয়িত হয় পুনঃক্রয় ও ভ্রমণ বিলাসে। এভাবে অর্থনৈতিক উপাদানের মধ্যে পারসপরিক নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়। ফলে দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য অধিক প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

প্রাচীনকাল থেকে মানুষ নানাবিধ প্রয়োজনে একস্থান হতে অন্যস্থানে ভ্রমণ করে আসছে। তবে বাঙালি জাতি ইতোমধ্যে ভ্রমণের প্রেমে পড়েছে বিধায় ঈদের সময়ে দেশের দর্শনীয় স্থানগুলোতে মানুষের উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। অনেকে বিদেশেও পাড়ি জমান। এই ভ্রমণ নেশাই পারে তরুণ প্রজন্মকে মাদকের নেশা থেকে মুক্ত করে আলোকিত সমাজ গঠনে উদ্বুদ্ধ করতে। বিভিন্ন দেশে ঈদের ছুটি প্রায় ৫-৬ দিন হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে পর্যটন বৃদ্ধি পায় উল্লেখযোগ্য হারে। যেমন ২০১৭ সালে তুরস্ক প্রায় ১ বিলিয়ন লিরা আয় করেছিল ঈদ ছুটিকালীন পর্যটন থেকে। ঈদের সময় মালয়েশিয়া, মিশর, আরব আমিরাত নানান ধরনের আকর্ষণীয় প্যাকেজ নিয়ে আসে মুসলমান পর্যটকদের জন্য, যা আজ সবার কাছে অত্যন্ত সমাদৃত। তাছাড়াও ২০১৭ সালে প্রায় ৫০ লক্ষ পর্যটক মালয়েশিয়া ভ্রমণ করে তবে ২০১৮ সালে তারা ৭০ লক্ষ পর্যটক প্রত্যাশা করছেন।

ঈদের ছুটি বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের জন্য উত্তম মৌসুম, যার ধারাবাহিকতায় দেশীয় ট্যুর কোমপানিগুলো দেশ-বিদেশ ভ্রমণের নানান রকম প্যাকেজ অফার করে থাকে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশি পর্যটকরা ঈদে ভারত এবং সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমায় কেনা-কাটার জন্য বিধায় ভারতীয় দূতাবাসকে নিয়মিত ভিসা থেকে প্রায় ১.৫ থেকে ২ লক্ষ অধিক ভিসা ইস্যু করতে হয় ঈদ মৌসুমে। ২০০০ সালে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ পর্যটক ছিল প্রায় ৫ লক্ষ কিন্তু ২০১৭ সালে তা ৬৫-৭০ লক্ষে পৌঁছায়। ধারণা করা যাচ্ছে, ২০২১ সালের মধ্যে অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা ১ কোটিতে পৌঁছাবে। ডব্লিউটিটিসি সূত্রমতে, ১.৫ মিলিয়ন জনগোষ্ঠী সরাসরি ও ২.৩ মিলিয়ন জনগোষ্ঠী পরোক্ষভাবে এই শিল্পে কর্মরত।

বিশ্বায়নের যুগে কর্মব্যস্ত জীবনে বিনোদনের বিকল্প নেই। তাই ঈদ আরও আনন্দময় ও পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে বাংলাদেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণের সুযোগ বেড়েছে। ট্যুর অপারেটররা দেশ ও বিদেশ ভ্রমণের আকর্ষণীয় প্যাকেজ অফার করে থাকে। তন্মধ্যে মধ্যবিত্ত মানুষগুলোর প্রথম পছন্দ বাংলাদেশের কক্সবাজার, কুয়াকাটা, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, সিলেট, খাগড়াছড়ি ও কুমিল্লা। তাছাড়াও ভারতের কলকাতা, সিমলা, মানালি, নেপাল, ভুটান। উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষের পছন্দ থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দুবাই, মালয়েশিয়া, মিশর, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও অন্যান্য দেশ। ঈদের ছুটিতে যেহেতু ট্যুরিস্টদের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তাই বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে কার্যকর ‘পর্যটন-ব্যবস্থাপনা’ খুবই গুরুত্ব বহন করে। পর্যটকরা যেন নিরাপদে তাদের অবকাশ যাপন করতে পারে সে জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নানামুখী কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ট্যুরিস্ট স্পটে র্যাব পুলিশের অতিরিক্ত নজরদারি থাকে, যা ঈদ পর্যটনের জন্য আশাব্যঞ্জক।

ভ্রমণ মানুষের চিত্ত প্রসারিত করে নানাবিধ নেতিবাচক ভাবনা থেকে দূরে রাখে। দেশীয় পর্যটন বৃদ্ধির ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পাচ্ছে, মানুষের মধ্যে সমপ্রীতি আরও সুদৃঢ় হচ্ছে, সাংস্কৃতিক ভাবনা আরও বিকশিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে বেশ কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এই পর্যটনই হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি।

সর্বোপরি, ফেস্টিভাল ট্যুরিজমকে বিশেষ ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে আসা দরকার। দেশের পর্যটনখাত সম্ভাবনাময় একটি শিল্প। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও পর্যটকদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতার গুণগত মান নিশ্চিত করে পর্যটনখাতকে কাজে লাগিয়ে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: পর্যটন বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র:ইত্তেফাক

শেয়ার করুন