ঈদের ছুটিতে ফাঁকা শাবি ক্যাম্পাস

ছবি কৃতজ্ঞতা: ফয়সল খলিলুর রহমান

হাবিবুল হাসান, শাবি প্রতিনিধি :: ক্লাস,পরীক্ষা, আড্ডা, হই হুল্লোড়ে মুখরিত, বিভিন্ন সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডসহ ন্যায্য দাবি আদায়ে আন্দোলনে কম্পিত হওয়া দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ক্যাম্পাসটি এখন জনমানব শূণ্য প্রায়। ঈদের ছুটিতে বন্ধ হওয়ায় এমন চিত্র সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের।

ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পবিত্র ঈদুল আজহা, জন্মাষ্টমী ও সাপ্তাহিক ছুটিসহ ১৫ দিনের বন্ধ ঘোষণা করেছে। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আবাসিক হলগুলোকেও বন্ধ রাখার নির্দেশও দিয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩২০ একর জায়গাজুড়ে জনমানবশূন্য সবুজের বিচরণ। রাত্রী নামতেই মনে হয় এ যেন এক জনমানব শূন্য লোকালয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, ক্যাফেটেরিয়া, শহীদ মিনার, মুক্ত মঞ্চ, হ্যান্ডবল গ্রাউন্ড, শিক্ষা ভবন “ডি” এর ফুসকার আড্ডা, ফুডকোর্ট, আইআইসিটি ভবন, খাবারের পসরা সাজানো বিভিন্ন টঙ, কিলোরোড, চেতনা-৭১ এর পাদদেশ, ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের আড্ডার জন্য প্রচলিত ছোটো-বড় দোকানসহ বিভিন্ন স্থানে তরুণ-তরুণীদের আনাগোনায় মুখরিত থাকতো চির সুবজ এ ক্যাম্পাসটি। ক্যাম্পাসের সেই চির চেনা জায়গাগুলো এখন অচেনা রূপ নিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি ঘোষণা হলেও ফেইসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কল্যাণে সহপাঠীসহ বন্ধু-বান্ধব, সিনিয়র ও জুনিয়রদের মাঝে বেশি মিস করার সুযোগ অনেকটা কম। মুহুর্তের মধ্যেই জেনে যাওয়া যাবে হল এবং বিভাগের বন্ধুদের সর্বশেষ খবর। চাইলে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়ার পাশাপাশি আড্ডাও দেয়া যাবে ঘন্টার পর ঘন্টা।

ভার্চুয়াল জগৎ এর যোগাযোগের বাইরে সবুজে ঘেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩২০ একরকে মিস করছে এমন একজন বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তার ফেইসবুকে লিখেছেন “ছায়া সুনিবীড় শাবিপ্রবি যোজন দূরত্বের পথও‌ তোমার মায়াজাল ছিন্ন করতে পারেনি! নির্ঘুম রাতের ঘোর অন্ধকার ভেদ করা অচেনা আলোয় সমস্ত স্মৃতি গুলো নিয়ে তোমার বুকেই হারিয়ে যাই”।

ছুটি সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল এন্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাফায়েত ইসলাম বাপ্পী এর সাথে আলাপকালে বলেন ‘অনেক দিন পর এমন একটা ছুটি পাওয়া গেলো যেখানে ছুটি শেষ হলেই পরীক্ষার কোনো চাপ নেই যা অন্যান্যবার থাকে। টিউশনির বেতনও পেয়ে গেছি, একরাশ আবেগ নিয়ে বাড়ি এসেছি। আশা করি মা-বাবা, ভাই বোনদের সাথে এবারের ঈদের ছুটি ভালোই কাটবে।’

পরিসংখ্যান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া চৌধুরি বলেন ‘বন্ধ তো আমরা খুব বেশি একটা পাইনা; তবুও প্রতিটা বন্ধের ক্ষেত্রেই এমন একটা পর্যায় আসে যেখানে কোলাহলপূর্ণ, প্রাণবন্ত সবুজ ক্যাম্পাসকে অনেক অনেকখানি অনুভব করি। ওই পরিচিত মুখর নীড়ে ফিরবার একটা তাগাদা তখন হৃদয়ে আন্দোলিত হয়।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে দায়িত্বরত অশক চন্দ্র দাশ বলেন, ‘ক্যাম্পাসে যতদিন ছুটি চলে কাজের ভেতর অলস সময় পার করতে হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা যেমন ক্যাম্পাসকে আনন্দে মাতিয়ে রাখেন তেমনি তাদের না থাকার কারণে সবজায়গায় খালি খালি লাগে। সবাই আনন্দে ঈদের ছুটি কাটিয়ে আবার আমাদের কাছে ফিরে আসুক ঈশ্বরের কাছে এই প্রার্থনা করি।’

এদিকে ছুটিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আবাসিক হল বন্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় মুসলমান ধর্মের শিক্ষার্থীরা নিজ বাড়িতে চলে গেলেও বিপাকে পড়েছেন অন্যান্য ধর্মের শিক্ষার্থীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক সনাতন ধর্মালম্বী শিক্ষার্থী বলেন- ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল শিক্ষার্থীদের অধিকার সমান। এখানে ঈদ উপলক্ষে ছুটিতে মুসলমান ধর্মালম্বী শিক্ষার্থীরা বাড়িতে গেলেও প্রশাসন অন্য ধর্মালম্বীদের কথা চিন্তা না করেই আমাদের আশ্রয়স্থল হলগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। ঈদের ছুটির পর শুরু হবে দূর্গার পূজার ছুটি, আর এতো ঘনঘন পরিবহনে দূর-দূরান্তের যাতায়াত করা শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই কষ্টকর এবং ব্যয়বহুল।’

হল বন্ধের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ ইশফাকুল হোসাইন এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ চলাকালীন সময়ে অাবাসিক হলগুলো বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। আর তাই শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে হল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। তবে ছুটি শেষ হওয়ার একদিন আগেই শিক্ষার্থীদের জন্য সকল আবাসিক হল খুলে দেওয়া হবে।’

ঈদের ছুটিতে ফাঁকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা বিষয়ে পুলিশি টহল বিদ্যমান আছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়েরর নিকটবর্তী জালালাবাদ থানার অফিসার্স ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম স্বপন। তিনি জানান, ফাঁকা ক্যাম্পাসে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনারোধে ক্যাম্পাস এলাকায় বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

আগামী ০৩সেপ্টেম্বর ঈদের ছুটি শেষ করে খুলবে ক্যাম্পাস। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরতে শুরু করবে নতুন যান্ত্রিকতা সাথে আরেক নতুন প্রাণ। যে যার মত নাড়ীর মায়া কাটিয়ে ফিরতে শুরু করবে চিরচেনা ৩২০ একরে, আস্তে আস্তে আবার ডুবে যেতে হবে ক্লাস, অ্যাসাইনম্যান্ট ও পরীক্ষার মধ্যে। প্রতিবছর এভাবেই ঈদের ছুটি আসবেই ফাঁকা হবে ক্যাম্পাস, আর সবার মনের আঙিনায় তৈরি করে যাবে কিছু রোমাঞ্চকর স্মৃতির বন্ধন।

শেয়ার করুন