আমরাই খুনি বিশ্বাসঘাতক কাপুরুষ

পীর হাবিবুর রহমান

শোকের মাস আগস্ট এলে অজানা আশঙ্কায় অসংখ্য মানুষের মন যেমন অস্থির, চঞ্চল, অশান্ত ও শঙ্কিত হয়ে ওঠে, তেমনি বঙ্গবন্ধু-অন্তঃপ্রাণ মানুষের বুকের গভীরে গুমরে মরে কান্নার আওয়াজ। নানাভাবে আগস্ট ঘটনাবহুল বিষাদগ্রস্ত হলেও বাঙালি জাতির মহত্তম নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবার-পরিজনসহ যেভাবে বর্বরোচিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কলঙ্কজনক ইতিহাস রচিত হয়েছিল তা কার্যত এই জাতির জীবনে কেবল ট্র্যাজিক ঘটনাই নয়, এক বেদনাদায়ক, গ্লানি ও লজ্জার বিষাদকাব্য হয়ে আছে। যে বিষাদকাব্যের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন জাতি এতিমই হয়নি, আমরা খুনি বিশ্বাসঘাতক ও কাপুরুষতার তকমা কপালে তুলে নিয়েছিলাম। সেটি লজ্জা ও আত্মগ্লানিতে ডুবিয়ে রাখবে অনন্তকাল।

ঢাকা উত্তরের অকাল-প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের প্রিয়তমা পত্নী রুবানা হকের ডাকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে তাঁর স্বপ্নের নাগরিক টিভিতে একটি টকশোর উপস্থাপনা করছি সপ্তাহে দুই দিন। সেই টকশোতে সেদিন অতিথি ছিলেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম ও আধুনিক সাংবাদিকতার পথিকৃৎ নাঈমুল ইসলাম খান।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমের প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা ও হৃদয়নিসৃত ভালোবাসার নেপথ্যের কারণ হচ্ছে, তাঁর বীরত্বের প্রতি মুগ্ধ ও অভিভূত হওয়ায়। আমাদের কৈশোর-তারুণ্যকে তিনি আলোড়িত করেছিলেন স্বপ্নের নায়ক হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধে দেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ডাকে কাদেরিয়া বাহিনী গঠন করে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনাই করেননি, সম্মুখ সমরে একের পর আক্রমণ চালিয়ে টাইগার সিদ্দিকী হিসেবে দুনিয়ার কাছে তাঁর পরিচয় তুলে ধরেছিলেন। একজন বেসামরিক বীরযোদ্ধা হিসেবে একমাত্র তিনি বীরউত্তম খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন।

বাঘা সিদ্দিকী শুধু এই উপমহাদেশেই নয়, দেশে দুঃসময়ে আমার মতো অসংখ্য তরুণের বুকে এক বীর। পৃথিবীর মুক্তিকামী সাহসী বীরের প্রতিচ্ছবি হয়ে জায়গা করেছিলেন। দীর্ঘদেহী, পৌরুষদীপ্ত চেহারা, মাথায় টুপি, সামরিক কায়দায় যুদ্ধের পোশাকে তাঁর ছবির দিকে তাকালে কিউবার বিপ্লবী রাষ্ট্রনায়ক ফিদেল ক্যাস্ত্রোর অবয়ব ভেসে ওঠে। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমের প্রতি ক্ষমতালোভী, সুবিধাভোগী, অসৎ একদল মানুষের নানা কথা থাকলেও দেশের অগণিত মানুষই নয়, ভারতের বরেণ্য রাজনীতিবিদরাও তাঁর বীরত্বের কারণে সম্মান দিতে কার্পণ্য করেননি। অনেক মানুষের জীবনে অগ্নিপরীক্ষা দেওয়ার সাহস একবারও হয় না। কিন্তু কাদের সিদ্দিকী দুই দুইবার সেই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইতিহাসে জীবন্ত কিংবদন্তিই নয়, অমরত্বও পেয়েছেন। শত বছর পরও এই জনপদে অনাগত প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী এই সাহসী বীরকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণই নয়, সম্মান ও মর্যাদার আসন দিতে কার্পণ্য করবে না।

সেদিন টকশোতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও তাঁর সেই প্রতিরোধ যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে এই সময়ের অনুভূতি কী জানতে চাইলে কথায়-চেহারায় যে গভীর আবেগের ছায়া দেখেছি মনে হয়েছে, অনেক কষ্টে তিনি তাঁর আবেগকে সংবরণ করেছেন। বললেন, বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া নিজেকে প্রাণহীন, মূল্যহীন এতিম মনে হয়। বঙ্গবন্ধুই ছিলেন তাঁর জীবনের প্রথম ও শেষ প্রেম। তিনি আরও জানালেন, জাতীয় শোক দিবসে বিকালে ইতিহাসের ঠিকানা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুকন্যা ও তাঁর বড় বোন শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা হবে। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব সাইফুজ্জামান শেখর তাঁকে টেলিফোন করেছিলেন। প্রতিবারের মতো এবারও তিনি বিকাল ৪টা থেকে ৬টা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ভবনে থাকবেন। বোনদের সঙ্গে ভাইয়ের দেখা হবে সেদিন, এ জন্যই নয়, তিনি প্রতিবার এই সময়ে সেখানে নামাজ পড়েন, দোয়া-দরুদ পড়েন, মিলাদ-মাহফিলে অংশ নেন। টুঙ্গিপাড়ায় পিতার কবর জিয়ারত করতে যান।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের নীলনকশায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেই সেদিন হত্যা করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর আজীবন সংগ্রামের সাথী তাঁর প্রিয় ‘রেণু’ বা স্বাধীনতা-সংগ্রামী মানুষের পরম আশ্রয়ের ঠিকানা, কঠিন কঠিন দুঃসময়ে হালধরা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে। মুক্তিযোদ্ধা, ক্রীড়া সংগঠক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও ছাত্র রাজনীতির অনন্য সাধারণ সংগঠক শেখ কামালকে তাঁর সহোদর শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেলকে বুলেটে বুলেটে ঝাঁজরা করে দিয়েছিল খুনিরা। হাতের মেহেদির রং না শুকাতেই বঙ্গবন্ধুর পুত্রবধূদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ছোটভাই শেখ নাসেরসহ বাড়ির অনেককে।

ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, মুজিব বাহিনীর অন্যতম প্রধান, বাংলার বাণীর সম্পাদক ও যুবসমাজের নয়নের মণি শেখ ফজলুল হক মণি এবং তাঁর স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা আরজু মণিকে একই সময় খুন করেছে খুনিরা। বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি কৃষক নেতা ও মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাতকে তাঁর নাতি শিশু সুকান্তবাবুসহ হত্যা করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব কর্নেল জামিল তাঁকে রক্ষায় ছুটে এসে খুনিদের কাছে প্রাণ হারিয়েছেন।

জাতির জীবনের ঘটে যাওয়া সেই রজনীর ঘাতকরা ছিলেন সামরিক বাহিনীর একদল বিপদগামী সদস্য। যারা গোলাবিহীন ট্যাংক আর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নিষ্ঠুর খুনির চেহারায় আবির্ভূত হয়েছিল। শিশুর আকুতি, প্রাণভিক্ষা, নববধূদের অসহায়ত্ব তাদের অস্ত্রকে রুখতে পারেনি। আর এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে একদল ঘাতক সেনাসদস্যের সঙ্গে ক্ষমতার উচ্চাভিলাষ থেকে হাত মিলিয়েছিলেন এ দেশের প্রাসাদ রাজনীতির মীরজাফর-খ্যাত খন্দকার মোশতাক আহমেদ। বন্ধু হিসেবে বঙ্গবন্ধু যাঁকে উদার মন নিয়ে পাশে রেখেছিলেন, আশ্রয় দিয়েছিলেন, বিশ্বাস করেছিলেন, সেই বিশ্বাসঘাতক খুনি মোশতাক খুনি ঘাতক চক্রের অস্ত্রের ওপর ভর করে সংবিধান লঙ্ঘন করে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আজীবনের রাজনীতির সহচর যারা তাঁর হাত ধরে জাতীয় রাজনীতিতে অভিষিক্তই হননি, স্বাধীনতা-সংগ্রামী হিসেবে ইতিহাসে নামই লেখাননি, মন্ত্রীও হয়েছিলেন। তাঁরা কেউ আনন্দে, কেউবা ভয়ে কাপুরুষের মতো রক্তের ওপর দিয়ে মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন।

যে নেতা তিল তিল শ্রম, মেধা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজের জীবন-যৌবনকে উৎসর্গ করে আরাম-আয়েশ ভুলে, স্ত্রী-সন্তানদের কথা চিন্তা না করে, একের পর এক মামলা, জেলের পর জেল খেটে ফাঁসির মঞ্চে গিয়েও অকুতোভয় থেকেছেন, পাকিস্তানি জল্লাদ ইয়াহিয়া খান কবর খুঁড়ে সামরিক আদালতে ফাঁসির রায় দিয়ে নয় মাস পৃথিবীর আলো থেকে দূরে অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে রেখেও হত্যা করতে পারেনি। সেই বঙ্গবন্ধুকে সেদিন হত্যা করেছিল, তাঁর সন্তানতুল্য বিশ্বস্ত একদল সেনা সদস্য। আর তাঁর রক্তাক্ত বুলেটবিদ্ধ নিথর দেহ ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে খুনিদের সশস্ত্র প্রহরায় অনাদর-অবহেলায় ফেলে রেখে তাঁর রাজনৈতিক সতীর্থরা শপথ নিয়ে বলেছিলেন, ওরা না কি খুনি নয়, সূর্যসন্তান! খুনিদের দাপটের কাছে সেনাবাহনীর প্রধান জেনারেল সফিউল্লাহ, নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল মুশাররফ হুসাইন খান ও বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার কাপুরুষিত ভূমিকাই রাখেননি, খুনি সরকারের প্রতি আনুগত্যও প্রকাশ করেছিলেন। অথচ বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁরা এই মহান নেতার কাছ থেকে বীরউত্তম খেতাব পেয়েছিলেন। সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্ব পেয়েছিলেন। সেদিন সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানও খুনিচক্রের তৎপরতা সম্পর্কে অবহিত হয়েও নীরব থেকেছেন। জেনারেল খালেদ মোশাররফও কোনো ভূমিকা রাখেননি, আনুগত্য প্রকাশ ছাড়া। যদিও পরবর্তীতে ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাঁর অনুগত সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে খুনি মোশতাক সরকারকে উত্খাত করেছিলেন। কিন্তু ৭ নভেম্বর ক্ষমতার লড়াই পাল্টা লড়াইয়ে জাসদ গণবাহিনী কর্নেল তাহের বীরউত্তমের নেতৃত্বে বিপ্লবের নামে আঘাত হানলে খালেদ মোশাররফসহ মুক্তিযুদ্ধের বীরসেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে নিহত হন। আর ক্ষমতায় আবির্ভূত হন সেনাশাসক জিয়াউর রহমান। ক্ষমতা হারাবার আগে রাতের গভীরে মোশতাক বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পাঠিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী চার জাতীয় নেতা, যাঁরা বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে দক্ষতার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন, তাঁদের নৃশংসভাবে হত্যা করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যে চিত্রপট ইতিহাসের ক্যানভাসে উঠে আসে তাতে দেখা যায়, সে দিন জাতির মহান নেতাকে পরিবার-পরিজনসহ একদল খুনি নির্মমভাবে যেমন হত্যা করেছে, তেমনি সামরিক নেতৃত্বই বিশ্বাসঘাতকতা, কাপুরুষতার পরিচয় দেয়নি, রাজনৈতিক নেতৃত্বও প্রতিরোধের ডাক দিতে ব্যর্থ হয়েছে। রক্ষীবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে।

দেশজুড়ে আওয়ামী লীগ একচ্ছত্র দাপট রাখলেও, সর্বশেষ বাকশালে মস্কোপন্থি বামপন্থিরা ক্ষমতার অভিষেকে বিলীন হলেও তারাও কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। পরে সেনাশাসক জিয়ার খাল কাটার সঙ্গী হয়েছেন। আওয়ামী লীগের যুব নেতারাও দিশাহারা হয়েছেন। সেদিন আমরা শুধু পিতৃহারাই হইনি, খুনি, বিশ্বাসঘাতক ও কাপুরুষ জাতি হিসেবেও ইতিহাসে চিহ্নিত হয়েছি।

আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা-কর্মী কারা নির্যাতন ভোগ করেছেন। না হয় দেশান্তরী হয়েছেন। দেশের মানুষ স্তব্ধ হয়ে গেছে। শোকের আঘাতে হতবিহ্বল হয়েছে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েছে। ঘাতকরা সেদিন মৃত মুজিবকেও ভয় পেয়েছে। সশস্ত্র প্রহরায় হেলিকপ্টারে টুঙ্গিপাড়ায় পাঠিয়ে তড়িঘড়ি জানাজা পড়িয়ে মহানায়কের মরদেহ সমাহিত করেছে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি সেদিন সব শক্তি হয় বিশ্বাসঘাতকতা, না হয় কাপুরুষতা অথবা নেতৃত্বের ব্যর্থতা দেখালেও একজন মানুষ যিনি নিজেকে অন্তর দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সন্তান হিসেবে বিশ্বাস করেন, সেই বাঘা সিদ্দিকী প্রতিরোধ যুদ্ধের ডাক দিয়ে বসেন। তাঁর সঙ্গে কয়েক হাজার বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অন্তঃপ্রাণ টগবগে তরুণ যোগ দেন। দিনের পর দিন খেয়ে না খেয়ে যুদ্ধই করেননি, এক সময় ভারতে নির্বাসিত হন। ১৯৯১ সাল পর্যন্ত কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমকে সেই কষ্টের নির্বাসিত জীবন ভোগ করতে হয়েছে। পিতা হারা সন্তান মাংস খাননি! একাত্তরের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ এই বীর পঁচাত্তরে পিতৃহত্যার প্রতিশোধে ফের জ্বলে ওঠে দ্বিতীয়বার অগ্নিপরীক্ষা দেন। এই দুদফার বীরত্বই তাঁর প্রতি আমার মতো অনেককেই নত করেছে। এই বীর পঁচাত্তর-উত্তর বঙ্গবন্ধুর আদর্শে সারা দেশের নেতা-কর্মী যখন আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির পাঠ নিয়ে আদর্শিক কর্মী হিসেবে সংগঠিত হয়েছিলেন, তখন পথ আগলে ছিল সেনাশাসক জেনারল জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের নিষ্ঠুরতা, বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী উগ্রপন্থি ও অতিবিপ্লবী রাজনৈতিক শক্তি। সময়ের বিবর্তনের ধারায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাসকে বিকৃতই করা হয়নি, বঙ্গবন্ধুর নামটি রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে নিষিদ্ধই করা হয়নি, তাঁর হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ রুদ্ধ করেই রাখা হয়নি, খুনিদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয়েছিল। খুনিদের কূটনৈতিক চাকরি দেওয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ শুনলে অনেকেই নিরাপদ দূরত্বে থাকতেন। আমার সরল মনের হিসাবে ভেবে পাই না; বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেই সময় যদি দেশের বাইরে না থাকতেন, অলৌকিকভাবে বেঁচে না যেতেন, তাহলে কী হতো?

বঙ্গবন্ধুকন্যা সেদিন বেঁচে না থাকলে আওয়ামী লীগের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ফিরে না এলে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সংগ্রামের পথ হেঁটে ক্ষমতায় আসত কি না? শেখ হাসিনা বেঁচে না থাকলে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার হতো কি না? বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর আশির দশকে খুনিরা রাজপথে সশস্ত্র উল্লাস করেছে। ধানমন্ডির বাসভবনে গুলিবর্ষণ করেছে। মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে খুনিচক্রের দল ফ্রিডম পার্টির সেসব সন্ত্রাসী এখন কোথায়? খুনি মোশতাকের দল করা তার দোসররা এখন কে কোথায়? অনেক প্রশ্নের উত্তর পাই না। যারা জীবিত বঙ্গবন্ধুর সামনে তাঁর উদার গণতান্ত্রিক পিতৃহৃদয়ের সামনে দাঁড়িয়ে চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে, পাকিস্তানিরা যে ভাষায় কথা বলতে পারেনি, তার চেয়ে জঘন্য ভাষায় আক্রমণ করেছে, তারা পরবর্তীতে বারবার বঙ্গবন্ধুকন্যার সরকারে মন্ত্রী হলেও বিশ্বাসঘাতক কাপুরুষদের কুিসত চেহারার সামনে দিয়ে বীরত্বের বেশে যে বীর পিতৃহত্যার প্রতিশোধে প্রতিরোধ যুদ্ধ করেছে, সেই বাঘা সিদ্দিকী মন্ত্রী হওয়া দূরে থাক, আওয়ামী লীগই করতে পারল না কেন? কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে জাতীয় মুক্তিবাহিনীতে যুক্ত হয়ে যারা শহীদ হয়েছে তারা কেন কোনো স্বীকৃত পেল না? সতীর্থদের হারিয়ে গুলিবিদ্ধ বিশ্বজিৎ নন্দীর ফাঁসির রায় হলেও শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর কারণে সেটি রহিত হয়েছিল। আর তাঁর কারা মুক্তি হয়েছিল।

আজ যতদূর চোখ যায়, ততদূর আওয়ামী লীগ সরকারের ছায়ায় ফুলে-ফেঁপে বেড়ে ওঠা নাদুস-নুদুস সুবিধাভাগীদের মুখে আওয়ামী লীগ বন্দনা শোনা গেলেও বিশ্বজিৎ নন্দীরা পথে পথে ঘোরে কেন? পঁচাত্তর-উত্তর বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে, চিন্তা-চেতনাকে হৃদয় দিয়ে লালন করে যারা ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ করেছিল মানুষের কল্যাণে, নির্লোভ আদর্শিক পথে দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হয়ে উঠেছিল, সংগঠক ও নেতা হিসেবে সারা দেশে উদ্ভাসিত হয়েছিল, তারা আজ আওয়ামী লীগ বা সরকারের দায়িত্বশীল জায়গায় নেই কেন? তারা কেন ছিটকে পড়েছে? বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্র সংসদে বিজয়ী ছাত্রলীগের নেতারা যখন সেই অন্ধকার সময়ে গভীর শ্রদ্ধায় বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করেছে, তখন যেসব অতিবাম, অতি উগ্র ও একদল মস্কোপন্থি এক কাতারে দাঁড়িয়ে অভিষেক পণ্ড করেছে, বঙ্গবন্ধুর ছবি নামিয়েছে তারা একালে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব পেয়ে মুজিব বন্দনা করলেও আওয়ামী লীগের সেই দুঃসময়ের পথের সাথীরা অবহেলা-অনাদরে, অভিমানে নির্বাসিত কেন? পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা জাতীয় শোক দিবস ঘিরে ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে সেই কালরাতের শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় কাঙালি ভোজ ও যে মিলাদ মাহফিল করতেন তাতে হৃদয় মন যেন উজাড় করা ছিল। একালে বানের জলের মতো ক্ষমতা-নির্ভর আওয়ামী লীগে সুযোগ-সুবিধা ষোলো আনা উসুল করা হাইব্রিডরা ভেসে বেড়ায়, কাঙালি ভোজের নামে অর্থ খরচের প্রতিযোগিতায় নিমজ্জিত হয়ে কোথাও কোথাও শোককে যেন উৎসবে পরিণত করেছে!

কারও মনে আঘাত দেওয়ার জন্য নয়, কাউকে ছোট করার জন্য নয়, আত্মসমালোচনা ও আত্মজিজ্ঞাসার কথা বলছি। জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর দলের গরিব সংগঠককে মেধা ও যোগ্যতার বিচারে তুলে আনতেন রাজনীতিতে। এমপি-মন্ত্রী বানাতেন। তাঁরাও নির্লোভ সৎ রাজনীতির আদর্শের পরীক্ষা দিয়ে পথ হাঁটতেন। একালে রাজনীতিতে কি সেই বঙ্গবন্ধুর নিরাবরণ সাদামাটা জীবনের গণমুখী রাজনীতি আছে?

পঁচাত্তরের পর ২০০১ সালের ভোট শেষে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আরেক দফা দুর্যোগ নেমেছিল। পিতার মতো সেই দুঃসময়ে শেখ হাসিনাই নেতা-কর্মীদের পরম আশ্রয় দিয়েছেন। সেই দুঃসময়ে এত আওয়ামী লীগ দেশজুড়ে দেখা যায়নি। কিন্তু সেই দুঃসময়ে শেখ হাসিনার পাশে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অবিচল থাকা নেতা-কর্মী, যারা গ্রেনেড বোমা নির্যাতনকে উপেক্ষা করেছিলেন, তাদের কতটা মূল্যায়ন হয়েছে সেই প্রশ্ন থেকে যায়। ওয়ান-ইলেভেনের সময় যারা দল ছাড়েননি, প্রয়োজনে দেশ ছেড়েছেন, ঘরবাড়ি ছেড়েছেন, আনুগত্যের পরীক্ষা দিয়েছেন ঝুঁকি নিয়ে তারা কতটা পুুরস্কৃত হয়েছেন সেই প্রশ্ন এসে যায়।

ভারতের পার্লামেন্ট ভবনের আঙিনায় তাদের জাতির জনক বা বাপুজিখ্যাত মহাত্মা গান্ধীর ভাস্কর্য শোভা পায়। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মাঝে মহাত্মা গান্ধীর ছবি শোভা পায়। আমরা দুনিয়া কাঁপানো বিশ্বনন্দিত আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সেই মর্যাদা, সেই সম্মান রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করতে পারিনি কেন? বঙ্গবন্ধুর পিতৃহৃদয়ের উদার গণতান্ত্রিক চেহারা মত ও পথের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সামাজিক সম্পর্কের অনন্যসাধারণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির উত্তরাধিকারিত্ব বহন করতে পারিনি কেন? মাঝে মাঝে মনে হয়, পিতার সঙ্গে এখনো আমাদের বিশ্বাসঘাতকতা, কাপুরুষতা আর প্রতিহিংসা চলছে। আর চলছে বলেই এখনো জাতীয় শোক দিবস পালন না করে একটি বড় দলের নেত্রীর জন্ম দিন বানিয়ে কী কুিসতভাবে বড় কেক কাটি, উল্লাস করি! একদিকে মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতার কথা বলি, দেশপ্রেমের কথা বলি। অন্যদিকে নির্লজ্জের মতো পিতৃত্বকে অস্বীকার করি। আমরা এখনো পিতার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করি বলে যে কোনো অন্যায়, দুর্নীতি, জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস যেমন হারিয়ে ফেলি, তেমনি যখন যারা ক্ষমতায় তারাই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন-নির্যাতনের পথে স্তব্ধ করে দিতে চেষ্টা করি। আমরা এখনো তাঁর প্রতি, তাঁর মহান আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা রাখি না বলে, বিশ্বাসঘাতকতা করি বলে রাজনীতিকে প্রকৃত নেতা-কর্মীদের হাতে রাখি না। লুটেরা সুবিধাভোগীদের হাতে তুলে দিই।

যে মহান মুজিব দুই সুপার পাওয়ারের ঠাণ্ডা লড়াইয়ের যুগে বিশ্বনন্দিত নেতা হিসেবে কিংবদন্তির মতো বলেছিলেন, ‘বিশ্ব আজ দুই শিবিরে বিভক্ত—শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ সেখানে তাঁর নির্মিত রাষ্ট্র শোষকের স্বার্থ রক্ষা করে। একদিকে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা পিতার অমিত সাহস ও দেশপ্রেমের শক্তিকে লালন করে একুশ শতকের বাংলাদেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে যাচ্ছেন, অন্যদিকে পিতার আদেশ অমান্য করে একদল লুটেরা সব খাতে লুটপাট করে নিয়ে যায়! বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবদ্দশায় একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বারবার আকুতি জানিয়েছেন, ‘বাবারা সোনারা বলে। দেশপ্রেমের মন্ত্রে মানুষের সেবার মনোভাবের তাগিদ দিয়ে, সাধারণ জনগণের প্রতি গভীর বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে বলেছেন, আমার কৃষক, আমার শ্রমিক, আমার জনগণ চোরাকারবারি করে না, ঘুষ-দুর্নীতি করে না। এসব করে শিক্ষিতরা। বিদেশের এজেন্ট আমার সাধারণ জনগণ হয় না। এজেন্ট হয় স্যুট-টাই পরা ইংরেজি জানা শিক্ষিতরা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি তাঁর চিন্তা ও চেতনার প্রতি আমরা বিশ্বাসঘাতকতার রাজনীতি করি বলে, একদিকে দেশপ্রেম ও জনগণের শক্তির কথা বলি, অন্যদিকে ক্ষমতার লোভে নিজের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে বিদেশিদের কাছে ধরনা দিই। জনগণের সুখ-দুঃখ, আবেগ-অনুভূতিকে লালন করি না। পঁচাত্তর সালের সেই ১৫ আগস্ট আমরা জাতির জনকের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলাম। তাঁর দেহকে আমরা হত্যা করেছিলাম। এত বছর পর দেশের মানুষের ভাগ্য বদল হলেও অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেও আমরা নিয়ত তাঁর আদর্শকে হত্যা করে চলেছি। সেদিন তাঁর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলাম। এখন আমরা তাঁর আদর্শের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করছি। আর করছি বলেই, দেশপ্রেমের নামে আমরা নিজের প্রেমে মগ্ন হয়েছি। মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের চেয়ে নিজের ভাগ্য উন্নয়নে, নিজের বিত্ত-বৈভব ক্ষমতা ও ভোগ বিলাসে মত্ত হয়েছি। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একটি দুর্নীতি মুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই পারে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান ও আস্থা বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার অগ্নিপরীক্ষা। সম্প্রতি শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্র মেরামতের স্লোগানতুলে ন্যায় বিচার চেয়ে কার্যত বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকারিত্বই বহন করেছে। তাঁর আদর্শকেই তুলে ধরেছে। বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশ, আমরাই বাংলাদেশ বলতে চেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে মানবিক রাষ্ট্রের তাগিদ দিয়েছে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

শেয়ার করুন