আনন্দ আয়োজনে মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির তৃতীয় সমাবর্তন সম্পন্ন

সিলেটের সকাল ডেস্ক :: দেশবরেণ্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে, সহস্রাধিক প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলার মধ্য দিয়ে সিলেটের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ৩য় সমাবর্তন সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার দিনভর সিলেট শহরতলির বটেশ্বরস্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসে এই সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। সমাবর্তনে আট শিক্ষার্থীকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়।

সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর মো. আব্দুল হামিদের প্রতিনিধি হিসেবে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ড. তৌফিক রহমান চৌধুরীর সভাপতিত্বে সমাবর্তন বক্তা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক একুশে পদকপ্রাপ্ত ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান।

মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ ফজলুর রব তানভীরের সঞ্চালনায় সমাবর্তনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সালেহ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি তার পথ চলার দেড় দশক পূর্ণ করেছে। আমাদের এই পথ চলার গল্প আশাবাদ, অর্জন ও কঠোর সংগ্রামের গল্প। এই পথ চলায় আমরা সব সময় সচেতন ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার চেষ্টা করেছি।’

সমাবর্তন বক্তার বক্তব্যে অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের প্রান্তে এসে সমাবর্তন অনুষ্ঠানের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত বিরতিতে সমাবর্তন আয়োজন করে আসার জন্য ধন্যবাদ।’

তিনি বলেন, ‘আমার চোখে তরুণরা সম্পদ, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যত। কিন্তু আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের সক্রিয়তার ক্ষেত্রগুলি এখনও যথাযথভাবে তৈরি করতে পারেনি। যে শিক্ষা আমরা তাদেরকে দিচ্ছি, তা দিয়ে চাকরির বাজারে তাদের অনেকে হয়তো একটা জায়গা করে নিতে পারে, কিন্তু তারা আলোকপ্রাপ্ত স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেশ পরিচালনার এবং ভবিষ্যতের কা-ারি হওয়ার জায়গায় পৌঁছাতে পারছে না। এজন্য তরুণদের মধ্যে হতাশা অনেক। হতাশা কাটানোর জন্য মাদকের কাছে, উগ্রবাদী মতাদর্শের এবং রাজনৈতিক বিভেদপন্থা ও অসাধুপনার হাতে নিজেদের তুলে দিলে তা হবে ভয়ানক আত্মপ্রতারণা। একজন হতাশ তরুণের পাশে যখন পরিবার দাঁড়ায়, শিক্ষকরা দাঁড়ান, তখন তারা আস্থা খুঁজে পায়। এই আস্থার অন্য নাম নিজের শক্তিতে নিজের পায়ে দাঁড়ানো।’

যুক্তরাষ্ট্রের লেখক, দার্শনিক ও প্রকৃতিবিদ র‌্যালফ ওয়াল্ডো এমার্সনের একটি অতিভাষণের কথা উল্লেখ করে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রত্যেকে যদি সত্যিকার অর্থে জ্ঞানসাধক হয়, তাহলে শিক্ষার উদ্দেশ্যগুলো তারা পূরণ করতে পারবে। শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত একজন মানুষকে পূর্ণতা দেয়া এবং সক্রিয় চিন্তার মানুষ তৈরি করা।’
সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে সমাবর্তনে ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

সমাবর্তনে সহ¯্রাধিক শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি প্রদান করেন রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর মো. আব্দুল হামিদের প্রতিনিধি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।

সভাপতির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি প্রথম থেকেই ্কটি সুষ্ঠুধারার বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হয়েছে। এর উদ্যোক্তা ও ট্রাস্টি বোর্ড কোনো মুনাফার উদ্দেশ্যে নয়, শিক্ষায় অবদান রাখার লক্ষ্য নিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিচালনা ও অগ্রসর করছেন। তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্যোগ খুবই প্রশংসনীয়।’

গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের অনেকগুলো ধাপ পার হয়ে আজকের এ সমাবর্তনে যোগ দেয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে হয়েছে। নিজ মেধা, শ্রম ও প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আপনারা তা অর্জন করেছেন। যে জ্ঞান আপনারা অর্জন করলেন, তা যেন ছড়িয়ে দিতে পারেন সমাজের কম-আলোকিত মানুষের মাঝে, আপনাদের প্রজ্ঞা ও মেধা যেন সাধারণ মানুষের প্রাণে সাহস জোগায়, কর্মক্ষেত্রে ও সমাজে সূচিত করে ইতিবাচক পরিবর্তন।’

শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ আরও বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার মূল লক্ষ্য নতুন প্রজন্মকে আধুনিক বাংলাদেশের নির্মাতা হিসেবে প্রস্তুত করা। প্রচলতি গতানুগতিক শিক্ষায় তা সম্ভব নয়। বর্তমান যুগের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ আধুনিক বিশ্বমানের শিক্ষা ও জ্ঞান প্রযুক্তিতে দক্ষ, নৈতিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এক পরিপূর্ণ মানুষ তৈরি করা আমাদের প্রধান লক্ষ্য। তারা আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলবে এবং ভবিষ্যতে নেতৃত্বে দিতে সক্ষম হবে।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি নিজেদের স্থায়ী ক্যাম্পাসে ৩য় সমাবর্তন আয়োজন করেছে, তাদেরকে ধন্যবাদ। ৪র্থ সমাবর্তনে এই ক্যাম্পাস পূর্ণাঙ্গ রূপ ধারণ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ শিক্ষার বিস্তারে উন্নয়নশীল দেশের জন্য অনুসরণীয়। এখন প্রয়োজন উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করা। মঞ্জুরী কমিশন সে চেষ্টাই করছে। নিকট ভবিষ্যতে এর সুফল দেখা যাবে।’

সমাবর্তনে সভাপতির বক্তব্যে মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ড. তৌফিক রহমান চৌধুরী বলেন, ‘সোনার বাংলা গড়তে সোনার মানুষ চাই। সেই সোনার মানুষ, মানবতাবোধসম্পন্ন, ন্যায়পরায়ণ ও দেশপ্রেমিক জনশক্তি তৈরির মানসেই মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠা। এই অভিষ্ট সামনে রেখে সরকারের নিয়মনীতির নিরিখে আমরা আমাদের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে মহান মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার এমন একটি গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছি, যেখানে বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিই প্রধান বিবেচ্য।’

অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও অধ্যাপক আব্দুল মান্নানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে স্মারক প্রদান করা হয়। শিক্ষামন্ত্রীও বিশ্ববিদ্যালয়কে স্মারক প্রদান করেন। সমাবর্তনে বিভিন্ন বিভাগের সর্বোচ্চ সিজিপিএপ্রাপ্ত আট শিক্ষার্থীকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। এই শিক্ষার্থীরা হলেন- নেওয়াজ আহমেদ চৌধুরী, ফাহমিদা আর্জু মৌ, রায়হানুল আম্বিয়া, জেসি সাহা, মোছাম্মৎ লিবার্টি হাসান, তাসনিম মৌরী, সানজিদা বেগম ও রহিমা তালুকদার। সমাবর্তনে ভ্যালিডিকটোরিয়ান ভাষণ দেন স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত সানজিদা বেগম।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ভাইস চেয়ারম্যান তানভীর এমও রহমান চৌধুরী, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শিব প্রসাদ সেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, সেনাবাহিনীর ১৭ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল এস এম শামীমুজ্জামান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কায়সার মালিক, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম কামাল, কর্ণেল এস এম বাহা উদ্দিন (কর্ণেল জিএস, ডিজিএফআই), র‌্যাব-৯ এর সিও লে. কর্ণেল আজাদ, সিলেট ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপাল ক্যাপ্টেন এম মাকসুদ আলম, সাবেক সাংসদ সৈয়দা জেবুন্নেছা হক, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক এডভোকেট নিজাম উদ্দিন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য চৌধুরী মুফাদ আহমেদ, বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য মুহিতুল বারী রহমান, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বদরুল ইসলাম শোয়েব, পার্কভিউ হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. এম এ হাই উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সুধী সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানের শুরুতে শোভাযাত্রা বের করা হয়। পরে জাতীয় সংগীত পরিবেশন শেষে পবিত্র কোরআন ও গীতা পাঠ করা হয়। এরপর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয়। এসময় বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্ট নিহত তাঁর পরিবারের সকল সদস্যের রুহের মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করেন হাফিজ ইসমাইল হোসেন। সমাবর্তন ঘিরে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস ছিল বাঁধভাঙা। স্বজনদের সাথে নিয়ে সমাবর্তনে আসা প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সুখস্মৃতিগুলোর মধ্যে যেন হারিয়ে যান। আবার কোনোও আয়োজনে দেখা হওয়ার প্রত্যাশায় শেষবিকেলে বাড়ি ফিরেন তারা।

শেয়ার করুন