সুন্দরবনের সম্ভাবনাময় ব্যবহার: বিকল্প ভাবনা

ক্যাপ্টেন শামস উজ জামান

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে কমবেশি ছয় হাজার বর্গ কিমি স্থান জুড়ে বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবন অবস্থিত। বাকি চার হাজার বর্গ কিমি অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। পূর্বে হরিণঘাটা নদী এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব সীমানা পর্যন্ত বাংলাদেশ অংশের জঙ্গলে সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, ছইলা, পশুর ইত্যাদি গাছ সমৃদ্ধ জঙ্গলে আনুমানিক সাড়ে চারশ’ বাঘ, এক থেকে দেড় লক্ষ হরিণ সহ ২০-২৫ হাজার শুকর এবং হাজার পঞ্চাশেক বানর বাস করে, সঙ্গে শ’তিনেক প্রজাতির মাছ ও পাখি। (সূত্র: সুন্দরবনের করমজলে অবস্থিত ডিসপ্লে বোর্ড থেকে নেওয়া)

আমার জানামতে, অনেক বছর ধরে সুন্দরবনে কাঠকাটা, মাছধরা, শিকার করা প্রায় বন্ধ রয়েছে। তারপরও এ বনটির অবস্থা ভালো বলা যাবে না। সম্ভবত সিডর, আইলা সহ অতীতের বড় বড় ঝড়-জলোচ্ছ্বাস এবং নদীতে পানির লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া সহ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে এবং হচ্ছে।

১৯৯৭ সালে ‘ইউনেস্কো’ সুন্দরবনকে ‘বিশ্ব-ঐতিহ্য’ হিসাবে মেনে নেবার পর, পৃথিবীব্যাপী সুন্দরবনের পরিচিতি অনেক বেড়ে গেলেও বস্তুত এ স্থানটি আজও গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠেনি। পর্যটনের এ বন্ধ্যাত্ম কাটিয়ে ওঠার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি।

প্রাণী বা গাছের পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে সারা বিশ্বে প্রাণিকুল বা গাছগাছালি কমিয়ে রাখা হয়। সুন্দরবনে, বিশেষ করে হরিণের ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থাটি চালু নেই। একারণে, অনেক ক্ষেত্রেই, সংখ্যা বেড়ে গিয়ে হরিণের খাদ্যাভাব হয়। তাছাড়া, চিত্রা হরিণ কোনো ‘বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী’ (endangered species) নয়। কাজেই নদী-খালে ব্যাপৃত, পৃথিবীর সব থেকে বড় ব-দ্বীপপুঞ্জের, দু’একটিকে বেছে নিয়ে সেখানে নির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে সৌখিন শিকারিদের হরিণ শিকারের ব্যবস্থা করে দিলে, হরিণের খাদ্যাভাব দূর হওয়া সহ, বন বিভাগের একটি বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা হবে। আমেরিকা, কানাডাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ ব্যবস্থা চালু আছে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এমন ব্যবস্থা কার্যকর করা হলে হরিণসহ জঙ্গল নিধন হয়ে যায় কিনা। আমার মনে হয়, সেরকম কিছু হবে না। এমনিতেই ফরেষ্ট ডিপার্টমেন্ট, পুলিশ এবং কোষ্ট গার্ডের ‘বাজচোখ’ এড়িয়ে মানুষ আপাতত সুন্দরবনের তেমন কোনো ক্ষতি করতে পারছে বলে মনে হয় না। জঙ্গল থেকে কাঠ কাটাও একদম বন্ধ করা ঠিক নয়। ঘন বন কেটে, গাছ পাতলা করে দিলে অন্য গাছের বেড়ে ওঠা সহজ হবে।

সর্বপরি, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের একমাত্র এয়ারপোর্ট যশোর। বেশ ক’বছর আগে খুলনা-মোংলা বন্দরের মাঝামাঝি জায়গায় ‘ফয়লা’ নামক স্থানে একটি নতুন এয়ারপোর্ট করার জন্য স্থান নির্দিষ্টকরণ হয়েও কাজটি থেমে আছে। এ কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করা হলে এ অঞ্চলের মানুষ যেমন উপকার পাবে, তেমনি সুন্দরবনে ভ্রমণেচ্ছুক যাত্রীদেরও সুবিধা হবে। উপরন্তু পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার জন্য এ এয়ারপোর্টের কাছাকাছি অথবা মোংলা বন্দরের নিকটে কিছু জায়গা নির্দিষ্ট করে দিলে ভবিষ্যতে ব্যক্তিমালিকানায় এসব স্থানে হোটেল-মোটেল গড়ে উঠতে পারবে।

লেখক: মাস্টার মেরিনার

শেয়ার করুন