মাদকের বহুমাত্রিক ক্ষতি রোধে আরো উদ্যোগ প্রয়োজন

ড. মো. নাছিম আখতার

দেশ আজ মাদকের ভয়াবহ ছোবলে জর্জরিত। দেশের ৭০ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। মাদকাসক্ত মানুষ কেউ হয়তো আমাদের ভাই, কেউ বোন, আবার কেউ হয়তো সন্তান। মিয়ানমার থেকে আগত ইয়াবার প্রকোপ আমাদের শহর থেকে গ্রামে পৌঁছেছে। তরুণসমাজ আজ মাদকের বিষবাষ্পে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এই মাদক আমাদের সমাজ বা পারিবারিক জীবনে যে ক্ষতি সাধন করছে, তার চুলচেরা বিশ্লেষণে দেশের সব বিবেকবান মানুষই উৎকণ্ঠিত ও আতঙ্কিত হবেন। মাদক জনবল, মনোবল ও মেধা ধ্বংসের সর্বোত্কৃষ্ট নিয়ামক। স্বাস্থ্য, জাতীয় উৎপাদন, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা বিনষ্টে মাদকের জুড়ি মেলা ভার।

মানুষের জীবনে সফলতা বা প্রতিষ্ঠা লাভের গুণাবলি হলো—ধৈর্য, আশা ও অধ্যবসায়। মাদক সেবন মানুষের জীবনের সফলতার এই জাদুকরী গুণগুলো সম্পূর্ণরূপে হরণ করে। মাদকসেবী মানুষ হয়ে ওঠে অস্থির—কোনো কিছুতেই ধৈর্য থাকে না, অস্বাভাবিক বদমেজাজি হয়ে ওঠে। তারা যেকোনো হটকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কর্মকাণ্ডে হয়ে ওঠে পারদর্শী। মানুষ যখন তার এই তিনটি গুণ হারায়, তখন সে আর মানুষ থাকে না। পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদের শিরোনাম—‘মেহেরপুরে মাদকসেবীর কোপে যুবক আহত’, ‘স্ত্রীকে রাস্তায় ডেকে এনে গলা কেটে হত্যা করল মাদকাসক্ত স্বামী’, ‘নেশার টাকা না পেয়ে স্ত্রীর কান কর্তন’, ‘মাদকাসক্ত বাবার হাতে ছেলে খুন’। সংবাদগুলো আমাদের যারপরনাই ব্যথিত করে।

মাদকাসক্ত মানুষ নেশা করতে এতটাই উদগ্রীব থাকে যে তার হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়। এসব মানুষকে মাদক সেবনের টাকা দেওয়ার মাধ্যমে খুন, চাঁদাবাজি, রাহাজানি যেকোনো কিছু করানো সম্ভব। আর এই সুযোগটা নেয় অসাধু মহল। নানা অবৈধ কর্মকাণ্ডে এই মাদকসেবীদের কাজে লাগিয়ে তারা বিত্তবৈভবের মালিক হয়, কিন্তু সমাজ হয় অশান্ত ও বসবাসের অনুপযোগী। অতীতে দেখা গেছে হরতালের সময় যানবাহনে আগুন লাগিয়ে সাধারণ মানুষ পোড়ানোর মতো কর্মকাণ্ডও মাদকাসক্ত লোকের মাধ্যমে করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ভাং খেয়ে গাড়ি চালালে পথদুর্ঘটনার আশঙ্কা ৯.৫ গুণ এবং কোকেনের ক্ষেত্রে ২ থেকে ১০ গুণ বৃদ্ধি পায়। সুতরাং সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মাদকের নিয়ন্ত্রণ একটি বড় নিয়ামক।

খবরে প্রকাশ, ‘দৈনিক ৪৬২ কোটি টাকার ইয়াবা খাচ্ছে আসক্তরা।’ ইয়াবা সেবনে যদি গড়ে প্রতিদিন ৪৬২ কোটি টাকা খরচ হয়, তাহলে বছরে খরচ হয় এক লাখ ৬৮ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। এই খরচ কিন্তু কোনো ইতিবাচক কর্মে নয়, বরং এটি জীবনের গতিধারাকে বিপরীত স্রোতে প্রবাহিত করার একটি প্রক্রিয়া। যার পরিণাম অকালমৃত্যু। তথ্য মতে, মাদকাসক্ত ৬০ শতাংশ লোক নেশার টাকা জোগাড়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। গাণিতিক হিসাবে বাংলাদেশের মাদকের কারণে প্রায় ৪২ লাখ অপরাধী যুক্ত হয়েছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও বিষয়টি মাথায় নিতে হবে যে মাদক দমনের অপর নাম অপরাধের সূতিকাগার ধ্বংস। বর্ষাকালে জমে থাকা পানিতে যেমন ডেঙ্গুর লার্ভা জন্মায়, তেমনি মাদকের ব্যবহার জন্ম দেয় অপরাধীর। এই অপরাধীরা হয় অনেকটা যন্ত্রচালিত রোবটের মতো। আইন, জেল-জরিমানার ভয় এদের নিবৃত্ত করতে পারে না। কারণ এগুলো অনুধাবনের জন্য চিন্তার কেন্দ্র হলো মস্তিষ্ক। এদের মস্তিষ্কই স্বাভাবিক চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তাই দেশের স্বার্থে মাদকের অনুপ্রবেশ যেকোনো মূল্যে বন্ধ হওয়া উচিত।

২০১৬ সালের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪৫ লাখ লোক হেরোইন, ভাং, কোকেনের নেশাগ্রস্ততার কারণে চিকিৎসাধীন। এতে বছরে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মাদকাসক্তদের চিকিৎসার সুবিধা খুবই নগণ্য। সূত্র মতে, আফ্রিকায় প্রতি ১৮ জন নেশাগ্রস্ত লোকের মধ্যে একজন চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছে। আর লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছে প্রতি ১১ জনে একজন। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে মাদকাসক্তদের জন্য চিকিৎসা সুবিধার কথা বলাই বাহুল্য।

গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী ৩৮টি বিশ্ববিদ্যালয় ও ১১টি কলেজে মাদক বিক্রি হচ্ছে। মাদকাসক্ত ছাত্র পড়াশোনা তো করেই না, বরং অন্য যারা সাধারণ ছাত্র তাদেরও সময়মতো পরীক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির কথা, সেখানে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির পরিবেশ থাকে যোজন দূরে। রুটিন মাফিক ক্লাস ও পরীক্ষা নেওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়ে। মাদক সেবনের জন্য বাড়তি টাকার দরকার হয়। এ জন্য শুরু হয় টেন্ডারবাজি, ভর্তি বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ইত্যাদি। সরকার জেলায় জেলায় যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তৈরি করছে, এগুলো থেকে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও গবেষণার কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে হবে। এবং এই সুষ্ঠু পরিবেশের মূলে রয়েছে সুস্থ মানসিকতাসম্পন্ন ছাত্রসমাজ। তাই মাদকের ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করতে হবে। আশার কথা হলো, সরকার দেশের প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করছে এবং মাদকবিরোধী নতুন আইনে মাদকের পৃষ্ঠপোষকদের জন্যও মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখছে।

মাদকের সহজলভ্যতার কারণে চাকরিজীবীদের মধ্যেও অনেকেই মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন। কিছুদিন আগে আমার দেখা একটি ঘটনা। কোনো এক সরকারি অফিসের সহকারী ইঞ্জিনিয়ার নেশা করার দায়ে পুলিশের কাছে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁর নতুন কেনা মোটরসাইকেল অর্ধেক দামে বিক্রি করে তাঁর স্ত্রী তাঁকে জামিনে ছাড়িয়ে এনেছেন। কর্মক্ষেত্রেও নেশার প্রভাবে মানুষ কাজে মনোযোগ দিতে পারে না। বাড়তি টাকার অন্বেষণে নানা অসাধু বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে। ফলে কর্মক্ষেত্রে পেশাগত পরিবেশ বিনষ্ট হয়।

সিঙ্গাপুর, মোনাকোর মতো কয়েকটি ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র ছাড়া বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। ঘনবসতির কারণে যেকোনো কিছুর নেতিবাচক প্রভাব মানুষের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মাদকের অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে না পারলে প্রাচীনকালের প্রাণঘাতী রোগ কলেরা বা বসন্তের মতোই মাদকাসক্তি ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশে সব স্তরের জনগণের মধ্যে।

তাই আমাদের সবার উচিত মাদককে না বলা এবং মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা। যে সমাজে প্রত্যেকটি সুস্থ মানুষই চিন্তা করবে দেশের প্রতিটি ইতিবাচক কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। মাদকমুক্ত দেশ গড়ার জন্য শুধু সরকারি প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়। এ বিষয়ে সমাজের সব স্তরের মানুষের সংশ্লিষ্টতা ও ঐকান্তিক সহযোগিতা অপরিহার্য।

লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

শেয়ার করুন