দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হোক

ইসহাক খান

দেশের উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে লাগামহীন দুর্নীতি। সর্বত্র দুর্নীতির ছায়া। আমাদের অতীত ইতিহাসও সুখকর নয়। দুর্নীতিতে আমরা পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। সেই বিশ্বসেরা অভিধা যদিও নেই কিন্তু দুর্নীতি থেকে জাতি বেরিয়ে আসতে পারছে না। সম্প্রতি বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ঘটেছে বড় ধরনের দুর্নীতি। সেই দুর্নীতির কারণে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।

দেশে এখন মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। এই অভিযান নিয়ে দেশবাসী যতটা আশাবাদী হয়েছিল কার্যত তা দেশবাসীর সে আশা পূরণ হয়নি। মাদকবিরোধী অভিযানে শতাধিক মানুষ কথিত বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। তাতে কি মাদকের অভিশাপ থেকে দেশবাসী মুক্তি পেয়েছে?

মাদকবিরোধী অভিযানে যারা প্রাণ হারিয়েছে, তারা ছোটখাটো মাদক ব্যবসায়ী। কিন্তু যারা গডফাদার তারা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাহলে অভিযান সফল হবে কিভাবে?

আমরা লক্ষ করেছি, মাদক অভিযানেও দুর্নীতির শিকড় ঢুকেছিল। ১০ লাখ ইয়াবা ধরে পুলিশ সেটা ১০ হাজার বলে চালিয়ে দেয়। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হলে পুলিশ সদর দপ্তর তদন্ত শুরু করে। বাকি ৯ লাখ ৯০ হাজার পিস ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করায় পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্তে আসল সত্য বেরিয়ে আসে। তদন্তে দেখা যায়, এসপিসহ মোট ১২ জন পুলিশ এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে মাদকবিরোধী অভিযান ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো’র মতো হাস্যকর হয়ে গেছে। আমাদের সর্বত্র সরষের মধ্যে ভূত। কোনো ভালো কাজ শুরু করলে সরকারের ভেতর থেকে কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি সেই অভিযানকে ভিন্ন খাতে টেনে নিয়ে যায়। আর তাতেই সরকারের ভালো কাজের অপমৃত্যু ঘটে। মাদকবিরোধী অভিযানের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

কিন্তু আমরা দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে একটি কার্যকর অভিযান হিসেবে দেখতে চাই। দেখতে চাই বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুর্নীতির শিকড় উৎপাটন। ব্যাপারটা বিস্ময়কর যে এত এত কর্মচারীর চোখে ধুলা দিয়ে এক লাখ ৪২ হাজার টন কয়লা গায়েব হয়ে গেল। নিঃসন্দেহে এই দুর্নীতির হোতারা একটি বড় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজটি করেছে। না হলে এক লাখ ৪২ হাজার টন কয়লা রাতারাতি উধাও হওয়ার কথা নয়। বিশাল দুর্নীতি। যার বাজার মূল্য ২২৭ কোটি টাকা। যদিও দেশে এর চেয়ে আরো বড় অঙ্কের দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সেগুলো কাগজে-কলমের মাধ্যমে। কিন্তু কয়লাপাচার কাগজে-কলমে সম্ভব নয়। এক দিনে এক বেলায়ও সম্ভব নয়। অনেক দিনের পরিকল্পনা এবং অনেক দিনের প্রচেষ্টায় এই দুর্নীতি সম্ভব হয়েছে। কিন্তু সরকারের কোনো সংস্থা ব্যাপারটা আঁচ করতে পারল না—এটাই বিস্ময়ের ব্যাপার।

জানা গেছে, দিনাজপুর বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে উত্তোলন করে রাখা এক লাখ ৪২ হাজার টন কয়লা গায়েব হয়ে গেছে। যার বর্তমান বাজার মূল্য ২২৭ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের [পিডিবি] সদস্য আবু সাঈদ সম্প্রতি খনি এলাকা পরিদর্শনে যাওয়ার পর বিষয়টি প্রথম সামনে আসে। ঘটনা তদন্তে পেট্রোবাংলার পরিচালককে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।

কয়লা গায়েব হওয়ার ঘটনায় বড়পুকুরিয়া কোল কম্পানি লিমিটেডের [বিসিএমসিএল] ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও একজন মহাব্যবস্থাপককে প্রত্যাহার করা হয়। পরে আরো একজন মহাব্যবস্থাপক ও উপমহাব্যবস্থাপককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী জানিয়েছেন, এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিসিএমসিএল। তারা কয়লা সরবরাহ করতে পারছে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালাতে প্রতিদিন সাড়ে চার হাজার টন কয়লার প্রয়োজন হয়। কিন্তু সাময়িকভাবে কয়লা উত্তোলন বন্ধ থাকায় এবং মজুদ ফুরিয়ে আসায় ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের তিনটি ইউনিট বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে তারা।

জানা গেছে, কয়লাখনি কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিব উদ্দিন আহমদকে ওএসডি করে পেট্রোবাংলায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কম্পানির সেক্রেটারি এবং মহাব্যবস্থাপক আবুল কাশেম প্রধানিয়াকে তাত্ক্ষণিক বদলি করে সিরাজগঞ্জ পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কম্পানিতে পাঠানো হয়েছে।

সাময়িক বরখাস্ত করা কর্মকর্তারা হলেন মহাব্যবস্থাপক আবু তাহের নূর-উজ-জামান ও উপমহাব্যবস্থাপক খালেদুল ইসলাম। নথিপত্রের হিসাব অনুযায়ী খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা যেখানে স্তূপ করে রাখা হয় সেখানে এক লাখ ৪২ হাজার টন কয়লা মজুদ থাকার কথা। অথচ সেখানে এখন এক টন কয়লাও নেই।

এই বিশাল দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের আপাতত ওএসডি এবং তাত্ক্ষণিক বদলি ও সাময়িক বরখাস্ত করার কথা শুনেছি। এটা নিঃসন্দেহে গুরু পাপে লঘু দণ্ড। প্রশ্ন উঠতে পারে, তদন্ত ছাড়াই অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া কি ঠিক? কিন্তু যদি এমন হয় মাসের পর মাস তদন্তে সময় লেগে যায়, তাহলে অপরাধীরা শাস্তি পাবে কিভাবে? এভাবে অপরাধ করে বেঁচে যাওয়ার কারণে সুযোগসন্ধানীরা আরো উৎসাহ পাচ্ছে। আর তারই পরিপ্রেক্ষিতে অপরাধের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

গত বছর সিলেটের হাওরাঞ্চলে হাওর রক্ষা বাঁধ ধসে হাওরবাসীর লাখ লাখ টন ফসলহানি ঘটে। এবং তাদের জীবনে ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসে। খবর নিয়ে জানা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তার গাফিলতির কারণে সময়মতো বাঁধের কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় এই দুর্যোগের ঘটনা ঘটে। সরকার তাত্ক্ষণিকভাবে কয়েকজন উচ্চপদস্থ প্রকৌশলীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে প্রেরণ করেছে। অনেকেই তখন বলাবলি করে, এই প্রথম বড় কোনো কর্মকর্তাকে দুর্নীতির দায়ে সরকার গ্রেপ্তার করল। ভালো লক্ষণ। এর আগে এমন ঘটনা ঘটেনি। কথা সত্য। এত বড় কর্মকর্তা গ্রেপ্তার এই প্রথম ঘটল। কিন্তু তারপর কি? কি শাস্তি হয়েছে তাদের? দেশবাসীও জানে না তারা কোথায় কেমন আছে। তাদের শাস্তির ব্যাপারে সাংবাদিকরাও কিছু জানেন না। হয়তো তারা জামিনে বেরিয়ে গেছে। হয়তো বা তারা আবার স্বপদে বহাল হয়েছে।

এ দেশে শাস্তি হয় চুনোপুঁটিদের। রুই-কাতলারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ব্যাংক নিয়ে দুর্নীতির রেজাল্টও একই রকম। হলমার্কের কেলেঙ্কারিতে ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা কারাগারে আছেন।

সরকার বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়নের জন্য নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তারা ব্যস্ত আছেন তাঁদের আখের গোছাতে। বড় প্রকল্পের বেশির ভাগ অর্থ কর্মকর্তাদের পকেটে চলে যাচ্ছে। কাজ হচ্ছে এক-তৃতীয়াংশ। আমরা দেখেছি, সরকারি ভবন তৈরিতে লোহার রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করা হচ্ছে। রাস্তায় কাদামাটিতে খোয়া ফেলে রাস্তা মেরামত করা হচ্ছে। যার আয়ুষ্কাল মাত্র সাত দিন বা তারও কম। ব্রিজ উদ্বোধনের এক সপ্তাহ যায়নি। সেই ব্রিজ ধসে পড়েছে। এর জন্য দায়ী কে? কেন তাকে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে না?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শুনেছি আপনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে অচিরেই অভিযান শুরু করবেন। অভিযান শুরু করার আগে এই ব্যাপারগুলো মাথায় নিয়ে আপনাকে এগোতে হবে। যাদের বেতন বাড়িয়ে দ্বিগুণ করছেন, গাড়ি-বাড়ি দিচ্ছেন, তারা দুঃসময়ে আপনার পাশে দাঁড়াবে না। আপনি জনগণের কথা ভাবুন। যারা দুঃসময়ে আপনার পাশে বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে। তারা এ দেশের বঞ্চিত জনগণ। তারা দুঃসময়ে নেতাকে ফেলে পালিয়ে যায় না।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, গল্পকার, টিভি নাট্যকার

শেয়ার করুন