কৃষির নতুন দিগন্ত

সমীরণ বিশ্বাস

আধুনিক বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে চালু করা হচ্ছে সংরক্ষণশীল কৃষি বা সুরক্ষা কৃষি। এটি মূলত একটি চাষাবাদের পদ্ধতি। এর মাধ্যমে স্বল্প চাষে পূর্ববর্তী ফসলের কিছু অবশিষ্টাংশ রেখে কম সময়ে ও কম খরচে লাভজনকভাবে ফসল উত্পাদন করা সম্ভব।

কম চাষ জমির রস সংরক্ষণ করে, ক্ষয় রোধ করে ও মাটির উর্বরতা বাড়াতে সহায়তা করে। অধিক চাষে খরচ ও সময়ের অপচয় হয়, কিন্তু কম চাষে খরচ কম হয়, সময়ের অপচয় কম হয়। শ্রমিক কম লাগে, ফলে উত্পাদন খরচ কম হয়। জমিতে নাড়া রাখার ফলে জমিতে জৈব পদার্থ যোগ হয়। মাটির পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং লবণাক্ততা কমাতে সাহায্য করে। ধান, গম, ভুট্টা, ডাল শস্য এমনকি পাটও চাষ করা যায়। স্বাভাবিক চাষের চেয়ে আগাম বীজ বপন করা যায়, যা শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধিতে সহায়ক। সংরক্ষণশীল কৃষি সময়, সেচ, শ্রমিক, সার, বীজ সর্বোপরি উত্পাদন খরচ সাশ্রয় করে এবং উত্পাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

সংরক্ষণশীল বা সুরক্ষা কৃষির মূলনীতি তিনটি: ১. যথাসম্ভব কম চাষ করে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি এবং মাটির রস বজায় রাখা। ২. মাটির রস ধরে রাখতে পূর্ববর্তী ফসলের কিছু অবশিষ্টাংশ মাটির উপরিভাগে রেখে দেওয়া। ৩. ধান এবং অন্যান্য ফসলের মধ্যে লাভজনক শস্য পর্যায় অবলম্বন করা।

আধুনিক কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, বার বার চাষের ফলে মাটির গঠন কাঠামো নষ্ট হয়; সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে বিদ্যমান পানি ও খনিজ পদার্থগুলোর গুণাগুণ নষ্ট হয়। এতে জমির উর্বরতা কমে যায়। এছাড়াও অধিক চাষের ফলে মাটির নিচে একটি প্লাউ প্যান বা শক্ত স্তর তৈরি হয়, যার ফলে শস্যের শিকড় এই স্তর ভেদ করে নিচের দিকে যেতে পারে না, ফলশ্রুতিতে পানি ও পুষ্টি উপাদান আহরণের সুযোগ কমে যায়। তাছাড়া বৃষ্টির পানির নিম্নমুখী প্রবাহ কমে যায়, ফলে ভূপৃষ্ঠ প্রবাহ বৃদ্ধি পায় ও জমির উর্বরতা হ্রাস পায়।

এছাড়া পানির নিম্নমুখী প্রবাহ কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানি স্তরের পুনঃভরাট কম হয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে শূন্য চাষ ও স্ট্রিপ চাষ ব্যবহার করা যেতে পারে। স্ট্রিপ চাষ পদ্ধতিতে জমিতে সরু লাইনে চাষ করা হয়, যেখানে বীজ বপন ও সার প্রয়োগ করা হয় এবং দুই লাইনের মাঝের জমি চাষের দরকার হয় না। শূন্য চাষ পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় স্থানে মাটি চিরে বীজ বপন করা যায়। আধুনিক এই পদ্ধতিতে কম খরচে লাভজনকভাবে ফসল উত্পাদন করা যায়।

সুরক্ষা কৃষির আরেকটি মূলনীতি হলো, পূর্ববর্তী ফসল সংগ্রহের পর জমিতে ৩০% (২০-৩০ সে.মি.) নাড়া রেখে দেওয়া। জমিতে নাড়া রাখার ফলে জমিতে জৈব পদার্থ (যেমন-ফসফরাস) যোগ হয়, মাটির পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশে অধিকাংশ জমি মূলত ধানভিত্তিক কৃষি বিন্যাসের আওতাভুক্ত। বার বার ধানের পর ধান চাষ করলে ফসলের শিকড় মাটির একটি নির্দিষ্ট স্তর হতে খাদ্য সংগ্রহ করে এবং এই ঘাটতি মেটাতে বেশি বেশি সার প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু ধান এবং অন্যান্য ফসলের সমন্বয়ে লাভজনক শস্য পর্যায় অবলম্বন করা গেলে কৃষকরা লাভবান হবেন। সুপরিকল্পিকভাবে সুরক্ষা কৃষির প্রয়োগ ঘটালে কৃষকরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৃষি সুরক্ষিত থাকবে।

লেখক :কো-অর্ডিনেটর, কৃষি ও বীজ কর্মসূচি, সিসিডিবি, ঢাকা

শেয়ার করুন