বর্জ্যশ্রমিকের জীবন এক অবহেলার নাম!

সাধন সরকার

প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত মিলিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ অন্য শহরগুলোতে প্রায় ৪ লাখ বর্জ্য শ্রমিক কাজ করেন। এর মধ্যে শুধু ঢাকা শহরে কাজ করেন প্রায় দুই লাখ বর্জ্য শ্রমিক। নগরের অতিদরিদ্র এ জনগোষ্ঠী বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত থাকলেও নিজের জীবনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা থেকে তারা বঞ্চিত। বর্জ্য শ্রমিকরা নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সমস্যার মধ্যদিয়ে জীবন অতিবাহিত করে থাকে। যে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পেশাগত নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে মৃত্যুর হাতছানি! অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটা পেশায় নিয়োজিত থেকেও বর্জ্য শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষামূলক কোনো সুযোগ-সুবিধা এখনো গড়ে ওঠেনি। বর্জ্য শ্রমিকদের জীবন যেন এক অবহেলা ও বঞ্চনার নাম। ঢাকা শহরে দৈনিক প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উত্পাদন হয়। এসব বর্জ্যের বেশিরভাগ মূলত গৃহস্থালি, প্রাতিষ্ঠানিক, বাণিজ্যিক, রাস্তাঘাটে ফেলা বর্জ্য, কারখানা ও বিভিন্ন ধরনের নির্মাণ কাজ বা ঘরবাড়ি ভাঙার বর্জ্য ইত্যাদি। প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা স্থায়ী ও অস্থায়ী ভিত্তিতে চাকরিতে নিয়োজিত থাকলেও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা রাস্তা, ডাস্টবিন বা বর্জ্য ডাম্পসাইট থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে বিক্রির মাধ্যমে তারা জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। উভয় ক্ষেত্রের শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে সচেতন নয়। কাজ করার সময় বর্জ্য শ্রমিকরা প্রতিরক্ষামূলক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। কাজের সময় তারা পায়ে জুতা, হাতে গ্লাভস ও মুখে মাস্ক পরে না কিংবা ন্যূনতম কোনো ঝুঁকি সম্পর্কেও তারা সচেতন নয়। বিভিন্ন কাজ করার সময় বর্জ্য শ্রমিকদের হাত-পা কেটে যায়, থেঁতলে যায়, দুর্ঘটনায় কখনো কখনো অঙ্গহানিও ঘটে। এসবই ঘটে বর্জ্য সংগ্রহকারীদের জ্ঞান ও সচেতনতার অভাবের কারণে। বর্জ্য শ্রমিকরা জানেন-ই না যে ময়লা-আবর্জনার জীবাণু থেকে কঠিন কোনো রোগব্যাধি শরীরে বাসা বাঁধতে পারে।

জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাতের (অপ্রাতিষ্ঠানিক) বড় ধরনের অবদান থাকলেও বর্জ্য শ্রমিকরা বরাবরই অবহেলিত রয়ে গেছে। ঢাকা শহরে তো বটেই অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো গড়ে ওঠেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা শহরে প্রতিদিন জমা হওয়া বর্জ্যের প্রায় ৭০ ভাগ সিটি করপোরেশন সংগ্রহ করতে পারে। বাকি ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য এখানে-সেখানে রয়ে যায়। তাই আধুনিক, বাসযোগ্য, পরিচ্ছন্ন ও সবুজ শহর গড়তে হলে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বর্জ্য রিসাইক্লিং ব্যবস্থার প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে। এ ছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজে নিয়োজিত বর্জ্য শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকে নজর দিতে হবে। বর্জ্য শ্রমিকরা আর কতকাল অবহেলিত থাকবে ? অন্যান্য পেশার মানুষের মতো তাদেরও জীবন আছে, ভবিষ্যত্ আছে, আছে সুন্দরভাবে বাঁচার অধিকার। রাষ্ট্রের চোখে, সমাজের চোখে বিশাল এই জনগোষ্ঠী দিনের পর দিন উপেক্ষিত থাকতে পারে না। বর্জ্য ব্যবস্থা সম্পর্কিত যেসব আইন রয়েছে সেসব আইনে বর্জ্য শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষামূলক সুযোগ-সুবিধা ও পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টি উল্লেখ থাকতে হবে। কর্মক্ষেত্রে প্রত্যেক বর্জ্য শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি।

লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

শেয়ার করুন