প্লাস্টিক দ্রব্য পুনর্ব্যবহারে জোর দেওয়া প্রয়োজন

বিধান চন্দ্র দাস

বছরে এক কোটি ৩০ লাখ টন প্লাস্টিক সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে। গত এক দশকে আমরা যে পরিমাণ প্লাস্টিক তৈরি করেছি, তা গত শতকে তৈরি করা মোট প্লাস্টিকের পরিমাণকে ছাড়িয়ে গেছে। বছরে এক কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল তেল ব্যবহার করা হচ্ছে এই বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক তৈরি খাতে। পৃথিবীতে প্রতিবছর ৫০০ কোটি প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং প্রতি মিনিটে ১০ লাখ প্লাস্টিকের বোতল আমরা ক্রয় করছি। সুউচ্চ পর্বতমালা থেকে শুরু করে মেরু অঞ্চল, নদী থেকে শুরু করে সমুদ্রের তলদেশ এবং কৃষিক্ষেত্র থেকে শুরু করে বনভূমি—প্রায় সব জায়গায় এখন প্লাস্টিক বর্জ্যের উপস্থিতি।

উন্নয়নশীল দেশের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বিকল করাসহ পুকুর, খাল-বিল, নদী-নালার তলদেশ ভরাট হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে প্লাস্টিক বর্জ্য। এই বর্জ্যের কারণেই বছরে লক্ষাধিক সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যু হচ্ছে। অন্যান্য বাসস্থানেরও অনেক প্রাণী প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে মারা পড়ছে। জনস্বাস্থ্যের ওপরও প্লাস্টিক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। বর্তমানে প্লাস্টিকদূষণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

প্লাস্টিকদূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে তা পরিবেশ তথা সভ্যতার জন্য চরম হুমকি হয়ে দেখা দেবে। বলা হচ্ছে, বর্তমান ধারায় প্লাস্টিক উত্পাদন অব্যাহত থাকলে আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে পৃথিবীতে মোট প্লাস্টিক উত্পাদন দ্বিগুণ হয়ে দূষণের মাত্রাও দ্বিগুণ হবে। তাই বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিকদূষণ ও প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করতে এ বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য করা হয়েছে ‘প্লাস্টিকদূষণ নিয়ন্ত্রণ করো। একে পুনর্ব্যবহার না করতে পারলে প্রত্যাখ্যান করো।’

এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদ্যাপনের জন্য স্বাগতিক দেশ হয়েছে ভারত। জাতিসংঘ ও ভারত যৌথভাবে এ বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি ভারতকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০১৮-এর স্বাগতিক দেশ হিসেবে ঘোষণা করে। এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের বার্তায় জাতিসংঘ থেকে বলা হয়েছে—প্লাস্টিক তৈরির পদ্ধতি, উত্পাদন ও ব্যবহার পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বর্তমানে উত্পাদিত মোট প্লাস্টিকের প্রায় ৫০ শতাংশ একবার ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি করা হয়। ব্যবহৃত প্লাস্টিকের এক-তৃতীয়াংশই পরিবেশে উন্মুক্ত হয়। কিন্তু পরিবেশে উন্মুক্ত হওয়ার পর প্লাস্টিক তার বৈশিষ্ট্যের কারণে নষ্ট হয় না। সময়ের ব্যবধানে তা ছোট থেকে আরো ছোট—ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় (মাইক্রোপ্লাস্টিক/ন্যানোপ্লাস্টিক) পরিণত হয়ে আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ক্ষতিকর বস্তু হিসেবে জীবদেহে ঢুকে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে প্লাস্টিক পরিবেশে উন্মুক্ত হওয়ার পরই তা থেকে দৃশ্যমান (জলাবদ্ধতা, জলাশয়ের তলদেশ নষ্ট করা, প্রাণিদেহে জড়িয়ে যাওয়া, খাওয়াজনিত মৃত্যু, আবর্জনা তৈরি ইত্যাদি) ও অলক্ষ্যে (মাইক্রোপ্লাস্টিক/ন্যানোপ্লাস্টিক তৈরি হয়ে খাদ্যশৃঙ্খলে যুক্ত হওয়া, প্রাণিদেহে রোগব্যাধি তৈরি করা) দুই ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। অর্থাৎ পরিবেশে উন্মুক্ত হওয়া প্লাস্টিক থেকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতির ধরন ও মাত্রা পাল্টে যায়।

এ কথা ঠিক যে প্লাস্টিক এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। বর্তমান বাস্তবতায় প্লাস্টিক পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশে একজন মানুষ বছরে গড়ে প্রায় পাঁচ কিলোগ্রাম প্লাস্টিক ব্যবহার করে। উন্নত দেশগুলোতে করে ৩০ কিলোগ্রাম। কিন্তু উন্নত দেশগুলোতে আমাদের দেশের মতো প্লাস্টিক ব্যবহারের পর সেগুলো যেখানে-সেখানে পড়ে থাকতে দেখা যায় না। ব্যবহৃত প্লাস্টিক সাধারণত নির্দিষ্ট ‘বিন’-এ ফেলা হয়। সেখান থেকেই সাধারণত সরাসরি কিংবা ‘ল্যান্ডফিল’ (ময়লা-আবর্জনা জমা করার স্থান) হয়ে পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ কারখানায় ব্যবহৃত প্লাস্টিক পৌঁছে যায়। বিন, সুপারস্টোর কিংবা ভোক্তাদের কাছ থেকে ব্যবহৃত প্লাস্টিক সংগ্রহ, বাছাই ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ উপযোগী করার জন্য ইউরোপে বেশ কিছু কম্পানি সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করছে।

আমাদের দেশে প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের পদ্ধতি বেশ জটিল এবং ঝঞ্ঝাটপূর্ণ। টোকাইরা সাধারণত ব্যবহৃত প্লাস্টিক রাস্তাঘাট, হাট-বাজার, ডাস্টবিন, ল্যান্ডফিল কিংবা অন্যান্য জায়গা থেকে সংগ্রহ করে। ফেরিওয়ালারা সংগ্রহ করে বাসাবাড়ি ও দোকান থেকে। টোকাই ও ফেরিওয়ালারা ব্যবহৃত প্লাস্টিক সংগ্রহের পর তারা এগুলো বিক্রি করে ভাঙ্গারির দোকানে। ভাঙ্গারি বিক্রেতারা সেগুলো বিক্রি করে প্লাস্টিক চূর্ণকারদের কাছে। প্লাস্টিক চূর্ণকাররা সেগুলো বাছাই, ধোয়া ও শুকানোর পর মেশিনের সাহায্যে ছোট ছোট দানা তৈরি করে। এরপর সেই বস্তাভরা দানা বিক্রি করা হয় ‘দানাওয়ালা’দের কাছে। ‘দানাওয়ালা’দের কাছ থেকেই প্লাস্টিক কারখানার লোকজন ‘প্লাস্টিক দানা’ ক্রয় করে এবং তা থেকে আবার প্লাস্টিকসামগ্রী তৈরি হয়। ব্যবহৃত প্লাস্টিকের এক বিরাট অংশ বিশেষ করে প্লাস্টিক ব্যাগ অত্যন্ত পাতলা হওয়ায় তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংগ্রহ করার মতো অবস্থায় থাকে না। ফলে আমাদের দেশে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের অল্প অংশই সংগৃহীত হয়ে তা পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ হয়। বর্তমানে কিছু প্লাস্টিক কম্পানি নিজেরা ব্যবহৃত প্লাস্টিক কিনে সেগুলো বাছাই, ধোয়া, শুকানো ও চূর্ণ করার পর পুনঃপ্রক্রিয়াজাত প্লাস্টিকসামগ্রী তৈরি করছে। বাংলাদেশ থেকে প্লাস্টিক চূর্ণ কিংবা চূর্ণ থেকে প্রস্তুত রেজিনও (পেট রেজিন) বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। বাংলাদেশে প্লাস্টিকের দ্রব্যসামগ্রী তৈরিতে এখন ২০ শতাংশেরও কম পুনঃপ্রক্রিয়াজাত প্লাস্টিক ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ দেশে প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল আমদানির পরিমাণ বর্তমানে প্রায় সাড়ে আট লাখ মেট্রিক টন।

আমাদের দেশে ছোট-বড় প্রায় তিন হাজার প্লাস্টিকের কারখানায় প্রায় ১২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। দেশে-বিদেশে মিলিয়ে বছরে প্রায় ২৪ হাজার (বিদেশে চার হাজার কোটি) কোটি টাকা প্লাস্টিক খাতে ব্যবসা হচ্ছে। একদিকে প্লাস্টিকদূষণের ভয়াবহতা মোকাবেলা, অন্যদিকে প্লাস্টিককেন্দ্রিক অর্থনীতি রক্ষা—এই দুই কূল বজায় রাখতে হলে ব্যবহৃত প্লাস্টিক পরিবেশে উন্মুক্ত হওয়ার রাস্তা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আমাদের দেশে আইন করে পলিথিন শপিং ব্যাগ উত্পাদন ও ব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। ইউরোপে মালপত্র, বিশেষ করে কাঁচামাল ও মুদিদ্রব্য কিনলে এখন আর ফ্রি প্লাস্টিক ব্যাগ পাওয়া যায় না। পয়সা দিয়ে তা কিনতে হয়। সেই ব্যাগগুলো অবশ্য আমাদের দেশের পলিথিন ব্যাগের মতো পাতলা নয়। কোনো কোনো উন্নত দেশের দোকানগুলো ব্যবহৃত পানির বোতল ফেরত নিয়ে নতুন পানিভরা বোতল হ্রাসকৃত মূল্যে বিক্রি করে। আমাদের দেশে এসব চালু করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে দেশে কমপক্ষে ৫০ মাইক্রোন পুরু শপিং ব্যাগ চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করা যায়।

বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশন (বিপিজিএমইএ) বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ভোক্তাদের কাছ থেকে সরাসরি ব্যবহৃত প্লাস্টিক ন্যায্য মূল্যে ক্রয় করার ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারে। তাহলে ব্যবহৃত প্লাস্টিক ডাস্টবিন, রাস্তাঘাট কিংবা ল্যান্ডফিলে না গিয়ে তা সরাসরি কারখানায় পৌঁছে যাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২০ সালের মধ্যে ‘ল্যান্ডফিল’-এ কোনো ব্যবহৃত প্লাস্টিক না নিয়ে তা সরাসরি প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ কারখানায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করছে।

এ ধরনের পদক্ষেপ ধীরে ধীরে আমাদের দেশেও নেওয়া প্রয়োজন। ভোক্তাদের পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের জন্য ব্যবহৃত প্লাস্টিক জমা দেওয়া বা জমা করার জন্য আগ্রহী করে তুলতে হলে সচেতনতা সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তাদের কিছু আর্থিক লাভের বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। আবর্জনা ব্যবস্থাপনায় আমাদের পরিবেশ অধিদপ্তর প্রণীত জাতীয় থ্রি-আর (রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকেল) কৌশলের সঙ্গে এগুলো সংযুক্ত করা যেতে পারে।

আমাদের দেশের বর্তমান বাস্তবতায় প্লাস্টিকদূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ব্যবহৃত প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে পুনর্ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০১৮-এর প্রতিপাদ্যের সঙ্গে টেকসই উন্নয়নের ১২ নম্বর লক্ষ্য অর্জনের মিল থাকায় ব্যবহৃত প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের ব্যাপারে আমাদের অবশ্যই দায়বদ্ধতা তৈরি হয়েছে। আমাদের তা পালন করা প্রয়োজন।

লেখক : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন