পাহাড়ের কান্না থামাতে হবে

আদ্রিয়ান দাস অরিত্র

বর্ষাকালের আগমন ঘটলেই দেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতিতে কান পাতলেই শোনা যায় পাহাড়ের কান্নার শব্দ। পরিবেশে আতঙ্কের ছাপ। পাহাড়, প্রকৃতি, বৃষ্টি এরা সবাই কিছু বলতে চায়। বলতে চায়, ওরা ভালো নেই। কিন্তু ওদের কথা শোনার মত আমাদের সময় নেই। যখন ওদের কান্নার শব্দ আকাশ- বাতাস ভারি করে প্রতিধ্বনিত হয় তখন শুনতে পাই। এবারও আমরা কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। টানা বৃষ্টির কারণে আবারো পাহাড় ধস হচ্ছে। রাঙামাটির নানিয়ারচরে এবার পাহাড় ধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১১ জনে দাঁড়িয়েছে। ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামেই পাহাড় ধসে ১২৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। ২০১৭ সালের ১৩ থেকে ১৫ জুন পাহাড় ধসের দুর্যোগে রাঙ্গামাটিতে ৫ সেনা সদস্যসহ ১৫২ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। একটি বিষয় নিশ্চয় খেয়াল করেছেন, প্রায় সব কয়টি পাহাড় ধস জুন মাসে সংঘটিত হয়েছে। তার কারণ এই সময়টি বর্ষাকাল। যার কারণে প্রত্যেক বছরের এই সময়ে আমাদের উদ্বেগের অন্ত থাকে না। বাংলাদেশের পাহাড়গুলোতে কোনো কঠিন শিলা নেই। তাই বৃষ্টির কারণে এ ধরনের মাটি পানি শুষে ফুলতে থাকে। তাছাড়া কঠিন শিলা না থাকায় মাটিগুলো নরম ও পিচ্ছিল হয়ে যায়। ফলে ভারি বর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে মাটি ভেঙে পড়ে। যার ফলশ্রুতিতে গতবছরের ১২ জুন মধ্যরাতে থেকে ১৩ জুন সকাল পর্যন্ত পাহাড় ধসের মত মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এটিকে এককভাবে প্রাকৃতিক কোনো দুর্ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। বরং মানুষ সৃষ্ট মরণ-ফাঁদও বলা চলে। মানুষ সৃষ্ট নয় এমন বলা যাবে না কারণ বাঙালি সেটেলররা এবং আদিবাসীরা বছরের পর বছর পাহাড় কেটে, গাছপালা কেটে বসতি স্থাপন করছে। যার করুণ চিত্র ২০১৭ সালে দেখতে পেলাম দেড়-শতাধিক মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। তাদের আর্তনাদ আমাদের জীবনকে অভিশপ্ত করে তুলছে কিন্তু আমরা নিজেদের জন্য অধিক থেকে অধিকতর ক্ষমতা ও চাহিদার পিছনে ছুটছি। ছুটতে ছুটতে ভুলে গেছি ভূমিরূপ আর নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কথা। বর্তমানে মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গাদের বাড়তি বসতি স্থাপনের জন্য পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন করা হয়েছে যা দেশের জীব-বৈচিত্র্য এবং পার্বত্য অঞ্চলের ভবিষ্যেক ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চিত অন্ধকারে।

জিও সায়েন্স অস্ট্রেলিয়ার এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পাহাড় ধসের পেছনে প্রাকৃতিক কারণ এবং মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। প্রাকৃতিক কারণ হলো- পাহাড়ের ঢাল যদি এমন হয় যে ঢালের কোনো অংশে বেশি গর্ত থাকে। তখন অতিবৃষ্টিতে ভূমি ধস হতে পারে। এছাড়া ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাত এবং পাহাড়ের পাদদেশের নদী ও সাগরের ঢেউ থেকেও পাহাড় ধস হতে পারে। আর মনুষ্য সৃষ্ট কারণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে—পাহাড়ের গাছপালা কেটে ফেলা, মাটি কেটে ফেলা, পাহাড়ে প্রাকৃতিক খাল বা ঝরনার গতি পরিবর্তন, পাহাড়ের ঢালুতে অতিরিক্ত ভার দেওয়া এবং খনি খননের কারণে পাহাড় ধস হতে পারে। তবে আমাদের ভূতাত্ত্বিকরা বলছেন, বাংলাদেশে মূলত পাহাড়ের উপরের দিকে কঠিন শিলার অভাব, পাহাড়ের মাটি কেটে ফেলা এবং বড় গাছপালা কেটে ফেলার কারণেই পাহাড় ধস হয়ে থাকে।

সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের (সেড) পরিচালক ফিলিপ গাইন এক সেমিনারে পাহাড়ের বন ধ্বংসের ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় ছয় হাজার আসবাবের কারখানা রয়েছে। সেখানে বন থেকে কেটে আনা কাঠ দিয়ে আসবাব তৈরি করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে। পাহাড়ে সম্প্রতি তামাক চাষ ও বিভিন্ন ফলের একক বাগান গড়ে তোলা হচ্ছে। এগুলো পাহাড়ের প্রতিবেশ ব্যবস্থা ও ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছে। দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ের গায়ে জন্মানো বন-জঙ্গল এবং গাছপালা এর অভ্যন্তরীণ বন্ধন শক্ত রাখে। কিন্তু লোভী মানুষরা অব্যাহতভাবে পাহাড় কাটছে। অনেকক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষ বসতির প্রয়োজনেও পাহাড় কাটছে। এতেই পাহাড় ধ্বংসের পথ তৈরি হয়। এছাড়া প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার থেকে চলতি বছরে আসা ১০ লাখ রোহিঙ্গার কারণে কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলার বেশ কয়েকটি পাহাড় ইতোমধ্যে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এ ছাড়াও চার জেলার পাহাড়ে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বসতি গড়ে তুলেছে।

বিগত ১০ বছরে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে মারা গেছে ৪ শতাধিক মানুষ। এতো লাশ, এতো মানুষের আহাজারি আর দেখতে চাই না। আবার যেন ২০০৭ সাল এবং ২০১৭-এর প্রতিচ্ছবি এই ২০১৮ সালে এসে দেখতে না হয়। এরজন্য এখনি জোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সেই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী, উদ্ধারকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক কর্মীদের সবর্দা সতর্ক অবস্থায় রাখতে হবে। পাহাড়কে ভালোবাসতে হবে, রোহিঙ্গাদের জন্য পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন করা সত্যিই উদ্বেগজনক। দেশের জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু সংরক্ষণের জন্য পাহাড় বাঁচানো একান্ত জরুরি। পূর্ণেন্দু পত্রীর মতো আজ বলতে ইচ্ছে করে-‘সেদিন ছিল পাহাড়টার জন্মদিন। পাহাড় মেঘকে বললো, আজ তুমি লাল শাড়ি পরে আসবে। মেঘ পাহাড়কে বললো, আজ তোমাকে স্নান করিয়ে দেবো চন্দন জলে’। যেদেশে প্রকৃতি নেই, সেদেশে প্রেম নেই আর যেখানে প্রেম নেই সেখানে কোনো হূদস্পন্দন থাকতে পারে না।

লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন