দেশে হৃদরোগে মৃত্যুর ৩০ শতাংশের কারণ ধূমপান

সিলেটের সকাল ডেস্ক :: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, সারাবিশ্বে প্রতিবছর ২০ লাখ মানুষ তামাক ব্যবহারের কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বাংলাদেশে প্রতিবছর হৃদরোগে আক্রান্ত মৃত্যুর ৩০ শতাংশের জন্য দায়ী ধূমপান। এ ছাড়া ক্যানসারজনিত মৃত্যুর ৩৮ শতাংশ, ফুসফুসে যক্ষ্মার কারণে মৃত্যুর ৩৫ শতাংশ এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগে মৃত্যুর ২৪ শতাংশের পেছনে রয়েছে ধূমপান। অর্থাৎ দেশে শুধু তামাকের কারণে প্রতিবছর ১ লাখ মানুষ মারা যায়। ৩ লাখ ৮২ হাজার মানুষ পঙ্গু হয় এবং ১২ লাখ মানুষ তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে ভোগে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ অবস্থাকে ‘মহামারী’ আখ্যা দিয়ে বলছেন, তামাকজাত পণ্যবিরোধী সচেতনতা তৈরি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, বিশেষ করে যুবকদের মধ্যে তামাকবিরোধী সচেতনতা তৈরি করতে পারলে আগামীতে হৃদরোগের মতো অসংক্রামক রোগে মৃত্যুহার কমে আসবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর একক কারণ হিসেবে কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ বা হৃদরোগের অবস্থান শীর্ষে। বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর প্রায় ৩১ শতাংশই হৃদরোগজনিত কারণে ঘটে। এর এক-তৃতীয়াংশ ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হৃদরোগজনিত মৃত্যুর প্রায় ১২ শতাংশের জন্য দায়ী তামাক ব্যবহার এবং পরোক্ষ ধূমপান। ২০০৫-২০১৬ সময়ে বাংলাদেশে অকাল মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদরোগ সপ্তম স্থান থেকে প্রথম স্থানে উঠে এসেছে। এবং এই পরিবর্তনের হার ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি তামাক ব্যবহারকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এদেশে ৪ কোটি ৬০ লাখ বা ৪৩ ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সিগারেট, বিড়ি ও ধোঁয়াবিহীন তামাক সেবন করেন। ৫৮ ভাগ পুরুষ এবং ২৯ ভাগ নারী ধোঁয়াযুক্ত অথবা ধোঁয়াবিহীন তামাক সেবন করেন।

২০১০ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা যায়, ৯৮ দশমিক ৭ ভাগ মানুষের মধ্যে অন্তত একটি অসংক্রামক রোগের (হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, ডায়বেটিস) ঝুঁকি, ৭৭ দশমিক ৪ ভাগ মানুষের মধ্যে অন্তত দুটি ঝুঁকি এবং ২৮ দশমিক ৩ ভাগ মানুষের মধ্যে অন্তত তিনটি ঝুঁকি রয়েছে।

তামাক ব্যবহারকে অসংক্রামক রোগের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে প্রকাশিত ২০১৭ সালের বুলেটিন অনুযায়ী, ২০০৯-২০১৬ সালে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) হৃদরোগ বিভাগের অধ্যাপক মো. হারিসুল হক বলেন, কেউ নেয় ধোঁয়া হিসেবে, কেউ নেয় গুল, জর্দা পাতা বা সাদা পাতা হিসেবে নেয়। কেউ কেউ তামাককে অন্যভাবে নেওয়ার চেষ্টা করে। তিনি বলেন, মূলত তামাকের নিকোটিন ক্ষতিকর। এই নিকোটিন চামড়ার উপরে ব্যবহার করা যায়। যারা বহুদিন ধরে ধূমপান করে, ছাড়তে পারছে না তখন আমরা তাকে চামড়ার উপর নিকোডার্ম লাগাতে বলি। এতে করে চামড়ার উপর নিকোডার্মটা চলে যায়। তখন সে অনুভব করে যে সে সিগারেট খায়। তখন যদি এভাবে দুই-তিন মাস কেউ এভাবে চালাতে পারে তারপর আর সে সিগারেট খায় না।

মো. হারিসুল হক বলেন, যারা ধূমপান করেন তাদের প্রথমত দুইটা রোগ বেশি হয়- ১. ফুসফুস ও ২. মূত্রথলির ক্যানসার। হৃদরোগ, স্ট্রোক এসব রোগের সঙ্গে ধূমপানের স¤পর্ক আছে। রক্তনালী সরু হয়ে পচন হতে পারে (বার্জাস ডিজিজ)। এটা চাষীদের মধ্যে বেশি হয়। ইদানিং কিছু স্টাডিতে দেখা যাচ্ছে, যারা সাদা পাতার গুল খান তাদের মাড়ি এবং চোয়ালের ক্যানসার হচ্ছে। যারা স্মোকার তাদের ৮০ ভাগেরই চোখের রেটিনার রোগ হয়। হার্ট ও রক্তনালীর সঙ্গে পায়ের শিরার মধ্যে ব্লক হলে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আবার ঘাড়ের শিরার মধ্যে ব্লক হলে স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। যারা নিকোটিন খায় ঠিক তাদের রেটিনার অসুখ হবেই। মূত্রথলির ক্যান্সার যাদের হয় তাদের প্রত্যেকেই নারী হলে জর্দা খায়, পুরুষ হলে সিগারেট খায়। তামাক খেলে নিকোটিন রক্ত নালীকে গিয়ে সংকোচন বাড়িয়ে দেয়। ঘন ঘন সংকোচন হলে ঠিকমতো রক্ত যেতে পারে না বুক ধড়ফড় করে। এসময় অক্সিজেন পায় আর তখনই হার্ট অ্যাটাক হয়।

তামাক বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি বাংলাদেশ সরকার বর্তমান তামাকের কর ব্যবস্থাকে সংশোধন করে তাহলে এটি প্রায় ৬ দশমিক ৪২ মিলিয়ন বর্তমান প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ীদের ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত করবে (৩ দশমিক শূন্য ৭ মিলিয়ন সিগারেট ধূমপায়ী এবং ৩ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন বিড়ি ধূমপায়ী), সিগারেট সেবনের প্রবণতা ২ দশমিক ৭ ভাগ এবং বিড়ি সেবনের প্রবণতা ২ দশমিক ৯ ভাগে কমিয়ে আনবে, দীর্ঘমেয়াদে বর্তমান ধূমপায়ীদের মধ্যে অকাল মৃত্যু ২ দশমিক শূন্য ১ মিলিয়নে কমিয়ে আনবে (১ দশমিক শূন্য ৮ মিলিয়ন সিগারেট এবং ৯ লাখ ৩৮ হাজার ৬৫০ বিড়ি ধূমপায়ী) এবং অতিরিক্ত রাজস্ব ৭৫ থেকে ১০০ বিলিয়ন টাকা বৃদ্ধি পাবে (জিডিপি’র শূন্য দশমিক ৪ ভাগ)। এই অতিরিক্ত রাজস্ব তামাক ব্যবহারজনিত ক্ষতি হ্রাস এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারার বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে নতুন বা বিদ্যমান কর্মসূচির তহবিল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

আইনজীবী ও তামাক বিশ্লেষক সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন বলেন, আমরা সচেতনতার মাধ্যমে তামাকের কারণে হওয়া হৃদরোগ থেকে মানুষ দূরে রাখতে পারি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপানের কারণে কীভাবে হৃদরোগ হয় সে স¤পর্কে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা, হার্টের সুস্থতা এবং সব ধরনের তামাকপণ্য থেকে মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সচেতনতা সৃষ্টিতে আমরা কাজ করতে পারি। পাশাপাশি তামাক পণ্যের ওপর কর বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে তামাক গ্রহণে নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে আমরা হৃদরোগসহ অন্যান্য রোগের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারি।

শেয়ার করুন