কী হওয়া উচিত পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির মূল লক্ষ্য

মো. মাহবুব-উল-আলম

বিশ্বজুড়ে উচ্চ মৃত্যুহারের কারণে আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগ পর্যন্ত মানবজাতি প্রজননকে মৃত জনগোষ্ঠীর প্রতিস্থাপক হিসেবে বিবেচনা করত। বিভিন্ন দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সবসময়ই জনসংখ্যা ও জন-উন্নয়ন বিষয়ে চিন্তাশীল ছিলেন এবং স্ব স্ব চিন্তার আলোকে বিভিন্ন সময় দিকনির্দেশনা দেয়ার ক্ষেত্রে সচেষ্ট ছিলেন।

চীনের কনফুসিয়াস ছিলেন এক্ষেত্রে অগ্রদূত। তিনি জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার কথা বলতে গিয়ে অধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত এলাকা থেকে কম জনসংখ্যা অধ্যুষিত এলাকায় জনগোষ্ঠী স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। খ্রিস্টপূর্ব ৩৬০ সালে প্লেটো জনসংখ্যা বিষয়ে লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেন, জনসংখ্যাধিক্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, যা গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক নয়।

তিনি আরও বলেন, জনসংখ্যা খুব বেশি কমে গেলে শ্রমবিভাজন সম্ভব নয়, যা কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে হুমকিস্বরূপ। প্লেটো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য দেরিতে বিয়ে, গর্ভপাত এবং জনসংখ্যা স্থানান্তরের কথা বলেছেন এবং জনসংখ্যার সংখ্যাগত দিক থেকে গুণগত দিকটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে এরিস্টটল ছিলেন জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনায় কঠিন ও কঠোর মনোভাবাপন্ন।

খ্রিস্টপূর্ব ৩৪০ সালে তিনি তার দ্য পলিটিক্স গ্রন্থে উল্লেখ করেন, একটি নগরের জনসংখ্যা ততটুকুই হওয়া উচিত যতটুকু সেই নগর ধারণ করতে পারে। তিনি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগের ওপর জোর দিতে গিয়ে বলেছেন, পরিবারে সন্তানসংখ্যা কঠোর আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত এবং কোনো মহিলা নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে বেশিবার গর্ভধারণ করলে গর্ভপাত করা উচিত। এরিস্টটলের এ ধারণা চীনের রাষ্ট্রীয় জনসংখ্যা নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

রোমান সম্রাটরা জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি পূরণের একটি উপায় হিসেবে বিবেচনা করে উপনিবেশ স্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত জনসংখ্যার ওপর গুরুত্ব প্রদান করতেন। পক্ষান্তরে মধ্যযুগে ইউরোপে খ্রিস্টান ধর্মীয় নেতারা বহুবিবাহ, ডিভোর্স, গর্ভপাতের বিরোধিতা করতেন এবং এগুলোকে নিরুৎসাহিত করতেন।

মুসলিম মনীষী ইবনে খালদুন জনসংখ্যা বিষয়ে পূর্ববর্তী চিন্তাবিদ ও দার্শনিকদের মতো নেতিবাচক ছিলেন না। তার মতে, জনসংখ্যাধিক্য পেশার দক্ষতা ও বিশেষত্বের জন্য সহায়ক। মানুষ শ্রমবাজারে টিকে থাকার জন্য দক্ষতা ও বিশেষত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করে যা আয় বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। তিনি আরও বলেন, বেশি জনসংখ্যা অধ্যুষিত জনগোষ্ঠী কম জনসংখ্যা অধ্যুষিত জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি সমৃদ্ধ।

বস্তুবাদী সমাজবিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করত- মানুষ নয়, ভূমিই হল একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ। তারা আরও বিশ্বাস করত- সামাজিক উন্নয়নের জন্য মুক্তবাজার অর্থনীতি অত্যাবশ্যক। পরে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এডাম স্মিথ যোগ করেন- ভূমি সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হবে তখনই যখন ভূমির সঙ্গে শ্রম যুক্ত হয়। তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে একে অপরের পরিপূরক ও সহায়ক হিসেবে অভিহিত করেন।

এডাম স্মিথের মতে কোনো এলাকার জনসংখ্যা নির্ধারিত হয় শ্রমের চাহিদা এবং ভূমির উৎপাদনশীলতার ওপর। অষ্টাদশ শতকে ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী কনডরসেট জনসংখ্যার ধারণাকে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। অষ্টাদশ শতক ছিল ইউরোপের সমৃদ্ধির যুগ, ওই সময় কনডরসেট বলেন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি হাতে হাত রেখে চলে। তিনি আরও বলেন, সমৃদ্ধির চূড়ান্ত পর্যায়ে জনসংখ্যা হ্রাস পেতে শুরু করে।

কনডরসেট মনে করতেন প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কোনো পরিসীমা নেই। সমসাময়িক আরেকজন দার্শনিক গডউইন (১৭৯৩) মত প্রকাশ করেন, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি খাদ্য উৎপাদন ও বিতরণকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং জনসংখ্যাধিক্য বয়ে আনবে না, কারণ মানুষ স্বেচ্ছায় পরিবার ছোট রাখতে সচেষ্ট হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অধিক জনসংখ্যা দারিদ্র্য বয়ে আনে না, দারিদ্র্যের কারণ অসম বণ্টন, অসমতা, লোভ এবং সম্পদ কুক্ষিগত করার মানসিকতা।

১৭৯৮ সালে টমাস ম্যালথাস তার যুগান্তকারী ও বিতর্কিত জনসংখ্যা তত্ত্ব প্রকাশ করেন। ম্যালথাসের মতে, অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ে, পক্ষান্তরে উৎপাদন বাড়ে গাণিতিক হারে। নিয়ন্ত্রণহীন জনসংখ্যা খাদ্য সরবরাহে অপ্রতুলতা সৃষ্টি করে এবং প্রকৃতিতে খাদ্য সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল থাকে, যার অবধারিত ফল হল দুর্ভিক্ষ, মহামারী, মৃত্যু এবং জনসংখ্যা হ্রাস।

ম্যালথাস জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য কৌমার্য এবং দেরিতে বিয়ের পরামর্শ দেন। তিনি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহার, গর্ভপাতকে অনৈতিক আখ্যায়িত করেন এবং নিরুৎসাহিত করেন। ১৮৩৪ সালে ম্যালথাস যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলস ছিলেন বিলেতে বসবাসকারী কিশোর। মার্কস ও এঙ্গেলস কেউই জনসংখ্যা কীভাবে বৃদ্ধি পায় সে বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি।

মার্কসীয় তত্ত্বের মৌলিক বিষয়টি ছিল যে কোনো সামাজিক ব্যবস্থায় নিজস্ব আইন ও ধারা সেই সমাজের জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। মার্কস আরও বলেন, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় অতিরিক্ত জনসংখ্যার ফল হল দারিদ্র্য, পক্ষান্তরে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা উদ্বৃত্ত জনগোষ্ঠীকে ধারণ করে কোনো বিরূপ প্রভাব ছাড়াই। মার্কস ও এঙ্গেলসের মতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

তারা আরও উল্লেখ করেন, সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সম্পদও বৃদ্ধি পায় এবং তা কোনোভাবেই দারিদ্র্য সৃষ্টি করে না। ম্যালথাস ও মার্কস জনসংখ্যা সম্পর্কে ভিন্ন ধারণা পোষণ করলেও ব্যক্তিজীবনে নিজ নিজ ধারণার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ছিলেন অভিন্ন। ম্যালথাস নিরাপদ চাকরি পাওয়ার পর ৩৯ বছর বয়সে বিয়ে করেন এবং দাম্পত্য জীবনে ৩ সন্তানের জনক ছিলেন, পক্ষান্তরে মার্কস ২৫ বছর বয়সে বিয়ে করেন এবং তিনি ৮ সন্তানের জনক ছিলেন।

মিল (১৮১৩), ডুমন্ট (১৮৯০) ও দুরখাইম (১৮৯৩) জনসংখ্যা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা প্রদান করেন, যার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী সময়ে ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন তত্ত্বের উদ্ভব হয়। মিলের মতে জীবনযাত্রার মান জনউর্বরতার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। তিনি জনসংখ্যা বিষয়ে বলতে গিয়ে প্রথমবারের মতো নারীর অধিকার ও উন্নয়নের প্রসঙ্গ টানেন।

তার মতে নারীদের সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ দিলে তারা পুরুষদের তুলনায় কম সন্তান জন্ম নেয়ার পক্ষে ইচ্ছা পোষণ করবে। মিল আরও উল্লেখ করেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করে তুললে তা জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। মিল যুক্তি দেখান, সামাজিক অবস্থান বিচ্যুতির ভয়ে জনউর্বরতা হ্রাস পায়।

ডুমন্ট, মিলের ধারণাকে আরেকটু বিস্তৃত করে বলেন, জনউর্বরতা হ্রাসের সঙ্গে সামাজিক অবস্থার সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সমাজতন্ত্র মানুষের সামাজিক অবস্থানগত উন্নতির আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। পক্ষান্তরে ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী দুরখাইমের মতে, উন্নয়ন প্রবৃদ্ধি সামাজিক সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য প্রত্যেক ব্যক্তি বিশেষ দক্ষতা অর্জন করতে চায়।

বিংশ শতাব্দীতে জনসংখ্যাবিষয়ক তত্ত্বীয় বিশ্লেষণে সংখ্যাগত বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে শুরু করে এবং ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন তত্ত্বের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। ওয়ারেন টমাস উন্নত বিশ্বসহ বিভিন্ন দেশের ১৯০৮-১৯২৭ মেয়াদে জনসংখ্যার গতিপ্রকৃতির উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ১৯২৯ সালে ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন তত্ত্ব প্রণয়ন করেন।

ট্রানজিশনের প্রথম পর্বে জন্ম হার ও মৃত্যু হার দুটিই বেশি থাকে; দ্বিতীয় পর্বে মৃত্যু হার কমলেও জন্মহার তুলনামূলক বেশি থাকার কারণে এ পর্বে জনসংখ্যা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়; তৃতীয় পর্বে জন্ম হার ও মৃত্যু হার দুটোই কমতে থাকে; এবং চতুর্থ স্তরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শতকরা একের নিচে নেমে যায় এবং ক্রমান্বয়ে জন্মহার মৃত্যুহারের তুলনায় অনেক বেশি কমে যায় এবং জনসংখ্যা কমতে থাকে।

ম্যালথাস-পরবর্তী জনসংখ্যাবিশারদদের মধ্যে হার্ডিন ও ইহলিশ ছিলেন উল্লেখযোগ্য। তারা উল্লেখ করেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ভৌগোলিক সম্পদকে অতিক্রম করছে এবং পরিবেশের ক্ষতিসাধন করছে। তাদের মতে মানবগোষ্ঠী যদি এ বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। জনউর্বরতা কমানোর লক্ষ্যে তারা কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার ওপর জোর দেন।

ম্যালথাসের সঙ্গে জনসংখ্যা কমানোর বিষয়ে তারা সহমত পোষণ করলেও জনসংখ্যা কমানোর উপায় নির্দেশনার ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করেন। ম্যালথাস যেখানে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে নৈতিক উপায়ের কথা বলেন, সেখানে হার্ডিন ও ইহলিশ জনসংখ্যা কমানোর জন্য যে কোনো পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানান এবং বলেন, জনসংখ্যার অপরিকল্পিত বৃদ্ধি শুধু দারিদ্র্য বয়ে আনে না, প্রাকৃতিক দুর্যোগও বয়ে আনে।

বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) জনসংখ্যা সম্পর্কে উপরোক্ত মনোভাবের প্রতিফলন দেখা যায়, যেখানে জনসংখ্যাকে উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমানোর জন্য দৃঢ় ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের অবতারণা করতে গিয়ে বলা হয়, ‘No civilized measure would be too drastic to keep the population of Bangladesh on the smaller side of 15 crore for sheer ecological viability of the nation.’

বাংলাদেশে ১৯৭৬ সালে প্রণীত প্রথম জনসংখ্যা নীতিতে জনসংখ্যাকে দেশের এক নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তা নিয়ন্ত্রণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগের কৌশল গ্রহণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে সব সরকারই জনসংখ্যা সম্পর্কে উপরোক্ত ধারণাকে সমর্থন করেন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট ছিলেন। ফলে বাংলাদেশে জনউর্বরতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায় (১৯৭৬ সালের ৬.৭ থেকে ২০১৪ সালে ২.৩ শতাংশ) এবং বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।

বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশনের তৃতীয় পর্বে অবস্থান করছে, যখন দেশে জন্মহার ও মৃত্যুহার দুই-ই হ্রাস পাচ্ছে এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর (১৫-৪৫ বছর) হার মোট জনগোষ্ঠীর ৬২ শতাংশ। বাংলাদেশ এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হিসেবে দেশের উন্নয়নের কাজে লাগাতে পারবে, যদি আমরা সঠিক পরিকল্পনামাফিক এগোতে পারি।

আরও উল্লেখ্য, আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর ২৩ শতাংশের বয়স ১৪-১৯ বছর, যারা জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের মতে পপুলেশন মোমেন্টাম এফেক্ট হিসেবে ক্রমান্বয়ে প্রজনন বয়সে প্রবেশ করবে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে ২০৩১ সাল পর্যন্ত।

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে উন্নয়নের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করে চীন সরকার ১৯৭৮ সালে স্বেচ্ছাভিত্তিক পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি চালু করে, যা ১৯৭৯ সালে আরও কঠোর ‘এক সন্তান নীতি’ হিসেবে ঘোষিত হয়। ওই নীতির আওতায় এক সন্তান গ্রহণকারী পরিবারকে বিভিন্ন প্রণোদনা প্রদান করা হয়।

পক্ষান্তরে এক সন্তানের অধিক পরিবারের জন্য রাখা হয় কঠিন শাস্তির বিধান, যেমন- আর্থিক জরিমানা, জোরপূর্বক গর্ভপাত ও বন্ধ্যাকরণ। ওই নীতি চীনের জনসংখ্যা ব্যাপকভাবে কমানোর পাশাপাশি কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়েরও সূত্রপাত ঘটায়। যেমন- অসামঞ্জস্যপূর্ণ মহিলা ও পুরুষ অনুপাত (১০৬:১০০), ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠী, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হ্রাস ইত্যাদি। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০১৫ সালে আবারও চীনা দম্পতিদের দুই সন্তান গ্রহণের অনুমতি প্রদান করেছে চীন সরকার।

থাই সরকার সমন্বিত নিবিড় পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি এবং উদ্ধুদ্ধকরণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হার ১৯৭০ সালের ১৪.৪ থেকে ২০১২ সালে ৭৯.২ শতাংশে বৃদ্ধি করার পাশাপাশি মোট প্রজনন হার একই সময়ে ৬.৩ থেকে ১.৫ শতাংশে নামিয়ে আনে। থাই পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির মূল স্লোগান ছিল ‘অর্থনৈতিক কল্যাণের জন্য ছোট পরিবার’।

এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যে থাইল্যান্ডে বিগত কয়েক বছরে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে মোট প্রজনন হার হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ০.৮ শতাংশে, যা থাই সরকারকে চিন্তিত করে তোলে এবং এ হার যাতে আরও হ্রাস না পায় সেই বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং প্রজনন হার বৃদ্ধির জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে।

জনসংখ্যা প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৫০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা স্থিতাবস্থায় পৌঁছাবে, যখন মোট জনসংখ্যা হবে প্রায় ২৩ কোটি। কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখতে হবে- ইউরোপ ও পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের শিখরে পৌঁছার পর ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশনের তৃতীয় পর্বে প্রবেশ করে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ বিগত দশকে ক্রমাগত উন্নতি করলেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য থেকে এখনও অনেক দূরবর্তী অবস্থানে থেকে ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশনের তৃতীয় পর্বে প্রবেশ করেছে, যার পরবর্তী অবধারিত অবস্থা হল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হ্রাস এবং বয়োবৃদ্ধ জনগোষ্ঠী বৃদ্ধি পাওয়া।

অথচ উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছার জন্য আগামী কয়েক দশক বাংলাদেশের দক্ষ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন হবে। এরকম একটি অবস্থানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জন্য সঠিক পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি প্রণয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনগুলোতে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সর্বোচ্চ সুফল অর্জন, বয়োবৃদ্ধ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাস এবং জনগোষ্ঠী ও এলাকাভিত্তিক জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা।

মো. মাহবুব-উল-আলম : প্রোগ্রাম ম্যানেজার (ফিল্ড সার্ভিসেস ডেলিভারি), পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর

শেয়ার করুন