স্বাদে অতুলনীয় সরিষাবাড়ীর প্যাঁড়া মিষ্টি

ছবি: সিলেটের সকাল

হাবিবুল হাসান, সরিষাবাড়ী থেকে:: বাঙালির সামাজিকতা ও খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি জাতীয় অন্ন বা খাবারের গুরুত্ব অনেক। জন্ম, বিবাহ ইত্যাদি অনুষ্ঠান এবং যেকোনো শুভ সংবাদে পাড়া-প্রতিবেশী এবং আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করা বাঙালি সমাজের এক চিরকালীন প্রথা। সেই মিষ্টির তালিকায় আমাদের এই দেশে জায়গা করে নিয়েছে রসগোল্লা, রাজভোগ, কালোজাম, চমচম, রসমালাই, প্রাণহারা, সন্দেশ, ছানামুখী, মণ্ডা, মকড়ম, আমিট্টি বা আমৃতিসহ আরোও অনেক নাম।

আবার এই মিষ্টির বিভিন্ন নামের সাথে সম্পর্ক রয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের। চমচম এর সাথে টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ি, কাঁচাগোল্লার সাথে নাটোর, রসমালাই এর সাথে কুমিল্লা, রসগোল্লার সাথে বিক্রমপুর ও পটুয়াখালীর কলাপাড়া, বগুড়া (মূলত শেরপুর) ও বরিশালের গৌরনদীর দই, যশোরের খেজুরগুড়ের সন্দেশ, মণ্ডার সাথে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা, আমৃতির সাথে খুলনা ও মুন্সিগঞ্জ, বালিশ মিষ্টির সাথে কিশোরগঞ্জ – নেত্রকোনা অঞ্চলের নামগুলো ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। মূলত এসব অঞ্চলের ময়রাদের বিশেষ পারদর্শিতা, নিষ্ঠা ও সৃজনশীলতায় ঐতিহ্যবাহী হয়ে উঠেছে এই বিভিন্নধরনের মিষ্টির নামগুলো।

এরকম অনেকরকম নামের ভিড়ে ঐতিহ্যবাহী হয়ে স্বাদের দিক দিয়ে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার “প্যাঁড়া মিষ্টি”। প্যাঁড়া মিষ্টিকে এই অঞ্চলের গর্বও বলা যেতে পারে। যাঁরা এর ভক্ত, তাঁরা তো রীতিমতো ফরমায়েশ দিয়ে আনিয়ে নেন এ মিষ্টি।

গরুর খাঁটি দুধ এর ঘন ক্ষীর এবং চিনের মিশ্রণে তৈরি হওয়া এই মিষ্টির স্বাদ অন্য মিষ্টির চেয়ে একটু আলাদা ও সুস্বাদু। এছাড়া প্যাঁড়া মিষ্টি শুকনা হওয়ায় দূর-দূরান্তে বহনেও বেশ সুবিধা, আর এ জন্যই মানুষের কাছে রসালো মিষ্টির চাইতে এ মিষ্টি একটু বেশি পছন্দের।

সরিষাবাড়ির উপজেলার অধিকাংশ মিষ্টি ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানা যায় প্যাঁড়া মিষ্টি তাঁরা বাপ-দাদার আমল থেকেই তৈরি করে আসছেন। মূলত হিন্দু ধর্মালম্বীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দুধের ক্ষীর এবং আখের রসের মিশ্রণে একধরনের মিষ্টান্ন তৈরি হতো। সেই হতে ধীরে ধীরে তা প্যাঁড়া মিষ্টিতে রূপান্তর লাভ করেছে। অন্যান্য মিষ্টি তৈরির চাইতে পরিশ্রম বেশি হলেও ব্যাপক চাহিদা থাকায় এবং সহজ কৌশলে তৈরি করা যায় বিধায় সরিষাবাড়ীর প্রায় প্রত্যেকটি মিষ্টির দোকানেই এই প্যাঁড়া মিষ্টি তৈরি হয়।

তেমনি একজন কাঁলাচাদ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী অনিলকুমার ঘোষ এর সাথে আলাপকালে বলেন ” তাঁর দোকানে বিভিন্ন রকমের মিষ্টির মধ্যে সবার আকর্ষণ থাকে এই প্যাঁড়া মিষ্টির ওপর। প্রতিদিন ১২০-১৫০ কেজির মতো প্যাঁড়া মিষ্টি তৈরি করে থাকে দোকানে নিয়োজিত কারিগরেরা। নিজ উপজেলার মানুষের চাহিদার পাশাপাশি পাশের জেলাশহর ময়মনসিংহ, শেরপুর, টাঙ্গাইল ও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অনেক স্থানেই এই প্যাঁড়া মিষ্টি সরবরাহ করে থাকেন।

তিনি আরও বলেন, তাঁর দোকানের এই প্যাঁড়া মিষ্টি দেশের বাইরেও সরবরাহ করা হয়। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ইতালি, মালোয়শিয়া, সিঙ্গাপুর, সৌদি-আরব, দুবাই প্রভৃতি দেশসমূহে থাকা এই অঞ্চলের প্রবাসীদের কাছে সরবরাহ হয়ে থাকে প্যাঁড়া মিষ্টি। শুকনো মুড়ির পাত্রে দেড় থেকে দুই মাস সংগ্রহ করে খাওয়া যায় বিধায় বিদেশে থাকা এই অঞ্চলের মানুষের প্যাঁড়া মিষ্টির কদর একটু বেশি।

এই মিষ্টির সবটুকুই দুধের ওপর নির্ভর করতে হয় বলে অন্যান্য মিষ্টির তুলনায় দাম একটু বেশিই হয়ে থাকে। কেজি হিসেবে প্যাঁড়া মিষ্টি বিক্রি হয় ৩৫০-৪০০ টাকার মধ্যে। প্রায় ৪০-৪৫ টি প্যাঁড়া মিষ্টি এক কেজি ওজনের হয়ে থাকে।

প্যাঁড়া মিষ্টি তৈরি করেন তেমনি একজন কারিগর লালমিয়ার সাথে আলাপকালে বলেন, প্রায় ৩০ বছর যাবৎ তিনি এই প্যাঁড়া মিষ্টি তৈরির সাথে জড়িত। এই মিষ্টি বানানো অনেকটা সহজ কৌশল হিসেবে মনে হলেও ততোটা সহজ নয় বলে দাবী করেন। দুধের ক্ষীর তৈরি করে তাতে চিনি ও ক্ষীরের মিশ্রণের একটা সঠিক অনুপাত প্রয়োজন হয়। আর এই অনুপাতের তারতম্য ঘটলে এই মিষ্টির স্বাদ ও গুণগত মান দুটোই নষ্ট হয়ে যায়। মিষ্টির কারিগর হিসেবে দেশের অনেক অঞ্চলের প্রসিদ্ধ মিষ্টির স্বাদ গ্রহণ করলেও সরিষাবাড়ীর প্যাঁড়া মিষ্টির স্বাদ দেশের অন্য অঞ্চলের মিষ্টির চেয়ে সেরা বলে তিনি দাবী করেন।

আঞ্চলিক খাবারের প্রতি মানুষের টান সবসময় থাকে,আর মিষ্টি জাতীয় খাবারের প্রতি চাহিদা আরও একটু বেশি। তাই বলা যায় স্বাদ ও গুণগত মানের ওপর এই অঞ্চলের প্রতিটি উৎসব, সামাজিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, পরীক্ষার ফল প্রকাশসহ সকল উৎসবে সরিষাবাড়ীর কালাচাঁদ মিষ্টান্ন ভান্ডার, মধু মিষ্টান্ন ভান্ডার, বর্ধন মিষ্টান্ন ঘর, সংগীতা মিষ্টান্ন ভান্ডারসহ বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে তৈরি হওয়া প্যাঁড়া মিষ্টি স্বাদে অতুলনীয়!

শেয়ার করুন