শ্রমিকের অনিরাপদ কর্মপরিবেশ

অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার ও আব্দুল্লাহ আল নাঈম

পৃথিবীব্যাপী সব পেশার শ্রমজীবী মানুষের রক্তঝরা সংগ্রামের গৌরবের দিন মহান মে দিবস। মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটানোর দিন আজ। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের ‘হে’ মার্কেটের দর্জি শ্রমিকেরা শ্রমের উপযুক্ত মূল্য প্রদান এবং দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর গুলি চালানো হয়। সেখানে ১১ জন শ্রমিক নিহত হন। তীব্র এই আন্দোলনের মুখে শ্রমিকদের দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় সরকার।
নিহত শ্রমিকদের স্মরণে এবং শ্রমিকের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে তারিখকে ‘মে দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে মে দিবস। জাতিসঙ্ঘ কর্তৃক আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। পৃথিবীর মেহনতি মানুষের কাছে এই দিনটি উজ্জ্বল হয়ে আছে। আইএলও প্রণীত নীতিমালা স্বাক্ষরকারী একটি দেশ, আমাদের এই বাংলাদেশ। এ দেশের শ্রমজীবী মানুষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যমণ্ডিত দিনটি পালন করে আসছে। এই দিবসের স্মরণে ১ মে সরকারি ছুটি ঘোষণা থাকে।

বাংলাদেশে গার্মেন্ট শিল্প রফতানিতে শীর্ষে অবস্থান করছে বলা চলে। আমাদের দেশে গার্মেন্ট শিল্প ও অন্যান্য কারখানার শ্রমিকদের বড় অংশ নারী ও শিশু। বাংলাদেশ সংবিধানে শিশুশ্রম বন্ধ করার কথা থাকলেও তা মেনে চলতে কোনো প্রতিষ্ঠান বা মালিক আগ্রহ দেখায় না। পোশাক শ্রমিকদের কাজের উপযুক্ত তথা নিরাপদ কর্মপরিবেশ না থাকায় ঝুঁকিতে থাকেন বেশির ভাগ শ্রমিক। বিভিন্ন দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়ে মারা যাচ্ছেন অনেকে। বাংলাদেশের পেশাগত দুর্ঘটনার হার কম নয়। হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট কর্তৃক ২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘অগ্নিকাণ্ডে নিরাপত্তা’ নামক নির্দেশিকা অনুযায়ী, ১৯৯০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দেশে মোট অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা ৩২ এবং এতে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ৮৯৭ ও আহতের সংখ্যা পাঁচ হাজার ১৯৫। শুধু ‘রানা প্লাজা’ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন এক হাজার ১৩৮ জন ও আহত দুই হাজার ৫০০ জন এবং নিখোঁজের সংখ্যা ৩২৯।

কিছু শিল্পের শ্রমিক সব সময় মারাত্মক স্বাস্থ্যগত ঝুঁঁকির মধ্যে থাকেন এবং ভুগছেন নানাবিধ রোগে। যেমনÑ ট্যানারি শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের বেশির ভাগই জন্ডিস, চর্মরোগ, বাতজ্বর, শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সার, আলসারের মতো ভয়াবহ রোগে ভুগছেন। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ২০১৫ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, ‘মহিলা গার্মেন্টকর্মীদের বেশির ভাগ নানা ধরনের রোগে বা সমস্যায় ভুগছেন; যেমনÑ মাথাব্যথা (৪৪ শতাংশ), গ্যাসজনিত পেটে ব্যথা (৪৮ শতাংশ), কোমর ব্যথা (৪৪ শতাংশ), ক্লান্তিজনিত দুর্বলতা (৫৪ শতাংশ), ক্ষুধামন্দা (৫৪ শতাংশ), গিরায় ব্যথা (৪০ শতাংশ), পায়ের তালু ও হাঁটুর সমস্যা (৪০ শতাংশ), চর্মরোগ (৩০ শতাংশ), মাথা ঘুরানো (২২ শতাংশ), মানসিক সমস্যা (২২ শতাংশ) শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা (৪ শতাংশ)।’

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়নে অবদান রাখা শ্রমিকেরা অনেক ক্ষেত্রেই বিভিন্নভাবে মালিকের শোষণে শোষিত। আমাদের দেশে অনেক মালিক আছেন যারা শ্রমিকদের বেতন বকেয়া রেখেই উৎপাদন অব্যাহত রাখতে চান। বাংলাদেশ শ্রম আইনের ২০০৬ সালের ৪২ নম্বর আইন অনুযায়ী : ‘০১. কোনো মালিক একাদশ অধ্যায়ের অধীন ঘোষিত নি¤œতম মজুরি হারের কম হারে কোনো শ্রমিককে মজুরি প্রদান করিলে, তিনি এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে, অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন। ০২. যে ক্ষেত্রে আদালত উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো দণ্ড আরোপ করে, সে ক্ষেত্রে আদালত উহার রায় প্রদানকালে, উক্তরূপ কোনো লঙ্ঘন না হইলে সংশ্লিষ্ট শ্রমিককে যে মজুরি প্রদেয় হইত এবং উক্তরূপ লঙ্ঘন করিয়া মজুরি হিসাবে যে অর্থ প্রদান করা হইয়াছে, উহার পার্থক্যের পরিমাণ অর্থ তাহাকে প্রদান করিবার আদেশ দিতে পারিবে।’

একটি দেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হলে অবশ্যই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের স্বার্থ নিয়ে ভাবতে হবে। শ্রমজীবী মানুষের ত্যাগ ও শ্রমেই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রয়েছে। সুতরাং শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মহান মে দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুধাবন করার কোনো বিকল্প নেই। মানুষের ভাগ্য মানুষ নিজ হাতে গড়ে নিতে পারে, শ্রমিকেরা যদি তাদের নিজ নিজ কাজ দক্ষতা ও সাবধানতার সাথে এবং সুনিপুণভাবে করে তাহলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে লোপ পাবে। অপর দিকে, মালিকপক্ষ যদি যথাযথভাবে আইন মেনে, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও উন্নত কর্মস্থলের পাশাপাশি পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, তবে দুর্ঘটনায় তাদের আর্থিক লোকসান কম হবে; অধিকন্তু অনেক জান-মাল রক্ষা পাবে।

লেখকদ্বয় স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে যথাক্রমে শিক্ষকতায় ও গবেষণায় নিয়োজিত।
ই-মেইল : kamrul_sub@hotmail.com)

শেয়ার করুন