শ্রমিকদের অধিকার প্রদানের মাধ্যমে শিল্পের বিকাশ সম্ভব

ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম

খান পহেলা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। সারা বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষ একটি বিশেষ দিন হিসেবে মে দিবস পালন করে থাকে। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে এই দিবসটি সারা বিশ্বের শ্রমিক সমাজের কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিনের শোষণ, বঞ্চনা, নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে  শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস রচিত হয়েছিল। সারা পৃথিবীর শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণিও প্রতিবছর গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে দিনটি পালন করে থাকে।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সাল থেকে ১ মে সরকারি ছুটি পালন করা হলেও আজ অবধি আমাদের দেশের শ্রমিকরা তাদের ন্যায়সংগত অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। দেশের প্রধান রপ্তানিযোগ্য শিল্প খাত গার্মেন্ট। এই গার্মেন্টের শ্রমিকরা এখনো ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এখানে বেআইনিভাবে অনেক বেশি সময় ওভারটাইম করতে বাধ্য করা হলেও প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী আনুপাতিক হারে তাদের ওভারটাইম ভাতা দেওয়া হয় না। ইপিজেড অঞ্চলের শ্রমিক-কর্মচারীরা তাদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত। তাদের দেওয়া মজুরি কোনোভাবেই ন্যূনতম চার সদস্যের পরিবারের জন্য যথেষ্ট নয়। ন্যায্য মজুরি চাইলে চাকরি হারাতে হয় হাজারো শ্রমিককে। আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী শ্রমিকরা অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারসহ নানা সামাজিক মর্যাদা ও সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। মুক্তবাজার অর্থনীতি আর নিয়ন্ত্রণহীন দ্রব্যমূল্যের কারণে স্বল্প ও সীমিত আয়ের মানুষের পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকা খুবই কঠিন। অপ্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরের বেশির ভাগ শ্রমিকের চাকরির নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা নেই। তাদের ছুটি দেওয়া হয় না। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নারী শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্র থেকে গর্ভকালীন ভাতা, ছুটি ও অন্যান্য সুযোগ দেওয়া হয় না। নারী-পুরুষের মজুরিতে বৈষম্য বিরাজমান। কর্মক্ষেত্রে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত।

বিশ্বব্যাপী শোভন কাজ আজ শ্রমজীবী মানুষের সর্বজনীন দাবিতে পরিণত হয়েছে। যেখানে এখন কর্মজীবী মানুষের আয়ের ওপর তার পুরো পরিবারের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের নিশ্চয়তা থাকবে, থাকবে কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনায় ন্যূনতমভাবে বাঁচার মতো বা জীবনধারণের জন্য যুক্তিসংগত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের প্রেসক্রিপশনে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাটকল আদমজী জুট মিলসহ দেশের অনেক বড় শিল্প-কল-কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত খাত সম্পূর্ণভাবে সংকুচিত হয়ে আজ প্রায় বিলীন হওয়ার পথে। এই খাতে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারী বেকার।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জাতীয় ন্যূনতম মজুরির বিধান রয়েছে। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি হলো দেশের মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় মজুরি বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে জাতীয়ভিত্তিক সব শ্রমিকের জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা। আমাদের দেশের শ্রমিকরা দীর্ঘদিন থেকে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি দাবি করে এলেও কোনো সরকার এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। অথচ সমতাভিত্তিক শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য এটি সর্বস্তরের শ্রমিক-কর্মচারীদের অন্যতম মৌলিক দাবি। বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ দীর্ঘদিন থেকে একটি গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়নের দাবি করে আসছিল। ২০০৬ সালে সরকার তড়িঘড়ি করে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থকে উপেক্ষা করে একটি শ্রম আইন প্রণয়ন করে। ওই শ্রম আইনটি ছিল সম্পূর্ণরূপে শ্রমিক স্বার্থবিরোধী। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করেছিল যে তারা শ্রম আইন ২০০৬ সংশোধন করে আইএলও ৮৭ ও ৯৮ মোতাবেক একটি গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়ন করবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ২০১৩ সালে সংশোধিত শ্রম আইন সেভাবে সংশোধন হয়নি, বরং কিছু অধিকার খর্ব করা হয়েছে। সংশোধনীতে ইপিজেডে ট্রেড ইউনিয়নের পরিবর্তে অংশগ্রহণমূলক বা পার্টিসিপেটরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি মালিক বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মনোনীত হচ্ছে। আমরা মনে করি, পার্টিসিপেটরি কমিটি কোনোভাবেই ট্রেড ইউনিয়নের বিকল্প নয়। কারণ শ্রমিকদের পক্ষে দাবি উত্থাপন বা দর-কষাকষির কোনো অধিকার পার্টিসিপেটরি কমিটির নেই। সংশোধনীর মাধ্যমে পার্টিসিপেটরি কমিটির নামে ধূম্রজাল সৃষ্টি করে নতুনভাবে ৫০ জন বা তার কমসংখ্যক শ্রমিক যেখানে কাজ করবে, সেখানে তাদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার খর্ব করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংশোধনীতে পাঁচ বছর কাজ করলে পোশাক কারখানার শ্রমিকরা গ্র্যাচুইটি পাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা শ্রমিক স্বার্থ ও নীতিনৈতিকতা বিরোধী। প্রকৃত দাবি হচ্ছে তিন বছরের অধিক কোনো শ্রমিক যদি একই কারখানায় কাজ করে তাহলে প্রতিবছরের জন্য এক মাসের সমপরিমাণ গ্র্যাচুইটি সে প্রাপ্য হবে।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরি অপেক্ষাকৃত কম। আর এই কম মজুরির কারণে বাংলাদেশে পণ্যের উত্পাদন খরচও কম। সে কারণে অনেক বহুজাতিক কম্পানিসহ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে উত্পাদিত পণ্য আমদানি করতে আগ্রহী। অন্যদিকে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কম মজুরিতে কাজ করানো যায় বিধায় মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকের চাহিদাও রয়েছে ব্যাপকহারে। আজ বাংলাদেশের সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় দেশে-বিদেশে কাজ করা এই কম মজুরির শ্রমিকদের মাধ্যমে। শ্রমিকশ্রেণি শুধু উত্পাদন ব্যবস্থারই অংশ নয়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের অন্যতম হাতিয়ার। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষ বিভিন্ন সৃষ্টির নির্মাতা হিসেবে যে গুরুত্বপূর্ণ তা আমাদের দেশের মালিকরা বুঝতে চান না।

জাতির প্রত্যাশা একজন দেশপ্রেমিক শিল্পোদ্যোক্তা অবশ্যই শিল্প, শ্রমিক ও দেশের স্বার্থ দেখবেন। কিন্তু আমাদের দেশের মালিকরা এই তিনটির একটিও ভাবেন না। ট্রেড ইউনিয়ন শ্রমিকদের ন্যায়সংগত আইনগত স্বীকৃত অধিকার। ট্রেড ইউনিয়ন একদিকে যেমন শ্রমিকদের সুসংগঠিত করে, অন্যদিকে শিল্প-কারখানায় সুষ্ঠু শিল্প সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। যেকোনো রাষ্ট্রে সঠিক গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিকাশ ও তাকে শক্তিশালী এবং টেকসই করতে রাষ্ট্রের উত্পাদিকাশক্তি মেহনতি মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণে অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে ট্রেড ইউনিয়নের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু ট্রেড ইউনিয়ন সম্পর্কে মালিকদের মনোভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। যার কারণে তাঁরা কোনোভাবেই শ্রমিকদের ন্যায়সংগত অধিকার মেনে নিতে রাজি নন। ট্রেড ইউনিয়ন ম্যানেজমেন্টেরই অংশ, এর স্বীকৃতি দিতে হবে। এই স্বীকৃতির জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গেলে শ্রমিকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি-নির্যাতন করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া হচ্ছে। অথচ  বাস্তবতা হচ্ছে, ট্রেড ইউনিয়নে সম্পৃক্ত এবং আস্থায় নেওয়ার মাধ্যমে দেশে দেশে শিল্প-কারখানা বিকাশ লাভ করেছে। আমাদের দেশেও এমন কিছু ইউনিয়ন আছে, যাদের সঠিক ভূমিকা পালনের কারণে সংশ্লিষ্ট কারখানার উন্নয়ন ঘটেছে। শ্রমিকরাও ন্যায্য অধিকার ভোগ করছে। যেমনটি আছে ট্যানারি শিল্পে। এখানকার শ্রমিকরা ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের মাধ্যমে তাদের সমস্যার সমাধান করে থাকে। উভয়ের সম্মতিতে প্রতি দুই বছর পর চুক্তি সম্পাদিত হয়।

আমরা মনে করি, প্রতিনিধিত্বমূলক ও দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়ন কোনো সময়ই শিল্প বিকাশে বৈরী হতে পারে না। কারণ তারা জানে, এই শিল্পের ওপর তাদের নিজেদের এবং পরিবার-পরিজনের খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। তাই অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তাদের জাতীয় ন্যূনতম মজুরিসহ অন্যান্য ন্যায়সংগত অধিকার বাস্তবায়ন করতে হবে।

দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শ্রমিকদের ওপর চলা সব ধরনের শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে সুখী-সমৃদ্ধ একটি প্রগতিশীল শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে সরকার ও মালিকদের এগিয়ে আসতে হবে। মহান মে দিবসে শ্রমিকদের প্রত্যাশা, শ্রমিকদের সব ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা হোক। শ্রমিক-মালিক ও সরকারের মিলিত প্রচেষ্টায় বিকশিত হবে শিল্প, এগিয়ে যাবে দেশের অর্থনীতি।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

শেয়ার করুন