রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ওআইসিকে পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে চাপ অব্যাহত রাখতে মুসলিম দেশগুলোর জোট ইসলামী সম্মেলন সংস্থা-ওআইসির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শনিবার সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দুই দিনব্যাপী ওআইসি’র ৪৫তম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন উদ্বোধন করে তিনি এ আহ্বান জানান।

৫৬টি ওআইসি সদস্য দেশের মধ্যে ৫২টি দেশের ৬০০ প্রতিনিধি এতে অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়া ৪০ জন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত আছেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘টেকসই শান্তি, সংহতি ও উন্নয়নে ইসলামিক মূল্যবোধ’। সম্মেলন চলবে আগামী ৬ মে পর্যন্ত।

সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকটের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সম্পূর্ণ মানবিক কারণেই আমরা ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছি। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স) মানবতার পাশে দাঁড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন। কাজেই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যখন জাতিগত নির্মূলের শিকার তখন ওআইসি নিশ্চুপ থাকতে পারে না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি ফিলিস্তিনের জনগণে সমস্যা দ্রুত সমাধানে ওআইসি কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলেও আমি আশা করছি। আমরা পারস্পরিক সমঝোতা ও সহযোগিতা চাই্। যুদ্ধ চাই না। সমঝোতা ও শান্তির বাণী বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘নিপীড়িত মানবতার জন্য বাংলাদেশ তার চিত্ত এবং সীমান্ত- দুটিই উন্মুক্ত করে দিয়েছে। মিয়ানমারের প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে রোহিঙ্গাদের ব্যথায় ব্যথিত। কারণ, আমার পিতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্য নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর আমি ছয় বছর দেশে ফিরতে পারিনি, বিদেশে উদ্বাস্তু জীবন কাটিয়েছি। কাজেই জোরপূর্বক বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের মর্যাদা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ওআইসিকে আমি দৃঢ়ভাবে তাদের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ করছি।’

তিনি বলেন, ‘ওআইসিকে অবশ্যই মিয়ানমার সরকারের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে চাপ অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে বাংলাদেশের সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের তারা নিজ দেশে নিরাপদে ফেরত নেয়। রোহিঙ্গাদেরও আমাদের সবার মত মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার এবং জীবন জীবিকার অধিকার রয়েছে।’

কিছুটা আক্ষেপ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ বিশ্বে মুসলিম পরিচয়কে ভুলভাবে সহিংসতা ও চরমপন্থার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে। এখনকার মত মুসলিম বিশ্ব আগে কখনো এত বেশি সংঘাত, অভ্যন্তরীণ গোলযোগ, বিভাজন ও অস্থিরতার মুখোমুখি হয়নি। এত ব্যাপকহারে বাস্তুহারা জনগোষ্ঠীর দেশান্তর হওয়াও লক্ষ্য করা যায়নি। এই অবস্থা চলতে পারে না। এখন সময় এসেছে আমাদের চিন্তা-চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন আনার। সময় এসেছে টেকসই শান্তি, সংসতি ও সমৃদ্ধির আলোকে আমাদের ভবিষ্যতকে নতুন আঙ্গিকে ঢেলে সাজানোর।’

দেশের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবসহ নানা বাধা-বিপত্তি মোকাবিলা করে বাংলাদেশ সম্প্রতি তিনটি শর্তের সবগুলো পূরণ করে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সনদ পেয়েছে। রুপকল্প ২০২১ এর আওতায় আমরা এখন মধ্যম আয়ের ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশের মডেল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নারীর ক্ষমতায়নে অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছে। এছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশ বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছে। জাতিসংঘ শান্তি মিশনের মাধ্যমে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে। আমাদের হাজার বছরের প্রাচীন আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ বিগত বছরগুলোতে গড়ে শতকরা সাত ভাগেরও অধিক হারে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। অবকাঠামো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে এগিয়ে চলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের শক্তি আমাদের নারী ও যুবসমাজ এবং জনতাত্ত্বিক সুফল। আমাদের যুবশক্তি ও প্রযুক্তিতে যথাযথ বিনিয়োগ করে তাদের উৎপাদনশীল শক্তিতে পরিণত করতে হবে। এই যুবশক্তির ওপর ভিত্তি করে আমরা শান্তি ও উন্নয়নের একটি নিয়মনিষ্ঠ কাঠামো তৈরি করতে পারি। এটা বৃহত্তর ওআইসি’র আঙ্গিকেও হতে পারে। নারী সমাজ আমাদের ভবিষ্যত অগ্রযাত্রার সমান অংশীদার। আমাদের পরিকল্পনা পরিকাঠামোতে লিঙ্গ-সমতার বিষয়টি সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়- এ নীতিতে বিশ্বাস করতেন। আমরা মনে করি, আজ ইসলামী বিশ্বে যেসব মতপার্থক্য ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা খোলামন নিয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দূর করা সম্ভব। রক্তপাত শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয় বরং তা আরও খারাপ পরিস্থিতির জন্ম দেয়। আমাদের ইসলামী বিশ্বের রূপকল্প এমন হতে হবে, যাতে আমরা আমাদের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার করতে পারি। আমরা নিজেরাই সকল দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সমাধান করতে পারি। দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পথ আমাদের নিজেদেরই খুঁজে বের করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন ফলাফল কেন্দ্রিক নতুন কৌশল-সম্বলিত একটি রূপান্তরিত ওআইসি।’

তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালে রিয়াদ সম্মেলনে আমি সন্ত্রাস দমনে যে চার দফা প্রস্তাব পেশ করেছিলাম, তা আবারও উল্লেখ করতে চাই। প্রথমত, আমাদের সন্ত্রাসীদের অস্ত্র সরবরাহের পথ বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সন্ত্রাসীদের অর্থ সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, ইসলামী উম্মার ভিতরে বিভেদ বন্ধ করতে হবে এবং চতুর্থত, নতুনভাবে সকল পক্ষের জন্য সুবিধাজনক হয় এমন ব্যবস্থা রেখে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পথে যেকোনো বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে।’

এ সময় শেখ হাসিনা বলেন, ‘পৃথিবীর এক পঞ্চমাংশ জনশক্তি, এক তৃতীয়াংশের বেশি কৌশলগত সম্পদ এবং প্রচুর সম্ভাবনাময় কয়েকটি উদীয়মান শক্তিশালী অর্থনীতির দেশসহ অপার সম্ভবনা ও সম্পদশালী মুসলিম বিশ্বের পিছিয়ে পড়ে বা অমর্যাদাকর অবস্থায় থাকার কোনো কারণ নেই। উন্নয়ন আমাদের অধিকার, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আমাদের নাগালের মধ্যে এবং সামাজিক অগ্রগতির উপায় আমাদের হাতে। আমাদের এখন প্রয়োজন যৌথ ইসলামী কর্মকৌশল ঢেলে সাজানো।’

প্রায় ৩৫ বছর পর দ্বিতীয়বারের মত বাংলাদেশ ওআইসি’র নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের এমন সম্মেলন আয়োজন করেছে। এর আগে ১৯৮৩ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মত ওআইসি’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন হয়েছিল।

সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন- ওআইসির ৪৪তম সম্মেলনের চেয়ার ও আইভরিকোস্টের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্সেল আমন তানাহ, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, বিশেষ আমন্ত্রণে যোগ দেয়া কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিস ক্রিসটিয়া ফ্রিল্যান্ড, ওআইসি’র সেক্রেটারি ড. ইউসেফ এ আল-ওথাইমেন প্রমুখ।

শেয়ার করুন