রমজানে কেনাকাটায় সংযম ও মিতব্যয়িতা

ধর্ম ডেস্ক :: অবারিত রহমত, দয়া, অনুগ্রহ, মাগফিরাত, ক্ষমা এবং বিরাট ফজিলত বরকতের মাস রমজান। রমজানে রয়েছে লাইলাতুল কদরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও মহিমাময় রজনি। রয়েছে রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের মতো বরকতময় ইবাদত। রমজানের প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান। রমজানের রোজাগুলো যথাযথভাবে রাখতে পারলে অতীত জীবনের সব গোনাহ মাফ হয়ে যাবে। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজার হক ও আদব রক্ষা করে যথাযথভাবে রোজা রাখে, আল্লাহ তায়ালা তার পেছনের সব গোনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (মুসনাদে আহমদ : ১৫৫২৪)।

রোজার হক আদায় করতে হলে দুটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ রাখতে হবে। এক. আল্লাহর কোনো নাফরমানি ও গোনাহ করা যাবে না। তাঁর অবাধ্যতায় লিপ্ত হলে রোজার হক যথাযথ আদায় হবে না। এমনকি রোজা কবুল না হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। একটি হাদিসে রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা, গিবত ও ঝগড়া পরিহার করল না, তার ক্ষুৎপিপাসায় আল্লাহ তায়ালার কিছুই যায় আসে না।’ (বোখারি : ১৯০৩)।

দুই. গোনাহ থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি অযথা, অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় কাজ থেকে বিরত থাকা। এটাও রোজার আদব। এমন কিছু বিষয় আছে শরিয়তে যেগুলো হারাম ও নাজায়েজ না, সেগুলো সরাসরি গোনাহ ও পাপের আওতাভুক্ত নয়; তবে পার্থিব-অপার্থিব কোনো উপকরাও নেই তাতে। যেমনÑ কয়েকজন মিলে গল্পগুজব করা, হাসি-তামাশা করা ইত্যাদি। এগুলো জায়েজ হলেও রমজানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসব থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। সূরা মোমিনুনের শুরুতে আল্লাহ তায়ালা খাঁটি মোমিনের গুণাবলি উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, ‘যারা অযথা কাজ থেকে বিরত থাকে।’ (আয়াত : ৩)।

সাধারণত অযথা কাজগুলো গোনাহ নয়; তবে অযথা কাজের দরুন কোনো ফরজ ইবাদতে বিঘœ ঘটলে তা গোনাহে পর্যবসিত হয়। বিষয়টি মনে রাখা উচিত। মনে করুন কেউ সংবাদ পড়ছে বা কারও সঙ্গে বসে অপ্রয়োজনীয় গল্প করছে, আর ওদিক দিয়ে নামাজের সময় চলে যাচ্ছে অথবা জামাত শুরু হয়ে গেছে, তখন এই অযথা কাজ গোনাহের কারণ হবে। কারণ তার এই কাজের কারণে জামাত বা নামাজ পরিত্যাগ করার অনুমতি নেই।

এবার আসুন রমজানে কেনাকাটার বিষয়ে আলোচনা করি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, রমজান ও ঈদ আমাদের দুয়ারে আসে শুধু কেনাকাটার জন্যই। ঈদ উপলক্ষে নিজের ও পরিবারের লোকজন, আত্মীয়স্বজন এবং গরিব প্রতিবেশীর জন্য কেনাকাটার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। ক্ষেত্রবিশেষে আবশ্যকও বটে। কিন্তু তাই বলে নামাজ ও ইবাদত জলাঞ্জলি দিয়ে নয়। নামাজের সময় নামাজ, ইবাদতের সময় ইবাদত, আর অবসর মুহূর্তে কেনাকাটা ও শপিং। রমজানের বাজারসদাই ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রমজান শুরুর আগেই শেষ করা উচিত। সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈন রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। প্রস্তুতি মানে মানসিক প্রস্তুতি এবং নিজের প্রাত্যহিক রুটিনে পরিবর্তন আনা। রমজানের আগে দুনিয়ার ব্যস্ততা ও ঝুটঝামেলা থেকে মুক্ত হওয়া। কাপড়চোপড় ও শুকনো বাজার, যেমনÑ পেঁয়াজ, আলু, তেল, চাল-ডাল ইত্যাদি এবং যেসব খাবার ফ্রিজে রেখে খাওয়া যায়Ñ এসব একসঙ্গে রমজানের আগেই কিনে ফেলা উচিত। রমজান শুরু হওয়ার পর নিত্যপ্রয়োজনীয় কাঁচাবাজার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টার মাঝেই কেনা যেতে পারে। কেনাকাটা ও বাজারসদাইয়ের জন্য যেন নামাজ ও রোজার কোনো ক্ষতি না হয়, এদিকে লক্ষ রাখা অবশ্যকর্তব্য।

বাস্তবতা হলো খাবারদাবার ও কাঁচাবাজার করার পেছনে তেমন সময় ব্যয় করার প্রয়োজন হয় না। অফিস থেকে ফেরার পথে ফুটপাতে-রাস্তাঘাটে প্রয়োজনীয় মাছ, শাকসবজি, লেবু, শসাÑ সবকিছুই পাওয়া যায়। এমনকি শহর ও গ্রামাঞ্চলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী লোকজন ফেরি করে বিক্রি করে। তাদের কাছ থেকে আমাদের মা-বোনরা সহজেই কেনাকাটা করতে পারেন। কিন্তু নতুন নতুন জামাকাপড়, প্রসাধনী এবং বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার পেছনেই আমরা সময় নষ্ট করি বেশি। ঈদে উত্তম পোশাক পরিধানের গুরুত্ব আছে, তাই বলে নতুন জামা ছাড়া ঈদ হবেই নাÑ এটা অযৌক্তিক। পুরানো তবে সুন্দর জামা পরেও তো ঈদে যাওয়া যায়। বড়দের চেয়ে ছোটদের নতুন জামাকাপড়ের প্রতি ঝোঁক থাকে বেশি। তাদের জন্য রমজান শুরু হওয়ার আগেই জামাকাপড়ের অর্ডার দিয়ে রাখা উচিত এবং রেডিমেট জামা বা জুতো হলে আগেও কেনা যায় অথবা রমজানের ভেতর অবসর সময়ে কেনা যায়।

রমজানে প্রত্যেক মোমিনের একটি রুটিন থাকা উচিত। রোজা তো নিয়মানুবর্তিতা শেখায়। সাহরি খাওয়ার আগে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া উচিত। সারাবাছর হয়তো তাহাজ্জুদের জন্য জাগ্রত হওয়া কঠিন; কিন্তু তাহাজ্জুদ পড়ার বিরাট সুযোগ রয়েছে রমজানে। সাহরির জন্য তো উঠতেই হয়; তাই দুই, চার, আট রাকাত তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ার পর সাহরি খাবে। শেষ সময়ে সাহরি খাওয়া উত্তম। সাহরির পর ফজরের আজান হলে দুই রাকাত সুন্নত বাসা থেকে পড়ে মসজিদে গিয়ে ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করবে। রমজানে যেহেতু সাধারণত ফজরের নামাজ প্রথম ওয়াক্তে পড়া হয়, তাই নামাজের পর অফিসে গমন বা কাজকর্ম শুরু করার আগে দুই বা তিন ঘণ্টা সময় থাকে। এ সময়ে একটু বিশ্রাম হতে পারে। ঘুম থেকে উঠে গোসল সেরে অফিস বা কাজে যেতে হয়। রমজানে ৩টা পর্যন্ত অফিস। কারও বা আরও বেশি। মাঝখানে জোহরের নামাজ। আসরের আগে বা পরে বাসায় ফিরতে হয়। বাসার কাছের মসজিদে বা পথে আসরের নামাজ জামাতের সঙ্গে পড়তে হবে। আসরের আগে বা পরে ইফতারির আগপর্যন্ত কোরআন তেলাওয়াত করা যেতে পারে। ইফতারের আগে দোয়া কবুলের সময়। হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘রোজাদার যখন ইফতারের সময় দোয়া করে, তখন তার দোয়া প্রত্যাখ্যান করা হয় না অর্থাৎ তার দোয়া কবুল হয়।’ (মুজামুল কাবির : ১৪৩৪৩; শুআবুল ইমান : ৩৩০৮)।

ইফতারের পর নিজের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে বিশ্রাম বা তেলাওয়াত কিংবা জিকির-আজকার হতে পারে। পরিবারের লোকজন অথবা বাইরের লোকজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা যায়। এরপর তারাবির প্রস্তুতি। তারাবি থেকে ফিরে দ্রুত ঘুমানো। রাতের খাবার তারাবির আগে অথবা পরে হতে পারে। সারাদিনের ব্যস্ততার মাঝেও জিকির-আজকার, দরুদ পড়া সম্ভব, কোরআন তেলাওয়াত করা যায়। আমাদের দেশের দোকানপাটে দোকানি কোরআন তেলাওয়াত করছেÑ এই দৃশ্য বিরল। কিন্তু ভারতের অনেক অঞ্চলে আমি দেখেছি, মুসলমান দোকানদার দোকানে বসে কোরআন তেলাওয়াত করছে। প্রত্যেকে নিজের রুচি ও সুবিধা অনুযায়ী রুটিন করে নেবে। মোটকথা, রমজান ইবাদতের মাস, কেনাকাটার মাস নয়। কেনাকাটা করতে গিয়ে যেন ইবাদতের মহাসুযোগ হাতছাড়া না হয়ে যায়Ñ এই বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। অযথা সময় নষ্ট না করে ইবাদতের মৌসুমে ইবাদত করা উচিত। সময় কাজ লাগাতে না পারলে পরিতাপের সীমা থাকবে না।
আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকি অথবা অযথা সময় নষ্ট করিÑ সময় তো কেটেই যাবে। সময় বহতা নদীর মতো; কারও জন্য অপেক্ষা করে না। এক আরবি কবি বলেন, ‘দুনিয়ার বুকে যেন আমরা নৌকার যাত্রী। মনে হয় ঠায় দাঁড়িয়ে আছি, অথচ সময় আমাদের নিয়ে বয়ে চলেছে।’

শেয়ার করুন